চলছে রোদ পোহানোর উৎসব। গতকাল রাজশাহীর নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজ মাঠে
চলছে রোদ পোহানোর উৎসব। গতকাল রাজশাহীর নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজ মাঠে

রোদ পোহানোর উৎসব

তখন সদ্য কুয়াশা ভেঙে মাঘের আকাশ আলোকিত হয়েছে। রাজশাহী নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজ মাঠে বসে বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আবু ইসহাক শীতে কাঁপতে কাঁপতে একটা পাটিসাপটা পিঠা মুখে তুলছেন। তাঁর পাশে রসায়ন বিভাগের প্রভাষক মাসুদ রানা মুখের মধ্যে আস্ত একটা মোয়া ঢুকিয়ে দিয়েছেন। বের করতে পারছেন না, খেতেও পারছেন না। এ দৃশ্য দেখে পাশে দাঁড়িয়ে একদল শিক্ষক ও শিক্ষার্থী শুরু করলেন হাসাহাসি। অধ্যাপক সাইয়েদুর রহমান চেঁচিয়ে বলছেন, ‘এই টুটুল, ওইখানে টিস্যু পেপার আছে। দাও দাও।’

গতকাল মঙ্গলবার রাজশাহী নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজ মাঠে সকাল ১০টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত ‘রোদ পোহানো উৎসব’ ছিল এমন আনন্দমুখর।

উৎসবের মূল আয়োজক কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সাইয়েদুর রহমানকে নিয়ে ফটোসেশনের হিড়িক চলছিল। যত ফটোসেশন তত হাসি। এই রোদ পোহানোর উৎসবে এত হাসি কোত্থেকে আসছে। এমন প্রশ্ন শুনে তিনি (সাইয়েদুর রহমান) বললেন, একের পর এক ক্লাস-পরীক্ষায় ছেলেমেয়েরা একেবারে চিড়েচ্যাপটা হয়ে আছে। এই একটা দিন তাদের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। এতেই ছেলেমেয়েরা এত উৎফুল্ল। আর আমাদের প্রতিটি ঋতুকে ঘিরে নানা আয়োজন দেখা যায়—পয়লা বৈশাখ, চৈত্রসংক্রান্তি কিংবা বর্ষা উৎসব। তাহলে মাঘের এই মিষ্টি রোদ পোহানোর উৎসব বাঙালির উৎসব–পার্বণে নতুন মাত্রা যোগ করতেই পারে। সেই চিন্তা থেকেই তিনি এই আয়োজন করেছেন। ছেলেমেয়েদের হাসি-আড্ডার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন, ‘খেয়াল করে দেখেন শিক্ষক–শিক্ষার্থীরা কেমন রোদের মতোই প্রাণোচ্ছল হয়ে উঠেছে। উৎসব ছাড়া মানুষকে কোথাও আপনি এমন আনন্দমুখর পরিবেশে পাবেন না।’

অধ্যাপক সাইয়েদুল কথার প্রমাণ পাওয়া গেল পিঠার স্টলগুলো ঘুরতে গিয়ে। একটি স্টলে একটা লাড্ডুর নাম দেওয়া হয়েছে ‘সিজি-ফোর পাওয়ার লাড্ডু’। এর পাশে নৃত্যরত একটি ব্যাঙের ছবি দিয়ে লেখা হয়েছে ‘প্রিয় শিক্ষকবৃন্দ, আজ শুধু পিঠা হবে। কোনো হোমওয়ার্কের কথা হবে না।’

আর একটা পিঠার নাম ‘শাহী টুকরা’। তার পাশে একটা কার্টুন দিয়ে লেখা হয়েছে, ‘আজ কোনো লেকচার নয়, আজ শুধু পিঠা খাওয়ার প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস।’

কলেজের একদল শিক্ষক অর্ধচন্দ্রাকারে সূর্যের দিকে পিঠ মেলে বসে থেকে মজা করে বিভিন্ন ধরনের পিঠা খাচ্ছিলেন। তাঁদের মধ্য থেকে ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মাহফুজা ইয়াসমিন বলে উঠলেন, ‘এই আমাকে একটা ভাপা দাও না।’ দেখে বোঝায় উপায় নেই তাঁরা রোদ খেতে, নাকি পিঠা খেতে নাকি হাসাহাসি করতে এসেছেন। এর মধ্যে গণিত বিভাগের প্রভাষক সেলিনা আক্তারের দাবি, ‘মিষ্টি মিষ্টি রোদ খাচ্ছি। এই রোদ পিঠার চেয়েও বেশি মিষ্টি।’

যেকোনো বিষয় নিয়েই চলছিল হাসির আড্ডা। শিক্ষক মাসুদ রানা পাটিসাপটা পিঠা চামচ দিয়ে কেটে খাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। পাশ থেকে অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক মেহেরুন্নেসা খোঁচা দিয়ে বললেন, ‘এই মাসুদরা কখনো ভালো হয় না। পাটিসাপটা পিঠা চামচ দিয়ে খাওয়া যায় না। হাত দিয়ে খান।’ এ মন্তব্যে মাসুদ যেন বোকা বনে গেলেন সবার মধ্যে।

উৎসব চলছে কলেজের মাঠজুড়ে। তার পাশ দিয়ে বসেছে পিঠার স্টল। মাঠের মধ্যে যেখানে শিক্ষকেরা গোল হয়ে বসছেন, সেখানেই শীতের পিঠা চলে আসছে। এই পিঠা পরিবেশনের জন্য কয়েকজন ছাত্র স্বেচ্ছাসেবকের কাজ করছিলেন।

উৎসবের ব্যানারে লেখা ‘রোদ পোহানো উৎসব’। পাশেই সূর্যমুখী ফুলের আদলে রয়েছে ফটোবুথ। সবাই সেখানে ছবি তুলছেন। একজন শিক্ষককে ঘিরে একটি পিঠার দোকানের সামনে কলেজের একদল প্রাক্তন ছাত্র পায়েস নিয়ে মেতে উঠলেন। প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী জুবাইদা সুলতানা পায়েসের স্টল দিয়েছেন। পায়েস শেষ হয়ে যাচ্ছে দেখে তিনি দৌড়ে বিভাগের শিক্ষক অমিত কুমারকে ডাকছেন, ‘স্যার আসেন আসেন, পায়েস শেষ হয়ে যাচ্ছে।’

বেলা সাড়ে ১১টার দিকে অধ্যক্ষ আব্দুল আউয়াল এসে পিঠা খেতে বসলেন। কেমন আয়োজন হয়েছে, জানতে চাইলে বললেন, চমৎকার আয়োজন হয়েছে। এবার যে শীত গেল আরও আগে এই আয়োজন হওয়া উচিত ছিল।

বিভাগের ১০ জন শিক্ষার্থীর একটা গ্রুপ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মাহমুদা জেসমিনকে ঘিরে ধরে হাসাহাসি করছেন। কারণ জানা গেল তাঁরা ‘ডেয়ার গেম’ খেলছেন। খেলাটি এ রকম, তাঁদের হাতে অনেকগুলো চিরকুট। তার ভেতর থেকে শিক্ষককে একটা তুলতে দিচ্ছেন। চিরকুটে যা লেখা আছে, শিক্ষককে তা–ই করতে হচ্ছে। চিরকুটের লেখা ছিল, এই চিরকুট দেখে হাসলেই আমাদের পিঠা খাওয়াতে হবে। বলতে গেলে এ রকম ফাঁদ পেতে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের কাছ থেকে পিঠা আদায় করছিলেন।

এসব করতে করতেই দুপুর গড়াল। মাঘের মধ্যাহ্ন বেশ উষ্ণ হয়ে উঠেছে। বাংলা বিভাগের অধ্যাপক শহিদুল ইসলাম গায়ের ব্লেজারটায় ঝাড়া দিয়ে বললেন, এই ঠান্ডা চলে গেছে। ব্লেজার আর সহ্য হচ্ছে না। রোদ পোহানো উৎসব সার্থক।