
ফেনীতে প্রবাসীর স্ত্রী রিনা আক্তারকে হত্যা করে মরদেহ বালুচাপা দেওয়ার ঘটনায় গ্রেপ্তার একমাত্র আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। শুক্রবার বিকেলে ফেনীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. মোরশেদ মাহমুদ খানের আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন তিনি।
গ্রেপ্তার আসামির নাম সাইফুল ইসলাম (২৯)। তিনি ফেনী সদর উপজেলার শর্শদি ইউনিয়নের মোহাম্মদ আলী বাজার এলাকার চোছনা গ্রামের আবুল খায়েরের ছেলে। সাইফুল নির্মাণাধীন ওই ভবনে রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ করতেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও পিবিআইয়ের পরিদর্শক মোহাম্মদ কাউসার আলম ভূঁইয়া আদালতে আসামির জবানবন্দি দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। পুলিশ জানায়, খুনের পর আসামি মুঠোফোন বন্ধ করে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান। তবে যাওয়ার আগে যেসব নম্বরে যোগাযোগ করেন, সেই নম্বরগুলো চিহ্নিত করে নজরদারি করা হয়। এভাবে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পিবিআই ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, সৌদিপ্রবাসী মোহাম্মদ মানিকের নির্মাণাধীন ভবনে কাজ করতেন সাইফুল ইসলাম। সম্প্রতি একটি এনজিও থেকে ঋণ নেওয়ার পর কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে না পারায় ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের ভর্ৎসনার মুখে পড়েন তিনি। এতে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন সাইফুল।
১২ মে বিকেলে প্রবাসী মানিকের স্ত্রী রিনা আক্তার নির্মাণাধীন ভবনটি দেখতে গেলে সেখানে আগে থেকেই অবস্থান করছিলেন সাইফুল। জবানবন্দিতে তিনি বলেন, রিনার কানে থাকা স্বর্ণের দুল দেখে তা ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেন। একপর্যায়ে পেছন থেকে তাঁর গলায় হাত পেঁচিয়ে ধরেন। দুল খুলে নেওয়ার সময় গলায় অতিরিক্ত চাপ পড়লে শ্বাসরোধে রিনার মৃত্যু হয়।
পরে মরদেহ লুকাতে নির্মাণাধীন ঘরের মেঝের বালু সরিয়ে সেখানে রিনার মরদেহ চাপা দেন সাইফুল। এরপর সিমেন্টের খালি বস্তা ও বালু চালানোর যন্ত্র দিয়ে স্থানটি ঢেকে রেখে পালিয়ে যান। সন্ধ্যায় নিহত রিনার ছোট ছেলে ঘটনাস্থলে এলে তাকে ভুল বুঝিয়ে সরিয়ে দেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়।
আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে সাইফুল আরও বলেন, রিনার কান থেকে খুলে নেওয়া এক জোড়া স্বর্ণের দুল স্থানীয় একটি স্বর্ণের দোকানে ১৫ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করেন। পরে হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি এলাকায় জানাজানি হলে তিনি মুঠোফোন বন্ধ করে চট্টগ্রামে পালিয়ে যান। সেখানে বন্ধুদের সঙ্গে অবস্থান করেন এবং বিক্রি করা স্বর্ণের টাকায় ইয়াবা সেবন করেন।
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) ফেনীর পুলিশ সুপার উক্য সিং মারমা বলেন, নিহত রিনা আক্তারের বড় ছেলে মহররম আলী বাদী হয়ে ফেনী মডেল থানায় হত্যা মামলা করেন। এরপর থানা-পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ, র্যাবসহ বিভিন্ন সংস্থার পাশাপাশি তদন্তে নামে পিবিআই। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ঘটনার ৪০ ঘণ্টার মধ্যে বৃহস্পতিবার দুপুরে চট্টগ্রামের নাসিরাবাদ এলাকা থেকে সাইফুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যার দায় স্বীকার করেন।
স্বর্ণ বিক্রির দোকানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না—এমন প্রশ্নে পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার বলেন, বিক্রি করা স্বর্ণের পরিমাণ খুবই কম ছিল। এ ধরনের স্বল্প পরিমাণ স্বর্ণ কেউ বিক্রি বা বন্ধক রাখতে পারেন। তাই ওই দোকানিকে এ মামলায় সম্পৃক্ত করার মতো তথ্য পাওয়া যায়নি।
তদন্ত কর্মকর্তা কাউসার আলম ভূঁইয়া বলেন, পুলিশকে দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শুক্রবার বিকেলে আদালতে সাইফুলের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। তিনি আদালতেও একাই হত্যাকাণ্ড ঘটানোর কথা স্বীকার করেছেন।
কাউসার আলম ভূঁইয়া আরও বলেন, সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে এর আগে ফেনী মডেল থানায় মারামারির একটি মামলা রয়েছে। স্থানীয়ভাবে তিনি মাদকসেবী হিসেবে পরিচিত হলেও তাঁর বিরুদ্ধে কোনো মাদক মামলা নেই।
ফেনী কোর্ট পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম বলেন, জবানবন্দি শেষে সন্ধ্যায় সাইফুল ইসলামকে জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
ফেনীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি ও ক্রাইম) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, রিনা আক্তারকে হত্যা করে নির্মাণাধীন ভবনের কক্ষের মেঝেতে বালুচাপা দেওয়ার ঘটনায় বুধবার অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করা হয়। ওই মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে নির্মাণশ্রমিক সাইফুল ইসলামের নাম উল্লেখ ছিল। ময়নাতদন্ত শেষে বুধবার মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।