জন্ম থেকেই বাম হাতের কনুই পর্যন্ত নেই নাজমার আকতারের। তবু তিনি দমে যাননি। উচ্চশিক্ষা সমাপ্ত করে এখন বড় পদে চাকরি করছেন
জন্ম থেকেই বাম হাতের কনুই পর্যন্ত নেই নাজমার আকতারের। তবু তিনি দমে যাননি। উচ্চশিক্ষা সমাপ্ত করে এখন বড় পদে চাকরি করছেন

জন্ম থেকেই বাঁ হাত নেই, কটু কথা শোনা মেয়েটি এখন চাকরিজীবী

২৮ বছর বয়সী নাজমা আকতারের বাড়ি কক্সবাজারের চকরিয়া পৌরসভার দক্ষিণ কাহারিয়াঘোনা এলাকার ছালাম মাস্টারপাড়ায়। জন্ম থেকেই তাঁর বাঁ হাত কনুই পর্যন্ত নেই। এ কারণে জন্মের পর থেকেই স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দাদের কটু কথা শুনতে হতো তাঁকে। তবে তিনি এসব উপেক্ষা করে পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। বর্তমানে তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে হিসাবরক্ষক হিসেবে কর্মরত।

জন্ম থেকেই বাঁ হাতের কনুই পর্যন্ত নেই নাজমা আকতারের। এলাকার মানুষ তাঁর মা-বাবাকে বলতেন, ‘ও তো প্রতিবন্ধী। ওকে দিয়ে কিছু হবে না। সারা জীবন ঘরে রেখেই খাওয়াতে হবে।’ তবে তিনি এমন কটু কথা শুনেও দমে যাননি। পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। এখন তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে হিসাবরক্ষক হিসেবে কর্মরত।

২৮ বছর বয়সী নাজমা আকতারের বাড়ি কক্সবাজারের চকরিয়া পৌরসভার দক্ষিণ কাহারিয়াঘোনা এলাকার ছালাম মাস্টারপাড়ায়। তাঁর বাবা নাছির উদ্দিন বন বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী। আর মা নুর আয়েশা বেগম গৃহিণী। তিনি ২০১৩ সালে চকরিয়া কেন্দ্রীয় উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি, ২০১৫ সালে চকরিয়া কমার্স কলেজ থেকে এইচএসসি, ২০২০ সালে কক্সবাজার সরকারি কলেজ থেকে ব্যবস্থাপনা বিভাগে স্নাতক ও ২০২১ সালে একই বিভাগে চট্টগ্রামের সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর পাস করেছেন।

‘প্রতিবন্ধিতা জয় করে আজ আমি নিজের এলাকায় ভালো বেতনে চাকরি করছি। ছোট থেকেই মানুষের অনেক কটু কথা শুনেছি। কষ্ট পেলেও আমি দমে যাইনি।’
—নাজমা আকতার, বেসরকারি চাকরিজীবী

জানতে চাইলে নাজমা আকতার প্রথম আলোকে বলেন,‘প্রতিবন্ধিতা জয় করে আজ আমি নিজের এলাকায় ভালো বেতনে চাকরি করছি। ছোট থেকেই মানুষের অনেক কটু কথা শুনেছি। কষ্ট পেলেও আমি দমে যাইনি। এখন আর কেউ কটু কথা বলেন না। মূল কথা, একাগ্রতা নিয়ে পড়াশোনা করলে সমাজ জয় করা কোনো ব্যাপারই নয়।’

কটু কথার শুরু শৈশব থেকে

দুই ভাই ও চার বোনের মধ্যে সবার ছোট নাজমা। তাঁর সব ভাইবোন স্বাভাবিক। শুধু নাজমার জন্মগতভাবে বাঁ হাতের অর্ধেক নেই। এ কারণে স্থানীয় বাসিন্দা ও স্বজনেরা শৈশব থেকেই তাঁর শারীরিক পার্থক্যটি নিয়ে আলোচনা করতেন।

দুই ভাই ও চার বোনের মধ্যে সবার ছোট নাজমা। তাঁর সব ভাইবোন স্বাভাবিক। শুধু নাজমার জন্মগতভাবে বাঁ হাতের অর্ধেক নেই। এ কারণে স্থানীয় বাসিন্দা ও স্বজনেরা শৈশব থেকেই তাঁর শারীরিক পার্থক্যটি নিয়ে আলোচনা করতেন।

নাজমা বলেন, ‘যখন আমার জন্ম হয়, তখনই বাঁ হাতের অর্ধেক নেই। একটু একটু করে বড় হতে থাকি। তখন সমাজ নানা কটু কথা শোনাত। একবার এলাকার এক নারী আমার মাকে বলেছিলেন “মেয়েটির একটি হাত নেই, বড় হয়ে কী হবে। বড় হলে বিয়ে হবে না, সারা জীবন তাঁকে পালতে হবে।”’

তবে এসব শুনেও নাজমার মা–বাবা ভেঙে পড়েননি; বরং তাঁরা মেয়েকে পড়াশোনা করানোর সংকল্প দৃঢ় করেন। তবে এ পথটাও নাজমার জন্য সহজ ছিল না। স্বল্প আয়ের সংসারের চাপ কমাতে উচ্চমাধ্যমিকে পড়ার সময় থেকেই টিউশনি করাতেন নাজমা। এ ছাড়া তিনি স্নাতকে পড়ার সময় লজিংয়ে থেকেছেন। এর বাইরে উপবৃত্তি ও সরকার থেকে পাওয়া প্রতিবন্ধী ভাতা তিনি পড়াশোনায় ব্যয় করেছেন।

২০২৩ সালে মিরাজ উদ্দিন নামের পূর্বপরিচিত এক ব্যক্তির সঙ্গে নাজমার বিয়ে হয়। তাঁর চকরিয়া পৌরসভায় একটি শপিং মলে প্রসাধনীর দোকান রয়েছে। বর্তমানে তাঁদের সংসারে ১৪ মাস বয়সী একটি সন্তান রয়েছে।

নাজমা বলেন, ‘আমার শ্বশুর-শাশুড়ি খুবই ভালো মানুষ। তাঁদের সহযোগিতা আমাকে অনেক বেশি অনুপ্রাণিত করেছে। আমার স্বামী সব সময় আমাকে সাহস জুগিয়েছেন। তাঁর সাপোর্ট না থাকলে আমার পক্ষে এই দুর্গম পথ পাড়ি দেওয়া সম্ভব হতো না।’

নাজমা ‘সোশ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন ফর দ্য ফিজিক্যালি ভালনারেবল’ নামের একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত। প্রতিষ্ঠানটির আঞ্চলিক পরিচালক কাজী মাকসুদুল হক বলেন, ‘কাজে দক্ষতায় নাজমা আকতার একজন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষ, কারও মনে হবে না। তিনি একটি হাত নিয়েই নিজের কাজ সারেন, অফিস সামলান। এককথায়, তিনি প্রতিবন্ধকতাকে জয় করেছেন।’