পেঁপেবাগান করে সাফল্য পেয়েছেন কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার দরবেশপুর গ্রামের মো. আবদুল হান্নান
পেঁপেবাগান করে সাফল্য পেয়েছেন কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার দরবেশপুর গ্রামের মো. আবদুল হান্নান

দেড় লাখ খরচে ১০ লাখ টাকার পেঁপে বিক্রির আশা হান্নানের

গাছের আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত ঝুলে আছে কাঁচা পেঁপে। যত দূর চোখ যায়, শুধু পেঁপে আর পেঁপে। কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার সদকী ইউনিয়নের দরবেশপুর গ্রামের মাঠের দৃশ্য এটি। এই পেঁপেবাগান করেছেন মো. আবদুল হান্নান (৪৬)।

হান্নান উপজেলার তেবাড়ীয়া শেরকান্দী মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার ও তথ্যবিজ্ঞান বিষয়ে সহকারী শিক্ষক। তাঁর বাড়ি দরবেশপুর গ্রামে। শিক্ষকতার পাশাপাশি প্রায় তিন বিঘা জমিতে মানিকগঞ্জ শাহি দেশীয় জাতের পেঁপে চাষ করে তিনি সাফল্য পেতে শুরু করেছেন।

হান্নানের হিসাব অনুযায়ী, ৮ মাস আগে ৩ বিঘা (৩৩ শতকে ১ বিঘা) জমিতে ১ হাজার ২০০ পেঁপের চারা রোপণ করেন। সারি করে প্রতি বিঘায় রোপণ করেন ৪০০টি চারা। রোপণ ও পরিচর্যা বাবদ খরচ হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। গত মে মাসের শেষের দিকে চলতি মৌসুমের ফলন পেতে শুরু করেছেন। ২ মাসে তিনি ২০ থেকে ৬৫ টাকা কেজি দরে ২১০ মণ পেঁপে পাইকারি বিক্রি করে পেয়েছেন মোট ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী ৫ মাসে আরও ৪০০ মণ পেঁপে বিক্রি করবেন। এতে অন্তত তিন লাখ টাকা পাবেন। এ ছাড়া চলতি বছর তিনি প্রায় ৮০ কেজি বীজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছেন। প্রতি কেজি বীজ গড়ে ৭ হাজার টাকায় বিক্রি হলে সেখান থেকে পাবেন আরও প্রায় ৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে দেড় লাখ টাকা খরচের বিনিময়ে চলতি বছরে ১০ লাখ টাকার পেঁপে ও বীজ বিক্রির আশা তাঁর। এতে তাঁর খরচ বাদে লাভ থাকবে সাড়ে আট লাখ টাকা।

হান্নানের ভাগনে মো. ফাহিম। সে কুমারখালীর একটি প্রতিষ্ঠানের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। মামার পেঁপে চাষের সাফল্য দেখে ফাহিম তাদের পারিবারিক ১০ কাঠা জমিতে পেঁপে চাষ করেছে।

দরবেশপুর গ্রামের কৃষক অমল কুমার বিশ্বাস বলেন, তাঁদের এলাকায় হান্নানই প্রথম বাণিজ্যিকভাবে পেঁপে চাষ শুরু করেছেন। তাঁর কাছ থেকে বীজ নিয়ে ১৫ শতক জমিতে চাষ করে ১০ হাজার টাকা খরচ করেছেন তিনি। এখন পর্যন্ত ৩০ হাজার টাকার পেঁপে বিক্রি করেছেন।

আবদুল হান্নান একজন সফল পেঁপেচাষি। তাঁকে দেখে অন্যরা পেঁপে চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। পেঁপে চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়াতে প্রণোদনা ও কারিগরি সহযোগিতা দেওয়া হবে।
কাওসার আলী, কুমারখালী কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা

প্রায় চার বছর আগে ইউটিউব দেখে আধুনিক পদ্ধতিতে পেঁপে চাষে উদ্বুদ্ধ হন আবদুল হান্নান। পরে ২০২৩ সালে ১০০টি পেঁপেগাছ রোপণ করে সুবিধা করতে পারেননি। ২০২৪ সালে বগুড়া থেকে ৬০০টি হাইব্রিড পেঁপের চারা কিনে দেড় বিঘা জমিতে রোপণ করে লোকসানের মুখে পড়েন। তবু হাল ছাড়েননি তিনি। ২০২৫ সালের প্রথম দিকে দেড় বিঘা জমিতে মানিকগঞ্জ থেকে ৬০০টি মানিকগঞ্জ শাহি দেশীয় জাতের পেঁপের চারা এনে আবার রোপণ করেন। এসব চারা রোপণের চার মাসের মাথায় গাছে ফুল এবং পাঁচ মাসের মাথায় ফল বিক্রি শুরু করেন। এর পর থেকে তাঁর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

মানিকগঞ্জ শাহি দেশীয় পেঁপের জাত। এই জাতের পেঁপের রোগবালাই কম হয়, ফলনও ভালো হয়। শিক্ষকতার পাশাপাশি আবদুল হান্নান একজন সফল পেঁপেচাষি।
চলতি বছর কুমারখালী উপজেলায় প্রায়মো. কাওসার আলী, উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা

হান্নান বলেন, গত বছর দেড় বিঘা জমি থেকে ৪০ কেজি বীজ ও ৩১০ মণ কাঁচা পেঁপে বিক্রি করে প্রায় ৪ লাখ টাকা লাভ করেছিলেন। প্রতিটি গাছে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা খরচ করে ৬০ থেকে ১৫০ কেজি পর্যন্ত পেঁপে পাওয়া যায়। প্রতি বিঘায় ৫০ হাজার টাকা খরচ করে ২ থেকে আড়াই লাখ টাকার পেঁপে উৎপাদন সম্ভব। অল্প খরচে বেশি লাভ হওয়ায় তাঁর পেঁপে চাষের খবর আশপাশের এলাকায় ছড়িয়েছে। প্রায়ই বিভিন্ন স্থান থেকে কৃষকেরা তাঁর পেঁপেবাগান দেখতে আসছেন।

শিক্ষকতার পাশাপাশি প্রায় তিন বিঘা জমিতে মানিকগঞ্জ শাহি দেশীয় জাতের পেঁপে চাষ করে মো. আবদুল হান্নান সাফল্য পেতে শুরু করেছেন

ফেসবুকে খবর দেখে গত শুক্রবার হান্নানের বাগান ঘুরে দেখেছেন মোস্তাফিজুর রহমান নামের এক ব্যক্তি। আগামী বছর ৫০০টি বীজ নিয়ে পেঁপে চাষ শুরু করার পরিকল্পনা করছেন তিনি।

অনলাইন ও অফলাইনে বিভিন্ন জাতের পেঁপের চারা ও বীজ বিক্রি করেন মাসুদ রানা। তিনি অনেক বাগান ঘুরে দেখেছেন। মাসুদ বলেন, হান্নানের পেঁপে সবচেয়ে ভালো। আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত ফল। প্রতিটি পেঁপের ওজন দেড় থেকে ছয় কেজি পর্যন্ত। বীজের মানও ভালো।

চলতি বছর কুমারখালী উপজেলায় প্রায় ২০০ বিঘা জমিতে পেঁপের চাষ হয়েছে উল্লেখ করে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. কাওসার আলী প্রথম আলোকে বলেন, মানিকগঞ্জ শাহি দেশীয় পেঁপের জাত। এই জাতের পেঁপের রোগবালাই কম হয়, ফলনও ভালো হয়। শিক্ষকতার পাশাপাশি আবদুল হান্নান একজন সফল পেঁপেচাষি। তাঁকে দেখে অন্যরা পেঁপে চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। পেঁপে চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়াতে প্রণোদনা ও কারিগরি সহযোগিতা দেওয়া হবে।