
ছয় সদস্যের দল নিয়ে ঢাক বাজাচ্ছিলেন নিশিকান্ত মণি দাস। কখনো ঢাকের তালে, কখনো শরীরী ভঙ্গিমায় পূজারিদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা। টানা অন্তত ২০ মিনিট ধরে চলল তাঁদের পরিবেশনা। গাজীপুরের কাপাসিয়ার করগাঁও গ্রাম থেকে এসেছেন তিনি। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনো মণ্ডপে বায়না হয়নি। কয়েকজন দরদাম করেছেন; কিন্তু মেলেনি প্রত্যাশিত দাম।
গত বছর ছয় সদস্যের দল নিয়ে ৯৬ হাজার টাকায় বায়না পেয়েছিলেন নিশিকান্ত। এবার সর্বোচ্চ দর উঠেছে ৮০ হাজার টাকা। তাঁর হিসাবে, এক লাখ টাকা না পেলে পোষাবে না। তবু কেন আসেন এই হাটে? নিশিকান্তের সহজ উত্তর, ‘মায়ার টানে, মায়ার টানে আসি এই হাটে।’
এই মায়ার নাম কটিয়াদীর ঢাকের হাট। দুর্গাপূজাকে ঘিরে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে বসা এই হাটের ঐতিহ্য কয়েক শ বছরের। মহাষষ্ঠীতে দেবীর বোধন থেকে বিজয়া দশমীতে বিসর্জন—দুর্গাপূজার নানা আনুষ্ঠানিকতায় ঢাকের বাদ্য অপরিহার্য। সেই বাদ্যের দল বাছাই করতে প্রতিবছর এখানে জড়ো হন ঢাকি ও পূজারিরা।
আয়োজকদের মতে, সময় বদলেছে। বদলেছে বায়নার ধরনও। মুঠোফোনে কথা বলে, বিকাশে টাকা পাঠিয়ে এখন অনেকেই ঢাকির দল ঠিক করেন। ডিজে ও সাউন্ড সিস্টেমের ব্যবহারও বেড়েছে। ফলে ঐতিহ্যবাহী এই হাটের জৌলুশ কমছে।
বাদ্য শুনে দল বাছাই
কটিয়াদী পৌর এলাকার পুরান বাজারে এই হাট বসে। বৃহস্পতিবার বাজারের দিন হওয়ায় হাট সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল পশ্চিম বাজারের রাধানাথ রায়বাড়ি মন্দিরের মাঠে। বুধবার শুরু হওয়া হাট চলবে শুক্রবার রাত নয়টা পর্যন্ত।
বৃহস্পতিবার বিকেলে হাটে ঢোকার আগেই কানে আসে ঢাকের শব্দ। দল বেঁধে বাদ্য বাজিয়ে পূজারিদের মনোযোগ আকর্ষণ করেন ঢাকিরা। পূজারিরা বাজনার দক্ষতা, দলের সদস্যসংখ্যা ও পরিবেশনা দেখে দরদাম করেন। পছন্দ হলে চুক্তিবদ্ধ হন। এরপর ষষ্ঠী থেকে বিসর্জন পর্যন্ত মণ্ডপে বাদ্য বাজানোর দায়িত্ব নেন ঢাকিরা।
হাট ব্যবস্থাপনা কমিটির সূত্র জানায়, নরসিংদী, মুন্সিগঞ্জ ও হবিগঞ্জ থেকে বেশি ঢাকের দল আসে; আর পূজারিরা আসেন কিশোরগঞ্জ, নরসিংদী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ময়মনসিংহ ও বৃহত্তর সিলেট অঞ্চল থেকে।
এবার প্রথম দিন বুধবার ১১টি দলের বায়না হয়। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত বায়না হয়েছে ৮১টি দলের। সব মিলিয়ে এবার বায়নার সংখ্যা দুই শর বেশি হবে না বলে ধারণা করছেন আয়োজকেরা। অথচ এক যুগ আগেও এই হাট থেকে পাঁচ শতাধিক দল বিভিন্ন মণ্ডপে ঢাক বাজানোর চুক্তি করত।
কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরের জগতচর মনোহরপুর গ্রাম থেকে এসেছেন পূজারি পঞ্চু চন্দ্র সূত্রধর। মাঠের এক কোণে দাঁড়িয়ে চার সদস্যের একটি দলের বাজনা শুনছিলেন। বাজনা ও শরীরী ভঙ্গি পছন্দ হওয়ায় শেষ পর্যন্ত ৭৫ হাজার টাকায় দলটির সঙ্গে চুক্তি করেন তিনি।
পঞ্চু চন্দ্রের কাছেও কয়েকটি ঢাকির দলের ফোন নম্বর আছে। চাইলে ফোনেই বায়না করতে পারতেন; কিন্তু হাটে আসার আনন্দ আলাদা। তাঁর ভাষায়, ‘হাটে এসে দেখেশুনে ঢাকির দল পছন্দ করা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। হাটে এলে মনে হয়, পূজা শুরু হয়ে গেছে। না এলে পূজার অনুভূতিটা পাওয়া যায় না।’
মুন্সিগঞ্জের বিক্রমপুর সদর থেকে তিন সদস্যের দল নিয়ে এসেছেন গিরিশচন্দ্র দাস। তিন বছর আগে একবার হাটে এসেছিলেন। এরপর দুই বছর বিরতি দিয়ে এবার আবার এসেছেন। তাঁর অভিজ্ঞতায়, আগের তুলনায় এবার ঢাকের দল ও পূজারির সংখ্যা কম। তবে বায়নার দর মন্দ নয়।
প্রযুক্তির চাপে ঐতিহ্য
হাট ব্যবস্থাপনা কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রতন সাহা বলেন, প্রতিবছরই হাটের জৌলুশ কিছুটা করে কমছে। দূরদূরান্ত থেকে ঢাকির দল আসা যেমন কমেছে, তেমনি কমেছে পূজারিদের উপস্থিতি। এর পেছনে ডিজে ও সাউন্ড সিস্টেমের প্রতি আগ্রহ এবং মুঠোফোনে বায়না করার প্রবণতা বড় কারণ।
তবে ঢাকের হাট ব্যবস্থাপনার অন্যতম সংগঠক দিলীপ ঘোষের বিশ্বাস, এই হাট বিলুপ্ত হবে না। কারণ, অনেক পূজারির কাছে হাটে এসে ঢাকির দল বাছাই করা ঐতিহ্য ও আনন্দের অংশ।
হাটের মূল জায়গায় ঢাকিদের বিশ্রামের জন্য একটি শেড রয়েছে। তবে সেখানে কয়েকটি চায়ের দোকান স্থায়ীভাবে বসায় বিশ্রামের জায়গা কমে যাচ্ছে বলে অভিযোগ ঢাকিদের।
বৃহস্পতিবার হাট পরিদর্শনে আসেন কিশোরগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. জালাল উদ্দীন। তাঁর মতে, হাটটি এখন এই অঞ্চলে ইতিহাস–ঐতিহ্যের অংশ হয়ে গেছে। তিনি জানান, হাটের সুবিধা বাড়াতে, বিশেষ করে শৌচাগার নির্মাণের জন্য ১ লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
যেভাবে হাটের এই ঐতিহ্যের শুরু
জনশ্রুতি আছে, ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝি কটিয়াদীর চারিপাড়া গ্রামের সামন্ত রাজা নবরঙ্গ রায় নিজের রাজপ্রাসাদে দুর্গাপূজার আয়োজন করতেন। পূজার জন্য সেরা ঢাকির দল খুঁজতে তিনি বিক্রমপুর পরগনায় আমন্ত্রণ পাঠান। নৌপথে ঢাকিরা এসে জড়ো হন পুরোনো ব্রহ্মপুত্র নদের তীরের যাত্রাঘাটে। রাজা নিজে একে একে তাঁদের বাজনা শুনে সেরা দল বেছে নেন ও পুরস্কৃত করেন। সেখান থেকেই ঢাকের হাটের প্রচলন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। পরে হাট স্থানান্তরিত হয় পুরান বাজারে।
এখনো হাটে এসে ঢাকিরা দল বেঁধে বাজনা বাজান। পূজারিরা শুনে দল বাছেন। তবে প্রযুক্তির সহজলভ্যতায় এই রীতির পরিসর ছোট হচ্ছে। বায়না না পেয়েই অনেক ঢাকিকে বাড়ি ফিরতে হয়। সে ক্ষেত্রে তাঁদের খাওয়া ও যাতায়াত খরচ দেয় হাট ব্যবস্থাপনা কমিটি।
আয়োজকদের মতে, নিশিকান্ত মণি দাসের মতো অনেক ঢাকি প্রতিবছর এই হাটে ফিরে আসেন। তাঁদের কাছে এই হাট শুধু বায়না পাওয়ার জায়গা নয়; পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য, পেশার মর্যাদা আর দুর্গাপূজার আগমনী আনন্দের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক মায়ার নাম।