কানাডীয় বংশোদ্ভূত ফরাসি শিল্পী ডানা ওয়াইজ তাঁর শিল্পকর্মের সামনে দাঁড়িয়ে। গত সোমবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম নগরের অলিয়ঁস ফ্রঁসেজ মিলনায়তনে
কানাডীয় বংশোদ্ভূত ফরাসি শিল্পী ডানা ওয়াইজ তাঁর শিল্পকর্মের সামনে দাঁড়িয়ে। গত সোমবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম নগরের অলিয়ঁস ফ্রঁসেজ মিলনায়তনে

‘চট্টগ্রাম তো একটা জীবন্ত আর্ট গ্যালারি’

ডানা ওয়াইজের জন্ম ও বেড়ে ওঠা কানাডায়। বর্তমানে স্থায়ীভাবে বসবাস ফ্রান্সের প্যারিসে। কানাডীয় বংশোদ্ভূত এই ফরাসি শিল্পী তাঁর  ভিন্নধর্মী ব্যঙ্গাত্মক শিল্পকর্মের জন্য সারা বিশ্বে পরিচিতি পেয়েছেন। ফরাসি দৈনিক ল্য মোঁদ, যুক্তরাজ্যের দ্য গার্ডিয়ান, কানাডার ভ্যাঙ্কুভার সানসহ বিশ্বের একাধিক দৈনিকের শিরোনাম হয়েছেন তিনি। ২০২৩ সালে তাঁর একটি শিল্পকর্ম নিয়ে টুইট করেছিলেন মার্কিন ধনকুবের ও প্রযুক্তিবিশ্বের শীর্ষ উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক। আলোচিত শিল্পী ডানা ওয়াইজ গত সপ্তাহে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে আসেন। সফরের শুরু চট্টগ্রাম থেকে। সপ্তাহব্যাপী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অংশ নেন কর্মশালায়। এর ধারাবাহিকতায় ২৫ জানুয়ারি নগরের আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে হয়ে গেল ডানা ওয়াইজ ও স্থানীয় শিল্পীদের কাজ নিয়ে এক যৌথ প্রদর্শনী। প্রদর্শনীর এক ফাঁকে তিনি কথা বললেন প্রথম আলোর সঙ্গে, তুলে ধরলেন বাংলাদেশ নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথা।    

মাথায় উলের বিনি টুপির ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছিল সাদা চুল। কালো সোয়েটার পরা হালকা-পাতলা গড়নের ডানা ওয়াইজ একমনে সই করে যাচ্ছিলেন ক্যাটালগ বইয়ে। তাঁর চারপাশে চারুকলার শিক্ষার্থীদের ভিড়। কেউ ছবি তুলছিলেন, কেউ নিচ্ছিলেন অটোগ্রাফ। একটা ক্যাটালগ বইয়ের শেষ পাতায় নিজের হাত রেখে মার্কার দিয়ে চারপাশে রেখা টানলেন। নিজের হাতের ছাপ এঁকে বইটা তুলে দিলেন চারুকলার এক শিক্ষার্থীর হাতে। পেছনের দেয়ালে ঝোলানো ডানার শিল্পকর্ম ঘিরে দর্শকের ভিড় তখন কমে এসেছে। কাছে যেতেই দেখা গেল, ছোট প্লাস্টিকের জিপলগ ব্যাগে নানা রঙের ক্যাপসুল আর ট্যাবলেট পিন দিয়ে সেঁটে দেওয়া হয়েছে সাদা বোর্ডে। একটা প্লাস্টিকের ব্যাগে সাদা, সবুজ ক্যাপসুল। ব্যাগের লেবেলে লেখা, ‘ফেইম ক্যাপসুল’; অর্থাৎ বিখ্যাত হওয়ার ক্যাপসুল। ডানার এমন সব অদ্ভুত বটিকার প্রতিটির নাম রয়েছে। গিটারের শিল্পী হওয়ার, কোনোটি স্বপ্ন দেখার, লেখক হওয়ার, ফরাসি ভাষা শেখা থেকে শুরু করে সবকিছুরই সমাধান নিয়ে হাজির এসব ক্যাপসুল।

৩০ বছর আগে ক্যাপসুল সিরিজের কাজ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত এক মিলিয়ন ‘ক্যাপসুল আর্ট’ বিক্রি করেছেন ডানা ওয়াইজ। মার্কিন ভোগ্যপণ্যের বিজ্ঞাপনের ভাষা আর ভোগবাদী দুনিয়াকে ব্যঙ্গ করতেই অনেকটা খেয়ালের বশে তাঁর ‘ক্যাপসুল সিরিজের’ শুরু। নিজস্ব শিল্পদর্শন নিয়ে বিশ্বের নানা দেশে প্রদর্শনী করেছেন তিনি। দক্ষিণ এশিয়ার কোনো দেশে আগে আসেননি। প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে এসে ভীষণ মুগ্ধ।

প্রায় ঘণ্টাখানেকের আলাপে ডানা বারবার ফিরে আসছিলেন চট্টগ্রাম প্রসঙ্গে। জানালেন ফটিকছড়ির মাইজভান্ডার শরিফ ভ্রমণ, সেখানে গান শোনা, সুফিসাধকের সঙ্গে ইসলাম নিয়ে আলাপের নানা কথাও। চট্টগ্রামের খাবার বিক্রির ভ্যানগুলোর ছবি তুলতে গিয়ে তাঁর যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, জানালেন সেটাও।

আলাপের শুরুতে জানতে চাই, কেমন লাগছে চট্টগ্রাম। ডানা ওয়াইজ এই প্রশ্নে যেন টগবগ করে উঠলেন। বললেন, ‘ভীষণ ভীষণ ভালো। আমি তো প্রেমে পড়ে গেছি। চট্টগ্রামের রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে মনে হয়, ইতিহাস আর বর্তমান পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। পর্তুগিজ, ইংরেজ, মোগল সবার ইতিহাস রয়ে গেছে। এত শব্দ, এত প্রাণ, এত হাসি আগে কোথাও দেখিনি। গোটা চট্টগ্রামই যেন একটা আর্ট গ্যালারি।’

বিজ্ঞপনের ভাষাকে ব্যঙ্গ করে তৈরি হয় ডানা ওয়াইজের শিল্পকর্ম। ‘ফরাসি বলুন’ শিরোনামে তাঁর একটি শিল্পকর্ম

চট্টগ্রামকে কেন আর্ট গ্যালারি মনে হলো, জানতে চাইলে ডানা বললেন, ‘আমি এখানকার দেয়ালগুলোতে অনেক ছবি, লেখা দেখলাম। এরপর রিকশা-সিএনজি অটোরিকশাসহ যানবাহনগুলো এমন সাজে সাজানো, যাকে চলমান শিল্প মনে হয়েছে। যেদিকে তাকাই, শিল্পের উপাদান। মানুষের রঙিন দাড়ি, রংবেরঙের শাড়ি, বৈদ্যুতিক খুঁটির জট পাকানো তার—সবকিছু খুব আকর্ষণীয়।’

১৯৮৩ সালে কানাডার ক্যারিবু কলেজ থেকে পাস করে প্যারিসে পাড়ি জমান ডানা। বর্তমানে কাজ করছেন ফ্রান্সের ‘সরবোর্ন’ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে। ডানার মতে তিনি একটি আশ্চর্য ওষুধ কোম্পানির মালিক। কোম্পানির নামও দিয়েছেন তিনি, ‘জেসাস হ্যাড আ সিস্টার প্রোডাকশনস’। ডানার এই কাল্পনিক ওষুধ কোম্পানির উৎপাদিত ক্যাপসুলের লেবেলে সবকিছুর সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয়। হারানো প্রেম ফিরে পাওয়া থেকে ঈশ্বরবিশ্বাস—সবই মিলবে এক ডোজে।

ঘণ্টাখানেকের আলাপে ডানা বারবার ফিরে আসছিলেন চট্টগ্রাম প্রসঙ্গে। জানালেন ফটিকছড়ির মাইজভান্ডার শরিফ ভ্রমণ, সেখানে গান শোনা, সুফিসাধকের সঙ্গে ইসলাম নিয়ে আলাপের নানা কথাও। চট্টগ্রামের খাবার বিক্রির ভ্যানগুলোর ছবি তুলতে গিয়ে তার যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, জানালেন সেটাও। বললেন, ‘ছবি তুলতে গিয়েছি আনারসের; কিন্তু তোলার পর দেখলাম, আনারসের সঙ্গে একই ফ্রেমে অন্তত ৩০ জন মানুষ। এটা অভাবনীয়, খুবই মজার। ফরাসি শিল্পীরা জীবনের খোঁজ করে, শব্দের খোঁজ করে। কিন্তু খুঁজে পায় না অনেক সময়। এখানে তা এতই প্রচুর যে মনে হয়, এ দেশের জন্য কোনো শিল্পকর্মের প্রয়োজন নেই। দেশটাই পুরো শিল্পকর্ম।’

ইনজেকশন নিয়ে হয়ে যান বেস্ট সেলার লেখক। ডানা ওয়াইজের আরেকটি শিল্পকর্ম

ডানা ওয়াইজের জন্ম ও বেড়ে ওঠা কানাডায়। বর্তমানে স্থায়ীভাবে বসবাস ফ্রান্সের প্যারিসে। ১৯৮৩ সালে কানাডার ক্যারিবু কলেজে (বর্তমানে থম্পসন রিভারস ইউনিভার্সিটি) থেকে পাস করে প্যারিসে পাড়ি জমান। তাঁর ভাষায়, এক ফরাসি ভদ্রলোকের প্রেমে পড়ে ফ্রান্সে আসা। বর্তমানে কাজ করছেন ফ্রান্সের ‘সরবোর্ন’ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে। ডানার মতে, তিনি একটি আশ্চর্য ‘ওষুধ কোম্পানির’ মালিক। কোম্পানির নামও দিয়েছেন তিনি, ‘জেসাস হ্যাড আ সিস্টার প্রোডাকশনস’। ডানার এই কাল্পনিক ওষুধ কোম্পানির উৎপাদিত ক্যাপসুলের লেবেলে সবকিছুর সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয়। হারানো প্রেম ফিরে পাওয়া থেকে ঈশ্বরবিশ্বাস—সবই মিলবে এক ডোজে।

১৯৬০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের লেবেলে বিজ্ঞাপনের যে ভাষা ব্যবহার করা হতো, সে ভাষারই ব্যঙ্গাত্মক রূপ হাজির করেছেন ডানা তাঁর শিল্পকর্মে। জানতে চাইলাম, এমন অদ্ভুতুড়ে ভাবনা কীভাবে মাথায় এল?

ডানা বললেন, আজ থেকে ৩০ বছর আগে এক লোকের প্রেমে পড়ে কানাডা থেকে প্যারিস চলে যাই। তখন একবিন্দু ফরাসিও জানতাম না। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে খেয়াল করলাম, প্রায় প্রতিটি রাস্তায় ফার্মেসি আছে। ফেলে দেওয়া অনেক ক্যাপসুলও দেখলাম। হঠাৎ ভাবনা এল, যদি এমন কোনো ক্যাপসুল পাওয়া যেত, যেটা খেলেই ফরাসি বলতে পারতাম। সে ভাবনা থেকে প্লাস্টিকের ব্যাগে ক্যাপসুল ভরে লেবেলে লিখলাম, ‘ফরাসি শেখার ক্যাপসুল’। এভাবে বেশ কয়েকটি ভিন্ন ভিন্ন কাজ তৈরি হলো। এর মধ্যে ফরাসি একটা পত্রিকা সেটা নিয়ে কভার স্টোরিও করল। রাতারাতি পরিচিতি পেয়ে গেলাম।’ এরপর ফরাসি দৈনিক ল্য মোঁদ, যুক্তরাজ্যের দ্য গার্ডিয়ান, কানাডার ভ্যাঙ্কুভার সানসহ বিশ্বের একাধিক দৈনিকের শিরোনাম হয়েছেন তিনি। তবে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হন মার্কিন ধনকুবের ইলন মাস্কের কারণে।

‘আমি এখানকার দেয়ালগুলোতে অনেক ছবি, লেখা দেখলাম। এরপর রিকশা-সিএনজি অটোরিকশাসহ যানবাহনগুলো এমন সাজে সাজানো, যাকে চলমান শিল্প মনে হয়েছে। যেদিকে তাকাই, শিল্পের উপাদান। মানুষের মেহেদি রাঙানো দাড়ি, রংবেরঙের শাড়ি, বৈদ্যুতিক খুঁটির জট পাকানো তার-সবকিছু খুব আকর্ষণীয়।’
ডানা ওয়াইজ, ফরাসি শিল্পী।

সে ঘটনা নিয়ে জানতে চাইলে ডানা বলেন, অ্যাপলের ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি ডিভাইসের ছবির পাশে একটি প্লাস্টিকের ব্যগে রেখেছিলেন বুনো মাশরুম। সেটি আসলে একটি শিল্পকর্ম। এর লেবেলে লেখা ছিল, ‘৫০০ ডলারের অ্যাপলের ডিভাইসের বদলে ২০ ডলারের মাশরুমের সাহায্যে যোগাযোগ করুণ ভিনগ্রহের প্রাণীদের সঙ্গে।’ তাঁর এই শিল্পকর্মের ছবি নেটে মিম আকারে ঘুরছিল। ২০২২ সালের ৮ জুন স্পেসএক্সের প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্ক কাজটি নিয়ে টুইট করেন। সম্ভবত, অ্যাপলকে নিয়ে মজা করতে চেয়েছিলেন মাস্ক। আর সেই ঘটনাই ডানার কাজের পরিচিতি এনে দেয় বিশ্বজুড়ে।

ডানা ওয়াইজের শিল্পকর্ম নিয়ে ধনকুবের ও স্পেস এক্সের প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্কের টুইট

তীক্ষ্ণ রসবোধসম্পন্ন ডানা মনে করেন, এই ভোগবাদী দুনিয়া মানুষকে নিজের মতো করে জীবনধারণের ছক এঁকে দেয়। একটা বানানো জীবন কাটাতে মানুষ বাধ্য হয়। অনেক অপ্রয়োজনীয় জিনিসই জীবনে প্রবেশ করে। বিজ্ঞাপন ও ভোগের এই পুরো যন্ত্রকেই তিনি আঘাত করতে চান।

‘কনজ্যুমারিজমের’ বিপরীতে যে সরল, গভীর জীবন, তার থেকে মানুষ দূরে সরে যাচ্ছে বলে ডানা মনে করেন।। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘আমি নিজে এসবের বিরুদ্ধে কথা বলি। তবু এই সিস্টেমের ভেতরেই আমি আমার শিল্পকর্মের ক্রেতা খুঁজি। সুতরাং আমি নিজেও এর থেকে বের হতে পারিনি। আসলে বের হওয়া খুব কঠিন।’

কথা শেষ করার আগে জানালেন, বাংলাদেশ তাঁকে নতুন অনেক কিছু দিয়েছে। এখানকার অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরে গিয়ে কাজ করতে চান। আবারও আসতে চান এ দেশে।