
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার ঘটনার পর ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা জোরদারে ১৪ দফা সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এতে বহিরাগতদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, কুইক রেসপন্স টিম গঠন, হটলাইন চালু, সিসিটিভি ক্যামেরা বাড়ানো এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে আলোর ব্যবস্থা করার মতো পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক এ কে এম রাশিদুল আলম এসব সিদ্ধান্ত তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সম্প্রতি রাতে আবাসিক হলে ফেরার পথে এক নারী শিক্ষার্থীকে ক্যাম্পাসের ভেতরে বহিরাগত এক দুষ্কৃতকারী টেনেহিঁচড়ে অন্ধকারে নিয়ে ধর্ষণ ও প্রাণনাশের চেষ্টা করে। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দুষ্কৃতকারীকে গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিতে কাজ করছে।
সংবাদ সম্মেলনে প্রক্টর বলেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) ও শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল বৃহস্পতিবার উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জরুরি প্রশাসনিক সভায় ১৪টি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো একটি ‘কুইক রেসপন্স টিম’ গঠন। নিরাপত্তাঘাটতির অভিযোগ পেলেই এই দল দ্রুত ব্যবস্থা নেবে। সদস্যদের বিশেষ প্রশিক্ষণ ও অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের জন্য ভাতাও দেওয়া হবে। দ্রুত সময়ের মধ্যে নিরাপত্তাজনিত অভিযোগ জানানোর জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একটি হটলাইন নম্বর চালুর সিদ্ধান্তও নিয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরিচয়পত্র বহন বাধ্যতামূলক করা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ক্যাম্পাসে বহিরাগত প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে নতুন নিয়ম আরোপ করা হয়েছে। এখন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশপথে বহিরাগতদের পরিচয়পত্র দেখিয়ে লগবুকে নাম-ঠিকানা ও প্রবেশের উদ্দেশ্য লিখে ঢুকতে হবে। ক্যাম্পাস-সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের জন্য বিশেষ পাসের ব্যবস্থা করা হবে। তাঁরা দায়িত্বরত ব্যক্তিদের কাছে পাস দেখিয়ে ক্যাম্পাসের ভেতর দিয়ে যাতায়াত করতে পারবেন। ক্যাম্পাসে নির্মাণাধীন বিভিন্ন ভবনে কর্মরত নির্মাণশ্রমিক, দোকানের কর্মচারী ও ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রেও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। নির্মাণশ্রমিক ও কর্মকর্তাদের পরিচয়পত্র বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। দোকানকর্মীদের তথ্য ও জাতীয় পরিচয়পত্র জমা দিয়ে ডেটাবেজ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ক্যাম্পাসের সব ভ্রাম্যমাণ দোকান উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, নিরাপত্তা জোরদারে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন গেটে নিরাপত্তা প্রহরীর সংখ্যা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। কেন্দ্রীয় মসজিদ ফটক, প্রান্তিক ফটক ও গেরুয়া ফটকে অতিরিক্ত প্রহরী মোতায়েন করা হবে। এক মাসের মধ্যে নতুন পুরুষ ও নারী নিরাপত্তারক্ষী নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কথাও জানিয়েছে প্রশাসন। এ ছাড়া আরও ১০০ জন নতুন আনসার সদস্য মোতায়েনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে (ইউজিসি) আবেদন করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানাপ্রাচীর ও প্রবেশপথের ত্রুটি দ্রুত সংস্কারের পাশাপাশি অননুমোদিত প্রবেশপথ বন্ধ করে দেওয়া হবে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা ও সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে। আলবেরুনী হলের টিনশেড এক্সটেনশন ভবন অবিলম্বে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে ভেঙে ফেলা হবে। একই সঙ্গে বুলিং, সাইবার বুলিং ও র্যাগিং প্রতিরোধে ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বুলিং ও র্যাগিং প্রতিরোধ নীতিমালা-২০২৩’ অনুযায়ী একটি স্থায়ী কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এর আগে ১২ মে রাত ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিত্যক্ত ফজিলাতুন্নেছা হল-সংলগ্ন রাস্তা থেকে এক ছাত্রীকে টেনেহিঁচড়ে অন্ধকারে নিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করে এক ব্যক্তি। পরদিন দুপুরে আশুলিয়া থানায় অজ্ঞাতনামা একজনকে আসামি করে মামলা করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এদিন রাতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামেন এবং প্রশাসনের কাছে ছয় দফা দাবি জানান। তাঁরা আসামিকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে আল্টিমেটাম দেন। কিন্তু আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় আবার আন্দোলনে নামেন এবং প্রক্টরিয়াল টিমকে পদত্যাগের দাবি জানান। আজ শুক্রবার রাত ১২টার দিকে শিক্ষার্থীদের বেঁধে দেওয়া সময় শেষ হবে।