
সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে দেশের বিভিন্ন স্থানে আজ পবিত্র ঈদুল ফিতর উদ্যাপিত হয়েছে। এক মাস সিয়াম সাধনার পর ঈদের নামাজ আদায়ের মাধ্যমে উৎসবে মাতেন এসব এলাকার মুসল্লিরা। তাঁরা শতাধিক বছর ধরে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে মিল রেখে রোজা রাখেন এবং ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা পালন করে আসছেন। নামাজ শেষে বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর শান্তি, সমৃদ্ধি এবং দেশের সার্বিক কল্যাণ কামনা করে দোয়া ও মোনাজাত করা হয়।
দক্ষিণ চট্টগ্রামের আনোয়ারা, বাঁশখালী, সাতকানিয়াসহ শতাধিক গ্রামে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদ্যাপিত হয়েছে। মির্জাখীল দরবার শরিফের অনুসরণে চট্টগ্রাম ও পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন জেলার এসব এলাকায় ঈদ উদ্যাপিত হয়।
সাতকানিয়া উপজেলার মির্জাখীল দরবার শরিফের অনুসারীরা দীর্ঘদিন ধরে হানাফি মাজহাব অনুযায়ী বিশ্বের যেকোনো স্থানে চাঁদ দেখার ভিত্তিতে রোজা, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহাসহ চন্দ্র মাস-সম্পর্কিত ধর্মীয় অনুশাসন পালন করে আসছেন। প্রায় দুই শতাব্দী ধরে এ প্রথা অনুসরণ করা হচ্ছে।
আনোয়ারা উপজেলার তৈলারদ্বীপ, বরুমচড়া গ্রামের ফুলগাজী চৌধুরীবাড়ি এবং মুহুরীবাড়িতে সকাল সাড়ে আটটার সময় ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। এর বাইরে বাঁশখালী উপজেলার কালীপুর সাহেববাড়িতে একই সময়ে জামাত অনুষ্ঠিত হয়। তবে মির্জাখীল দরবার শরিফের প্রধান খানকাহ মাঠে ঈদের প্রধান জামায়াত অনুষ্ঠিত হয়। এই জামাতে ইমামতি করেন বর্তমান সাজ্জাদানশিন হজরত ইমামুল আরেফীন মাওলানা মুহাম্মদ মকছুদুর রহমান।
ঈদ উদ্যাপনের বিষয়ে মির্জাখীল দরবার শরিফের মোহাম্মদ মছউদুর রহমান বলেন, ‘নিকটবর্তী অঞ্চলসমূহে চাঁদ দেখার সময়ের ব্যবধান, ভৌগোলিক অবস্থান (দ্রাঘিমাংশ ও অক্ষাংশ) এবং মক্কা-মদিনাসহ আরব বিশ্বের চাঁদ দেখার নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে আমরা শুক্রবার ঈদ উদ্যাপন করছি।’
দরবার সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলার বহু গ্রামে তাঁদের অনুসারীরা এদিন ঈদ উদ্যাপন করবেন। এসব এলাকার মধ্যে রয়েছে সাতকানিয়ার এওচিয়া, গাটিয়াডেঙ্গা, আলীনগর, মাদার্শা, খাগরিয়া, মৈশামুড়া, পুরানগড়, বাজালিয়া, মনেয়াবাদ, চরতি, সুঁইপুরা, হালুয়াঘোনা; চন্দনাইশের কাঞ্চননগর, হারালা, বাইনজুরি; দোহাজারী, জামিরজুরি; বাঁশখালীর কালীপুর, চাম্বল; আনোয়ারার বরুমছড়া, তৈলারদ্বীপ; লোহাগাড়ার পুঁটিবিলা, কলাউজান, চুনতী; সীতাকুণ্ডের বারিয়াঢালা, সলিমপুরসহ বিভিন্ন এলাকা। এ ছাড়া ফেনী, রাঙামাটি, কুমিল্লা, ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নরসিংদী, চাঁদপুর (মতলব), সিলেট, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, নোয়াখালী, বরিশাল, পটুয়াখালী, চুয়াডাঙ্গা, ভোলাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় এবং পার্বত্য জেলা বান্দরবান ও কক্সবাজারের বিভিন্ন উপজেলা।
এদিকে চট্টগ্রামের চন্দনাইশের জাহাঁগিরিয়া শাহ সুফি মমতাজিয়া দরবার শরিফের অনুসারীরা দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রায় ৬০ গ্রামে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদ্যাপন করেছেন। সকাল সাড়ে ৯টায় চন্দনাইশ শাহ সুফি মমতাজিয়া দরবার শরিফ প্রাঙ্গণে ওই এলাকার প্রধান ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। এতে ইমামতি করেন জাহাঁগিরিয়া শাহ সুফি মমতাজিয়া দরবারের পীর সৈয়দ মাওলানা মোহাম্মদ আলী। নামাজ শেষে মোনাজাতে বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর শান্তি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ কামনা করা হয়।
দরবারের শাহজাদা মাওলানা মো. মতি মিয়া মনছুর প্রথম আলোকে বলেন, যেহেতু গতকাল বৃহস্পতিবার তাঁদের ৩০ রোজা পূর্ণ হয়েছে এবং সৌদি আরবে গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় চাঁদ দেখা সাপেক্ষে এবং তাঁদের নির্দিষ্ট পঞ্জিকামতে আজ পবিত্র ঈদুল ফিতর পালিত হচ্ছে।
দরবার সূত্রে জানা যায়, দক্ষিণ চট্টগ্রামে যেসব জায়গায় তাঁদের অনুসারীরা আছেন যেসব জায়গায় আজ ঈদ উদ্যাপিত করা হচ্ছে।
সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে যথাযথ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে সাতক্ষীরায় ২০ গ্রামের মানুষ পবিত্র ঈদুল ফিতর উদ্যাপন করেছেন। সকাল আটটায় সাতক্ষীর সদর উপজেলার বাউকোলা পূর্বপাড়া জামে মসজিদে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। এতে ইমামতি করেন মাওলানা মহব্বত আলী।
ঈদের নামাজে সাতক্ষীরার ইসলামকাটি, গোয়ালচত্বর, ভাদড়া, ঘোনা, ভাড়খালী, মিরগিডাঙ্গাসহ প্রায় ২৫ গ্রামের মানুষ অংশ নেন। পুরুষ ও মহিলা মিলে সেখানে শতাধিক মানুষ নামাজ আদায় করেছেন।
বাউকোলা পূর্বপাড়া জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা মহাব্বত আলী বলেন, ‘আমরা রমজান মাসের চাঁদ দেখে রোজা থাকি এবং শাওয়াল মাসের ১ তারিখে চাঁদ দেখে ঈদের নামাজ আদায় করি। আমরা সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে আজ ঈদের নামাজ আদায় করেছি।’
মাদারীপুরে ঈদ উদ্যাপন করেছেন ২৫ গ্রামের ৩০ হাজার মানুষ। সদর উপজেলার পাঁচখোলা ইউনিয়নের চর কালিকাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে সকাল সাড়ে ৯টায় অনুষ্ঠিত হয় ঈদের প্রধান ও প্রথম জামাত। ঈদের নামাজে ইমামতি করেন চরকালিকাপুর ফরাজীবাড়ি জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা সিদ্দিকুর রহমান। ঈদের জামাত শেষে একে অপরে কোলাকুলি করে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেন।
জানা যায়, শরীয়তপুরের সুরেশ্বর দরবার শরিফের প্রতিষ্ঠাতা হজরত জান শরীফ শাহ সুরেশ্বরীর (রহ.) অনুসারীরা প্রায় দেড় শ বছর আগে থেকে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে মিল রেখে রোজা রাখেন এবং ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা পালন করে আসছেন। এরই ধারাবাহিকতায় চাঁদ দেখা সাপেক্ষে সৌদিসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে মিল রেখে মাদারীপুরের বিভিন্ন এলাকার মানুষ ঈদ উদ্যাপন করছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা ও সুরেশ্বর দরবার শরিফের মুরিদ সাগর দেওয়ান জানান, পূর্বপুরুষদের প্রথা অনুসারে এই ঈদ উৎসব পালন করা হচ্ছে। বছরে দুটি ঈদ ও রোজা পালন করা হয়। এতে অংশ নেন ধর্মপ্রাণ মুসলমানেরা।
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকায় সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদ্যাপন করা হয়েছে। শুক্রবার সকালে লামাপাড়া এলাকায় অবস্থিত হজরত শাহ সুফি মমতাজিয়া এতিমখানা ও হেফজখানা মাদ্রাসায় ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। সকাল সাড়ে ৯টায় অনুষ্ঠিত ওই জামাতে ‘জাহাঁগিরিয়া তরিকার’ অনুসারীরা অংশ নেন। জামাতে ইমামতি করেন মুফতি মাওলানা শাহাবুদ্দিন।
ঈদের নামাজে অংশ নিতে গাজীপুরের টঙ্গী, ঢাকার কেরানীগঞ্জ, পুরান ঢাকা, ডেমরা, সাভারসহ নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা—সিদ্ধিরগঞ্জ, রূপগঞ্জ, বন্দর, আড়াইহাজার ও সোনারগাঁ উপজেলা থেকে মুসল্লিরা সমবেত হন। নামাজ শেষে বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর শান্তি, সমৃদ্ধি এবং দেশের সার্বিক কল্যাণ কামনায় বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত করা হয়।
সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার ১২টি গ্রামের সুরেশ্বরী দরবার শরিফের ভক্তরা শুক্রবার পবিত্র ঈদুল ফিতর উদ্যাপন করছেন। সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে উপজেলার দুটি স্থানে পৃথক সময়ে মুসল্লিরা পবিত্র ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায় করেছেন। উপজেলার সদর ইউনিয়নের দশধরী গ্রামে খানকায়ে সুরেশ্বরী দরবার শরিফের কক্ষে সকাল সাড়ে নয়টার দিকে এবং একই ইউনিয়নের ধর্মপাশা উত্তরপাড়া গ্রামে খানকায়ে সুরেশ্বরী দরবার শরিফের কক্ষে সকাল ১০টার দিকে ঈদুল ফিতরের দুটি জামাত অনুষ্ঠিত হয়।
ধর্মপাশা উত্তরপাড়া খানকা শরিফের কক্ষে ঈদের নামাজ পড়ান ওই খানকার খতিব মাওলানা রিফাত নূরী আল মুজাদ্দেদী। অন্যদিকে দশধরী খানকা শরিফের কক্ষে ঈদের নামাজ পড়ান ওই খানকার খতিব মো. পলাশ মিয়া।
পলাশ মিয়া বলেন, সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে ২৯ বছর ধরে উপজেলার দশধরী গ্রামের খানকা শরিফে পবিত্র ঈদুল ফিতরের নামাজ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
রাজশাহীর পুঠিয়ায় একটি গ্রামে সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে ঈদুল ফিতরের নামাজ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সকাল আটটার দিকে উপজেলার কৃষ্ণপুর গ্রামের ফকিরপাড়া মহল্লার মুসলিম জামে মসজিদে নামাজ আদায় করেন একটি গ্রামের কিছু মুসল্লি। নামাজের ইমামতি করেন হাফেজ মো. সাজিরুল ইসলাম। নামাজে মুসল্লিদের উপস্থিত ছিল মোট ২৩ জন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সকালে মুসল্লিরা এসে কৃষ্ণপুর ফকিরপাড়ার মুসলিম জামে মসজিদের ছাদে যান। সেখানে আগে থেকেই ঈদের নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা সম্পন্ন করা হয়েছিল। ছাদের মধ্য দিয়ে কালো পর্দা টাঙিয়ে দেওয়া হয়। একই ইমামতিতে সামনে পুরুষ এবং পেছনে নারীরা নামাজ আদায় করেছেন। ঈদের নামাজ আদায় করা ব্যক্তিরা বলেন, তাঁরা প্রতিবছর সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে নামাজ আদায় করেন। এবারও করলেন।
সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে ঈদুল ফিতর উদ্যাপিত হয়েছে চাঁদপুরের অর্ধশতাধিক গ্রামে। নিজস্ব ধর্মীয় মত অনুসরণ করে চাঁদ দেখার ভিত্তিতে তাঁরা এই ঈদ পালন করছেন। দীর্ঘদিন ধরে এই রীতি অনুসরণ করে রোজা ও ঈদ পালন করে আসছেন তাঁরা।
হাজীগঞ্জ উপজেলার সাদ্রা দরবার শরিফে সকাল সাড়ে ৯টায় ওই এলাকার প্রধান ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। এতে ইমামতি করেন দরবারের পীর মুফতি জাকারিয়া চৌধুরী আল মাদানী। এ ছাড়া হাজীগঞ্জ, ফরিদগঞ্জ, মতলবসহ কচুয়া ও শাহরাস্তি উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে একযোগে এই ঈদ উদ্যাপিত হচ্ছে। এ ছাড়া চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার ১৫টি গ্রামের ৪০ হাজার মুসল্লি ঈদ উদ্যাপন করেছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, ১৯২৮ সাল থেকে সাদ্রা দরবার শরিফের প্রতিষ্ঠাতা মরহুম পীর আল্লামা মোহাম্মদ ইসহাক চৌধুরী প্রথম এই পদ্ধতি চালু করেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরসূরিরা এখনো সেই ধারা অব্যাহত রেখেছেন।
সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে মিল রেখে জামালপুরের তিন উপজেলায় ঈদুল ফিতর উদ্যাপিত হয়েছে। তিনটি উপজেলায় সকালে ১৬টি গ্রামের মানুষ ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায় করেন। সকাল সাড়ে আটটায় সরিষাবাড়ী পৌরসভার বলারদিয়ার মধ্যপাড়া মাস্টারবাড়ি জামে মসজিদ মাঠে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয়। ঈদ জামাতে ইমামতি করেন বলারদিয়ার জামে মসজিদের খতিব আজিম উদ্দিন মাস্টার। এতে অংশ নেন উপজেলার বলারদিয়ার, মূলবাড়ী, সাতপোয়া, সাঞ্চারপাড়, পঞ্চপীর, পাখাডুবি, বনগ্রাম, বালিয়া, বাউসী, হোসনাবাদ, পাটাবুগা, পুঠিয়ারপাড় ও বগারপাড় গ্রামের মানুষ। এ ছাড়া ইসলামপুর উপজেলার নোয়ারপাড়া ইউনিয়নের রামভদ্রা, সাপধরীর ইউনিয়নের পশ্চিম মণ্ডলপাড়া ও মাদারগঞ্জ উপজেলার কাজিয়ারবাড়ি গ্রামে ঈদের নামাজ আদায় করা হয়।
সরিষাবাড়ী উপজেলায় সাতপোয়া এলাকার হাসেন আলী বলেন, ‘আমি এই নিয়মে ৩০ বছর ধরে নামাজ ঈদ করে আসছি। সৌদির সঙ্গে মিলিয়ে আমরা নামাজ আদায় করি না, বরং চাঁদের ওপর নির্ভর করে নামাজ আদায় করি।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলার কয়েকটি গ্রামে ঈদ উদ্যাপন করেছেন প্রায় পাঁচ শতাধিক মানুষ। শুক্রবার সকালে সদর উপজেলার দেবীনগর ইউনিয়নের মোমিনটোলা ও বাগানপাড়া এবং শিবগঞ্জ উপজেলার বিনোদপুর ইউনিয়নের ছিয়াত্তরবিঘি ও রাধানগর গ্রামে পৃথকভাবে ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। এতে কয়েক শ মুসল্লি অংশ নেন। নামাজ শেষে মুসল্লিরা একে অপরের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় ও আনন্দ ভাগাভাগি করেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, তাঁরা কয়েক বছর ধরে সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে রোজা পালন ও ঈদ উদ্যাপন করে আসছেন। সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কয়েকটি স্থানে ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা নিশ্চিত করেছেন ইসলামিক ফাউন্ডেশন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের উপপরিচালক গোলাম মোস্তফা।
ফরিদপুরের বোয়ালমারী ও পাশের আলফাডাঙ্গা উপজেলার ১২টি গ্রামের মানুষ সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে মিল রেখে ঈদুল ফিতর উদ্যাপন করেছেন। উপজেলার শেখর ও রূপাপাত ইউনিয়নের এসব গ্রামের বাসিন্দারা রোজা ও ঈদ নিয়ে এ নিয়ম অনুসরণ করে থাকেন। এসব গ্রামের মানুষ চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার মাহমুদাবাদ মির্জাখিল দরবার শরিফের অনুসারী।
তিনটি ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয় বোয়ালমারীর শেখর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে। প্রথম জামাত অনুষ্ঠিত হয় মাইটকুমড়া গ্রামে সকাল সাড়ে আটটার দিকে। দ্বিতীয় জামাত অনুষ্ঠিত হয় সকাল সোয়া নয়টার দিকে রাখালতলী গ্রামে এবং তৃতীয় ও সর্বশেষ জামাত অনুষ্ঠিত হয় সকাল সাড়ে ১০টার দিকে শেখর ইউনিয়নের সহস্রাইল গ্রামে। এর মধ্যে সহস্রাইল গ্রামের ঈদের জামাত সবচেয়ে বড় হয়। এ জামাতে পাঁচ শতাধিক ব্যক্তি অংশ নেন। অন্য দুটি জামাত ধরে সহস্রাধিক ব্যক্তি ঈদের নামাজ আদায় করেন।
নামাজ আদায় শেষে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা উৎসবমুখর পরিবেশ কোলাকুলি করে পারস্পরিক কুশল বিনিময় করেন। ঈদের নামাজে অংশ নেওয়া স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এটি কোনো নতুন ঘটনা নয়; বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা একটি ধর্মীয় রীতি। এ বিষয়ে সহস্রাইল দায়রা শরিফের সমন্বয়কারী মো. মাহিদুল হক বলেন, ‘আমরা চট্টগ্রামের মির্জাখিল শরিফের অনুসারী। সেখানকার সিদ্ধান্ত এবং সৌদি আরবের চাঁদ দেখার ভিত্তিতে আমরা রোজা ও ঈদ উদ্যাপন করে থাকি। সে অনুযায়ী এবারও আমরা এক দিন আগে ঈদ উদ্যাপন করেছি।’
নওগাঁ
নওগাঁর পত্নীতলা উপজেলায় ঈদুল ফিতরের নামাজ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওই গ্রামের মুসল্লিদের একটি অংশ প্রতিবছরের মতো এবারও এক দিন আগে ঈদ উদ্যাপন করছেন। সকাল ৮টায় উপজেলার নজিপুর পৌরসভার ৩ নং ওয়ার্ডের কলোনিপাড়ায় এ জামাত অনুষ্ঠিত হয়। এতে ইমামতি করেন মাওলানা মো. কামারুজ্জামান। নামাজে কয়েকটি এলাকার নারী-পুরুষসহ প্রায় ১০০ জন মুসল্লি অংশ নেন। ঈদের নামাজ আদায়ের পর একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি করেন তাঁরা। জামাতে অংশ নেওয়া মুসল্লিরা নামাজ শেষে দেশ, জাতি ও মুসলিম উম্মাহর শান্তি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ কামনায় বিশেষ মোনাজাত করেন।
পটুয়াখালী
সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে মিল রেখে পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় আটটি গ্রামের অন্তত ১০ হাজার মানুষ আজ পবিত্র ঈদুল ফিতর উদ্যাপন করেছেন। তাঁরা মূলত চট্টগ্রামের এলাহাবাদ দরবার শরিফের অনুসারী। সকাল সাড়ে নয়টায় কলাপাড়া উপজেলার ধানখালী ইউনিয়নের উত্তর নিশানবাড়িয়া জাহাগারিয়া শাহ সুফি মমতাজিয়া দরবার শরিফ মাঠে এলাকার প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয়। এ ছাড়া চম্পাপুর, সাফাখালী, লালুয়া, ফুলতলী, পাঁচজুনিয়া, বালিয়াতলী ও কলাপাড়া পৌর শহরের নাইয়াপট্টিতে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। ঈদুল ফিতর উপলক্ষে সকাল থেকে এসব গ্রামে বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ।
দিনাজপুর
দিনাজপুরের বিরামপুরে দুটি পৃথক স্থানে প্রায় ২০টি গ্রামের মুসল্লিদের অংশগ্রহণে পবিত্র ঈদুল ফিতরের নামাজের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। সকাল ৮টা থেকে সকাল ৯টার মধ্যে এসব স্থানে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। বিরামপুর উপজেলার ৫ নং বিনাইল ইউনিয়নের আয়ড়া নূরুল হুদা দাখিল মাদ্রাসা মাঠে মাওলানা আল আমিন ও ৬ নং জোতবানী ইউনিয়নের খয়েরবাড়ি-মির্জাপুর গ্রামে মেহেদী হাসানের বাড়ির উঠানে মাওলানা দেলোয়ার হোসেন কাজী ঈদের জামাতের ইমামতি করেন। দুই জামাতে উপজেলার প্রায় ২০টি গ্রামের দেড় শতাধিক নারী-পুরুষ ও শিশু মুসল্লি অংশগ্রহণ করেন।
এ ছাড়া দিনাজপুর সদরের বাসুনিয়াপট্টি পার্টি সেন্টারে আহলে হাদিস আস সুন্নাহ কর্তৃক, চিরিরবন্দর উপজেলার জগন্নাথপুর কালীতলা বাজারের পাশে চিরি নদীর তীরে মাঠে, কাহারোল উপজেলার ২ নং রসুলপুর ইউনিয়নের ভবানীপুর গোরস্তান ঈদগাঁ মাঠে ও বিরল উপজেলার ধর্মপুর ইউনিয়নের বনগাঁও আহলুল হাদিস জামে মসজিদে ঈদুল ফিতরের নামাজ অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিষয়টি দিনাজপুর জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) আনোয়ার হোসেন নিশ্চিত করেছেন।
ফেনী
ফেনীর তিনটি স্থানে সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে ঈদুল ফিতর উদ্যাপিত হচ্ছে। সকালে ফেনী সদর ও পরশুরাম উপজেলার পৃথক তিনটি স্থানে ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। তিনটি স্থানে অনুষ্ঠিত নামাজে শতাধিকের ওপরে মুসল্লি অংশগ্রহণ করেন। এর মধ্যে ফেনী সদর উপজেলার ফরহাদনগর ইউনিয়নের পূর্ব সুলতানপুর ৭ নং ওয়ার্ডের পৃথক দুটি পাড়া ও পরশুরাম পৌরসভার দক্ষিণ কোলাপাড়া এলাকায় ঈদুল ফিতরের জামাত অনুষ্ঠিত হয়।
ফেনী সদর ফরহাদনগর ইউনিয়নের পূর্ব সুলতানপুর ৭ নম্বর ওয়ার্ডের শাহ আমানিয়া জাহাগিরিয়া দরবার শরিফের পীর মুফতি মাওলানা গোলাম নবী আল কাদেরীর ইমামতিতে শতাধিক মুসল্লি ঈদের নামাজ আদায় করেন। একই সময় গ্রামের অপর একটি অংশ পূর্ব সুলতানপুর রশিদিয়া দরবার শরিফের মরহুম মাওলানা গোলাম কিবরিয়া পীরমিয়ার ছেলে মুহাম্মদ সুলতান মাহমুদের নেতৃত্বে আরেকটি জামাতে ঈদের নামাজ আদায় করেন অর্ধশতাধিক মুসল্লি।
পূর্ব সুলতানপুর শাহ আমানিয়া জাহাগিরিয়া দরবার শরিফের পীর মুফতি মাওলানা গোলাম নবী আল কাদেরী বলেন, ‘আরবি মাস ও চাঁদের সঙ্গে মিল রেখে হাদিসের ব্যাখ্যা ও শরিয়তের বিধান অনুযায়ী আমরা ঈদ উদ্যাপন করছি। সকাল থেকে গ্রামের মুসল্লিদের পাশাপাশি আশপাশের এলাকা ও চট্টগ্রাম থেকে মুসল্লিরা এই ঈদগাহে সমবেত হয়। তাঁরা উৎসবমুখর পরিবেশে ঈদগাহে আসে। প্রায় দুই শতাধিক মানুষের উপস্থিতিতে সুশৃঙ্খলভাবে নামাজ শেষ হয়েছে। নামাজে আগত মুসল্লিরা নামাজ শেষে কোলাকুলি করে ঈদ উদ্যাপন করেছেন।’
ফেনীর পুলিশ সুপার মো. শফিকুল ইসলাম তিনটি স্থানে ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে জানিয়ে বলেন, সৌদি আরবকে অনুসরণ করে জেলায় তিনটি স্থানে মুসল্লিরা সুন্দরভাবে ঈদের নামাজ আদায় করেছে। কোথাও কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা যেন না ঘটে, সে বিষয়ে কঠোর নজর ছিল। তবে সারা দেশের মতো ফেনীতেও আগামীকাল ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা ঈদের নামাজ আদায় করবেন। সে অনুযায়ী সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
কুড়িগ্রাম
কুড়িগ্রামের অন্তত ছয়টি গ্রামে আগাম ঈদুল ফিতরের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। শুক্রবার সকালে জেলার ভূরুঙ্গামারী, ফুলবাড়ী, রৌমারীসহ পাঁচ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে এসব জামাত অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে ফুলবাড়ী উপজেলার সদর ইউনিয়নের জেলেপাড়া আহলে হাদিস জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে সকাল ৮টা ৪৫ মিনিটে ঈদের জামাত হয়। এতে শতাধিক মুসল্লি অংশ নেন। জামাতে ইমামতি করেন মাওলানা আব্দুল মালেক। নামাজ শেষে দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়।
মুসল্লিরা জানান, তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে ঈদ উদ্যাপন করে আসছেন। তবে আজ সকালে বৃষ্টির কারণে কিছু এলাকায় মুসল্লির উপস্থিতি তুলনামূলক কম ছিল। ইমাম মাওলানা আবদুল মালেক বলেন, পাঁচ থেকে ছয় বছর ধরে জেলেপাড়া জামে মসজিদে সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে ঈদ উদ্যাপন করা হচ্ছে। আগামীতে মুসল্লিদের অংশগ্রহণ আরও বাড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
রংপুর
রংপুরের গঙ্গাচড়ার একটি গ্রামে সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে ঈদুল ফিতর উদ্যাপন করা হয়েছে। সকাল ১০টায় উপজেলার বড়বিল ইউনিয়নের বাগপুর পূর্ব মৌলভীপাড়া মসজিদে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। এতে আশপাশের গ্রামের প্রায় ৩০০ জন মুসল্লি অংশ নেন।
স্থানীয় লোকজন জানান, ১৯৮৬ সালে এ গ্রামের মাওলানা আবদুর রশীদ বাদশা ২০ থেকে ৪০ জন মুসল্লি নিয়ে সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে রোজা এবং ঈদ উদ্যাপনের এই প্রথা প্রথম শুরু করেন। ঈদের জামাতে তিনি ইমামতি করেন। তখন থেকে সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে এ গ্রামে ঈদ উদ্যাপন হয়ে আসছে। ২০২২ সালে মাওলানা আবদুর রশীদের মৃত্যুর পর তাঁর বড় ছেলে মাওলানা আবদুল বাতেন ২০০টি পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে সৌদি আরবের সাঙ্গে মিল রেখে ঈদের নামাজ আদায় করে আসছেন।
[প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম, সাতক্ষীরা, নিজস্ব প্রতিবেদক, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ফরিদপুর, রংপুর; প্রতিনিধি, পটিয়া, মাদারীপুর, নারায়ণগঞ্জ, ধর্মপাশা, রাজশাহী, জামালপুর, চাঁদপুর, মতলব উত্তর, নওগাঁ, বিরামপুর, পটুয়াখালী, ফেনী, কুড়িগ্রাম]