ইউনিয়ন পরিষদের নির্দিষ্ট কক্ষে চলে গ্রাম আদালতের কার্যক্রম। সেখানে বিচারপ্রার্থী ও তাঁদের লোকজনের ভিড়। গত মঙ্গলবার দুপুরে বগুড়ার শেরপুর উপজেলার কুসুম্বি ইউপিতে
ইউনিয়ন পরিষদের নির্দিষ্ট কক্ষে চলে গ্রাম আদালতের কার্যক্রম। সেখানে বিচারপ্রার্থী ও তাঁদের লোকজনের ভিড়। গত মঙ্গলবার দুপুরে বগুড়ার শেরপুর উপজেলার কুসুম্বি ইউপিতে

মঙ্গলবার এলেই বসে গ্রাম আদালত, ছোটখাটো বিরোধ বড় হওয়ার আগেই মীমাংসা

বন্ধক রাখা জমি চাষাবাদ করা নিয়ে বিরোধে জড়িয়েছিলেন কৃষক জমির উদ্দিন। পারিবারিকভাবে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করেও সমাধান হয়নি। শেষ পর্যন্ত তিনি যান ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) গ্রাম আদালতে। দুই পক্ষের বক্তব্য শুনে সেখানেই বিরোধ মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

শেষ পর্যন্ত সেখানে বিরোধ নিষ্পত্তি হওয়ায় স্বস্তি পেয়েছেন বগুড়ার শেরপুর উপজেলার কুসুম্বি ইউনিয়নের দক্ষিণ আমইন গ্রামের বাসিন্দা জমির উদ্দিন (৪২)। তিনি বলেন, গ্রাম আদালতে যাওয়ার পর দুই পক্ষের কথা শুনে বিষয়টি মীমাংসা করা হয়েছে। এতে তাঁর সময় ও হয়রানি দুটিই কমেছে।

জমির উদ্দিনের মতো স্থানীয় অনেক মানুষ গ্রাম আদালতে এসে ছোটখাটো বিরোধের সমাধান পাচ্ছেন। শেরপুর উপজেলার ১০টি ইউপিতে প্রতি সপ্তাহের মঙ্গলবার বসছে গ্রাম আদালত। জমিজমা, পাওনা টাকা, পারিবারিক বিরোধ ও সামান্য মারধরের মতো অভিযোগের শুনানি হচ্ছে সেখানে।

গত মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) বেলা আড়াইটায় কুসুম্বি ইউপি কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন গ্রাম থেকে নারী-পুরুষ মিলিয়ে আটজন বিচারপ্রার্থী এসেছেন। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন উভয় পক্ষের সাক্ষীরাও। কেউ শুনানির অপেক্ষায়, কেউ আবার রায় বা সমঝোতার আশায় অপেক্ষা করছেন। বিচার দেখতে জড়ো হয়েছেন স্থানীয় লোকজনও।

গ্রাম আদালতের সামনে অপেক্ষা করছিলেন কুসুম্বি ইউনিয়নের আদুরী খাতুন (৪০)। তিনি জানান, প্রায় সাত বছর আগে সোয়া দুই শতক জমি কিনেছিলেন। জমির আরেক শরিক পরে অন্য একজনের কাছে জমি বিক্রি করেন। এ নিয়ে গ্রাম আদালতে বিচারপ্রার্থী হন তিনি। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে তাঁর পক্ষে সিদ্ধান্ত হওয়ায় তিনি খুশি।

উত্তর পেচুল গ্রামের সুলতান প্রামাণিক (৫৫) এসেছেন পারিবারিক গোরস্তানের তিন শতক জায়গা নিয়ে বিরোধের শুনানিতে। প্রতিপক্ষ তাঁর বড় ভাই। আর বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার সোলধুকরি গ্রামের আবেদা খাতুন (৫০) এসেছেন শ্বশুরবাড়ির লোকজনের সঙ্গে পারিবারিক বিরোধের অভিযোগ নিয়ে। তাঁর শ্বশুরবাড়ি কুসুম্বি ইউনিয়নের উত্তর আমইন গ্রামে।

দুই পক্ষের বক্তব্য শুনে ছোটখাটো বিরোধের সমাধান দেওয়া হয় গ্রাম আদালতে। গত মঙ্গলবার দুপুরে বগুড়ার শেরপুর উপজেলার কুসুম্বি ইউপিতে

বেলা একটার দিকে খামারকান্দি ইউনিয়ন পরিষদে গিয়েও গ্রাম আদালতের কার্যক্রম চলতে দেখা যায়।

খামারকান্দি ইউপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মাজেদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ইউপি চেয়ারম্যানসহ পাঁচ সদস্যের একটি দল গ্রাম আদালতের বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। এতে দুই ইউপি সদস্য এবং বাদী-বিবাদী উভয় পক্ষের দুজন করে গণ্যমান্য ব্যক্তি থাকেন। গত আগস্টে তাঁদের ইউনিয়নে চারটি মামলার মধ্যে তিনটি নিষ্পত্তি হয়েছে। মঙ্গলবারও উভয় পক্ষের জমিজমা বিরোধ নিয়ে একটি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে।

উপজেলার গাড়িদহ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তবিবুর রহমান বলেন, গত মাসে তাঁর ইউনিয়নে সাতটি মামলা ছিল। এর মধ্যে দুটি নিষ্পত্তি হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত আগস্ট মাসে শেরপুরের ১০টি ইউনিয়নের গ্রাম আদালতে মোট ৮৮টি অভিযোগ বিবেচনায় আসে। এর মধ্যে ৪৮টি নিষ্পত্তি হয়েছে।

এ নিয়ে শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাইদুজ্জামান হিমু বলেন, প্রতি সপ্তাহের মঙ্গলবার উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে গ্রাম আদালত বসছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বাড়ির কাছেই ছোটখাটো বিরোধের সমাধানের সুযোগ পাচ্ছেন। গ্রাম আদালত সচল রাখতে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

ইউপি চেয়ারম্যান ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গ্রাম আদালতে সবচেয়ে বেশি আসে জমিজমা নিয়ে বিরোধ, পারিবারিক কলহ, সামান্য মারধর ও পাওনা টাকা আদায়ের অভিযোগ। দুই পক্ষের বক্তব্য শোনা এবং স্থানীয়ভাবে বিষয়টি যাচাই করে বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়।

উপজেলার কুসুম্বি এলাকার আবদুল হামিদ (৬০) ও খামারকান্দি ইউনিয়নের আবদুস সালামসহ ওই ইউনিয়নের স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, বাড়ির কাছেই ছোটখাটো বিরোধের বিচার পাওয়ার সুযোগ থাকায় মানুষের ভোগান্তি কমছে। সামান্য বিরোধকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের ঝামেলা বা বড় ধরনের বিরোধে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও কমছে।