কৃষক আবদুল জব্বারের খেতে মাচায় ঝুলছে ছোট আকৃতির হলুদ রঙের সূর্যডিম তরমুজ। সম্প্রতি চট্টগ্রামের পটিয়ার কচুয়াই ইউনিয়নের উত্তর শ্রীমাই গ্রামে
কৃষক আবদুল জব্বারের খেতে মাচায় ঝুলছে ছোট আকৃতির হলুদ রঙের সূর্যডিম তরমুজ। সম্প্রতি চট্টগ্রামের পটিয়ার কচুয়াই ইউনিয়নের উত্তর শ্রীমাই গ্রামে

ইউটিউব দেখে ‘সূর্যডিম’ তরমুজ চাষ, তিন লাখ টাকা বিক্রির আশা জব্বারের

প্রায় ছয় একরের সবজির খেত। সেখানে চাষ করা হয়েছে টমেটো, পেঁপে, শসা, কাঁকরোল, করলা, শিমসহ নানা জাতের ফসল। এর মধ্যেই প্রায় ৪০ শতক জমিতে মাচায় ঝুলছে হলুদ রঙের ছোট ছোট তরমুজ। নাম ‘সূর্যডিম’।

এসব তরমুজ চাষ করেছেন চট্টগ্রামের পটিয়ার কৃষি উদ্যোক্তা আবদুল জব্বার (২৮)। বাড়ি থেকে আধা কিলোমিটার দূরে তাঁর খেত। ইউটিউব দেখে বর্ষকালীন এই তরমুজ চাষ করেছেন তিনি। গত রোববার থেকে তিনি প্রতি কেজি ১২০ টাকা দরে নিজের খেতের তরমুজ বিক্রি শুরু করেছেন।

বর্তমানে বাড়ি থেকে আধা কিলোমিটার দূরে আবদুল জব্বারের সবজির খেত। এর মধ্যে ‘বাহুবলী’ জাতের টমেটো; মিশ্র ফসল হিসেবে পেঁপে, শসা, কাঁকরোল, করলা ও শিম রয়েছে। পাশের পাহাড়ে আরও প্রায় ৬০০ শতক জমিতে আদা চাষ করছেন তিনি।

জব্বার পটিয়া উপজেলার কচুয়াই ইউনিয়নের উত্তর শ্রীমাই গ্রামের বাসিন্দা। তিনি জানান, গত ২৬ জুলাই খেতে তরমুজের বীজ বপন করেন। প্রায় ১ মাস ২৫ দিন পর তাঁর খেতের তরমুজ বিক্রির উপযোগী হয়েছে। তরমুজ চাষে সব মিলিয়ে খরচ হয়েছে ৭৫ হাজার টাকার মতো। জব্বারের আশা, প্রায় তিন লাখ টাকার তরমুজ বিক্রি করা যাবে।

আবদুল জব্বার জানান, গত বছর পরীক্ষামূলকভাবে চার শতক জমিতে ‘সূর্যডিম’ তরমুজ চাষ করেছিলেন তিনি। গতবার ফলন ভালো হওয়ায় এবার চাষের পরিমাণ বাড়িয়েছেন। গত ২৬ জুলাই ৪০ শতক জমিতে বীজ বপন করেন। তিনি বলেন, ‘বর্ষায় তরমুজ চাষের জন্য মাচা তৈরি করেছি। মাচার ওপর গাছ তুলে দেওয়া হয়েছে। তরমুজ যাতে মাটিতে পড়ে নষ্ট না হয়, সে জন্য নেট দিয়ে ফলগুলো ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। কারণ বর্ষা মৌসুমে মাটিতে তরমুজ চাষ করলে পানি জমে ফল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। মাচায় ঝুলিয়ে চাষ করায় সেই ঝুঁকি কমে। এতে গাছেও বেশি ফল ধরে।’

ইউটিউবে কৃষিবিষয়ক অনুষ্ঠান দেখে নতুন জাতের এই তরমুজ চাষের কথা জানতে পারি। পরে নিজেই তথ্য সংগ্রহ করে বীজ সংগ্রহ করি। গত বছর অল্প জমিতে চাষ করে ভালো ফল পাই। তাই এবার চাষের পরিমাণ বাড়িয়েছি।
আবদুল জব্বার, কৃষি উদ্যোক্তা

সরেজমিন দেখা যায়, ইউ আকৃতির মাচা ঘিরে সবুজ পাতায় ছেয়ে আছে পুরো খেত। মাচার নিচে নেটের মধ্যে ঝুলছে হলুদ রঙের তরমুজ। আবদুল জব্বার জানান, সূর্যডিম তরমুজের বীজ ছোট। বীজের পরিমাণও তুলনামূলক কম। তরমুজের ভেতরের রং টকটকে লাল, স্বাদও ভালো।

আবদুল জব্বার বলেন, উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা সাদা রঙের হাইব্রিড তরমুজ পটিয়ায় সাধারণত কেজিপ্রতি ৫০ থেকে ৬০ টাকা দরে বিক্রি হয়। সূর্যডিম জাতের তরমুজের দাম ন্যূনতম কেজিপ্রতি ১২০ টাকা।

পাকা সূর্যডিম তরমুজ হাতে কৃষক আবদুল জব্বার। সম্প্রতি চট্টগ্রামের পটিয়ার কচুয়াই ইউনিয়নের উত্তর শ্রীমাই গ্রামে

রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ছাড়াই চাষ

আবদুল জব্বার জানান, তিনি কৃষিতে যুক্ত হন ১৬ বছর বয়সে। তখন তিনি দশম শ্রেণির ছাত্র। বাবাকে কৃষিকাজে সহযোগিতা করতে গিয়ে কৃষির প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। এরপর পড়াশোনার পাশাপাশি বর্গা জমিতে অল্প পরিমাণে সবজি চাষ শুরু করেন। পরে ব্যাংক ও বড় ভাইয়ের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে চাষের পরিমাণ বাড়ান।

২০১৮ সালে চক্রশালা কৃষি উচ্চবিদ্যালয়ে কৃষি বিভাগের আয়োজিত একটি প্রশিক্ষণে অংশ নেন তিনি। সেখানে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক কমিয়ে বিষমুক্ত সবজি উৎপাদনের বিষয়ে উৎসাহিত হন। এরপর নিজের খেতে সেই পদ্ধতি প্রয়োগ শুরু করেন।

বর্তমানে বাড়ি থেকে আধা কিলোমিটার দূরে আবদুল জব্বারের সবজিখেত। এর মধ্যে ‘বাহুবলী’ জাতের টমেটো; মিশ্র ফসল হিসেবে পেঁপে, শসা, কাঁকরোল, করলা ও শিম রয়েছে। পাশের পাহাড়ে আরও প্রায় ৬০০ শতক জমিতে আদা চাষ করছেন তিনি।

আবদুল জব্বারের দাবি, তিনি রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার না করে হলুদ কার্ড ও ফেরোমন ফাঁদ এবং জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করেন। সারা বছর বিভিন্ন জাতের সবজি চাষ হয় তাঁর খেতে। এতে বছরে তাঁর প্রায় ১৫ লাখ টাকা খরচ হয়। সবজি বিক্রি করে আয় হয় প্রায় ২০ লাখ টাকা। অর্থাৎ বছরে সবজিখেত থেকে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা লাভ থাকে।

আবদুল জব্বারের প্রায় ছয় একরের সবজির খেত। এর মধ্যে প্রায় ৪০ শতক জমিতে মাচায় ঝুলছে হলুদ রঙের ছোট ছোট তরমুজ। সম্প্রতি চট্টগ্রামের পটিয়ার কচুয়াই ইউনিয়নের উত্তর শ্রীমাই গ্রামে

ইউটিউব দেখে চাষাবাদ

নতুন জাতের ফসল চাষের বিষয়ে বইপত্র পড়ার পাশাপাশি ইউটিউব থেকে তথ্য সংগ্রহ করেন আবদুল জব্বার। জানান, ইউটিউব দেখেই ‘সূর্যডিম’ তরমুজ চাষে আগ্রহী হন তিনি। পরে গত বছর নিজেই তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে বীজ সংগ্রহ করে চাষ করেন। ট্রেতে বীজতলা তৈরি করে চারা উৎপাদন করেন। এরপর সেই চারা জমিতে রোপণ করেন।

আবদুল জব্বার বলেন, ‘ইউটিউবে কৃষিবিষয়ক অনুষ্ঠান দেখে নতুন জাতের এই তরমুজ চাষের কথা জানতে পারি। পরে নিজেই তথ্য সংগ্রহ করে বীজ সংগ্রহ করি। গত বছর অল্প জমিতে চাষ করে ভালো ফল পাই। তাই এবার চাষের পরিমাণ বাড়িয়েছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘এ অঞ্চলে সাধারণত শীত মৌসুমে তরমুজ চাষ হয়। কিন্তু সূর্যডিম জাতটি বর্ষা মৌসুমেও চাষ করা যায়।’

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা তপন কুমার রায় প্রথম আলোকে বলেন, সূর্যডিম জাতের একটি তরমুজ সাধারণত আড়াই থেকে চার কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে।

উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা দীপন চৌধুরী বলেন, আবদুল জব্বার একজন আধুনিক কৃষক। নতুন নতুন জাতের ফসল চাষে তাঁর আগ্রহ ও অভিজ্ঞতা রয়েছে। এবার তিনি সূর্যডিম জাতের তরমুজ চাষ করেছেন। রোগবালাইয়ের ঝুঁকি কমাতে সতর্কতার সঙ্গে ট্রেতে চারা উৎপাদন করা হয়েছে।

দীপন চৌধুরী আরও বলেন, ‘আবদুল জব্বারের খেত দেখে এলাকার অন্য কৃষকেরাও নতুন জাতের ফসল চাষে আগ্রহী হবেন বলে আমরা আশা করছি। তাঁর খেতে বাহুবলী জাতের টমেটোও রয়েছে। গ্রাফটিং করা চারা দিয়ে তিনি টমেটো চাষ করেছেন।’ আবদুল জব্বারকে চলতি মৌসুমে ‘সূর্যডিম’ তরমুজ চাষে বীজ ও মালচিং পেপার দিয়ে উপজেলা কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে সহায়তা করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

তিন বোন ও চার ভাইয়ের মধ্যে আবদুল জব্বার ষষ্ঠ। এসএসসি পাস করার পর বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। তবে শেষ পর্যন্ত বিদেশে না গিয়ে কৃষিকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন। এখন নতুন জাতের ফসল নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষাই তাঁর নেশা। আবদুল জব্বারের ভাষায়, ‘কৃষিতে নতুন কিছু করার চেষ্টা করি। বইপত্র পড়ি, ইউটিউব দেখি। নতুন কোনো জাত বা পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে পারলে নিজের জমিতে পরীক্ষা করে দেখি।’