ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর বিভাগের ৩৩টি আসনে ১ কোটি ৩৪ লাখ ৫৪ হাজার ৪৫৬ ভোটারের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে ৪ হাজার ৭৫০টি ভোটকেন্দ্র। এর মধ্যে ২ হাজার ৫৬১টিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে প্রশাসন।
বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে সাতটা থেকে বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত দেশের ২৯৯টি সংসদীয় আসনে একযোগে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনে সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন।
নির্বাচনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, যেসব কেন্দ্রে অতীতে ভোটকেন্দ্র দখলের চেষ্টা, সংঘর্ষ, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ছিল, সেগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। বিশেষ করে চরাঞ্চল, যোগাযোগবিচ্ছিন্ন এলাকা ও সংসদ সদস্য প্রার্থীর বাড়ির নিকটবর্তী কেন্দ্রগুলো নিয়ে বাড়তি সতর্কতা নেওয়া হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য বলছে, রংপুর বিভাগের ৩৩টি আসনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে মোট ২৪০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে নীলফামারী-১ আসনে (ডোমার-ডিমলা) জোটসঙ্গী জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের এক প্রার্থী ছাড়া বাকি ৩২ আসনে দলীয় প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি।
৩৩ আসনে ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্য থেকে জামায়াতে ইসলামী তাদের দলীয় প্রার্থী করেছে ২৯ জনকে। জাতীয় নাগরিক পার্টি থেকে প্রার্থী হয়েছেন চারজন।
রংপুর রেঞ্জ পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) কার্যালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রংপুর বিভাগের আট জেলার ৩৩টি সংসদীয় আসনে ৩০টি পৌরসভা ও ৫৩৩টি ইউনিয়ন আছে। এগুলোর মধ্যে ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ কেন্দ্র ধরা হয়েছে ৮২৭টি। এর মধ্যে রংপুরে আছে ৯৫টি, গাইবান্ধায় ৭৯টি, কুড়িগ্রামে ১৫০টি, লালমনিরহাটে ১০৬টি, নীলফামারীতে ৭০টি, দিনাজপুরে ২৫৭টি, ঠাকুরগাঁওয়ে ৪১টি এবং পঞ্চগড় ২৯টি কেন্দ্র।
ডিআইজি কার্যালয়ের তথ্য বলছে, ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ কেন্দ্র রংপুরে ২২০টি, গাইবান্ধায় ৩০০, কুড়িগ্রামে ৩৩৪, লালমনিরহাটে ১৬৮, নীলফামারীতে ৩০৪, দিনাজপুরে ৩০৫, ঠাকুরগাঁও ১৬৭ এবং পঞ্চগড়ে ১৩১টি। ঝুঁকিপূর্ণ এসব কেন্দ্রে ইতিমধ্যে সিসিটিভি বসানো হয়েছে। এ ছাড়া অতিরিক্ত অস্ত্রধারী পুলিশ ও আনসার সদস্য রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি আমিনুল ইসলাম বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে সর্বোচ্চ সতর্কতা নিয়ে দায়িত্ব পালন করবে পুলিশ। প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন থাকবে। পুলিশ সদস্যদের শরীরে থাকবে বডি ক্যামেরা, যার লাইভ মনিটরিং করা হবে।
রংপুর রেঞ্জের পুলিশ কর্মকর্তারা বলেছেন, দ্রুত সাড়া দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকবে মোবাইল টিম ও রিজার্ভ ফোর্স। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবে পুলিশ।
রংপুর-১ (গঙ্গাচড়া ও সিটি করপোরেশন ১-৯ ওয়ার্ড) আসনের ১৩৯টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৩১টি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই আসনের বিএনপির প্রার্থী মোকাররম হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর আসনের ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে যাতে কোনো ধরনের ঝামেলা না হয়, সে জন্য তিনি প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়েছেন।
এই আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. রায়হান সিরাজীও ভোট কারচুপি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘শঙ্কা আমরা উড়িয়ে দিচ্ছি না। নানা ধরনের হুমকি ও ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে।’
রংপুর-৪ আসনের পীরগাছা সদর ও পারুল ইউনিয়নে আজ বুধবার সকালে ঘুরে ভোটারদের মধ্যে নানা ধরনের আশঙ্কার কথা জানা গেছে। পীরগাছা সদর ইউনিয়নের নগরজিৎপুর গ্রামের একজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিএনপি, এনসিপি ও জাতীয় পার্টির প্রার্থীর মধ্যে এই আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। জাতীয় পার্টির প্রার্থীকে পথরোধ করার পর থেকে এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। ভোটকেন্দ্রে কোনো সংঘর্ষ হয় কি না, এ নিয়ে চিন্তিত তাঁরা।
তবে রংপুরের রিটার্নিং কর্মকর্তার মুখপাত্র ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রমিজ আলম প্রথম আলোকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ভোট গ্রহণকারী কর্মকর্তা—সবাই যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে সজাগ আছেন।
র্যাবের সংবাদ সম্মেলন
জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে নিজেদের কঠোর অবস্থানের বার্তা দিয়েছে র্যাব-১৩। আজ বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রংপুর নগরের আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলন করা হয়। এতে র্যাব-১৩–এর উপ-অধিনায়ক মেজর সাইফুল ইসলাম বলেন, র্যাবের প্রত্যেক সদস্য পেশাদারত্বের সঙ্গে এই অঞ্চলের প্রতিটি ভোটকেন্দ্র নিরাপদ রাখতে বদ্ধপরিকর।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ৩৩টি সংসদীয় আসনের মধ্যে র্যাব-১৩–এর দায়িত্বাধীন ৩২টি সংসদীয় আসনে ৪৬২০টি কেন্দ্রে র্যাবের ৬৪টি টহল দল, দুটি স্ট্রাইকিং রিজার্ভ, একটি বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট এবং সাদাপোশাকে র্যাব সদস্যরা নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করবেন। তাঁরা ‘ডিজিটালাইজড অপারেশনাল মনিটরিং সেন্টার’ স্থাপন করেছেন, যেখান থেকে টহল কমান্ডারদের মনিটর করা হচ্ছে। বিভাগের ভোটকেন্দ্রগুলোতে ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছে।
ভোটের সরঞ্জাম বিতরণ
এদিকে আজ সকাল থেকে ভোটের সরঞ্জাম ভোটকেন্দ্রে পাঠানো হয়। প্রিসাইডিং ও সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তার কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে সংসদ ও গণভোটের ব্যালট পেপার, বাক্স, অমোচনীয় কালি, বিভিন্ন ধরনের সিল, ভোটার তালিকা, খামসহ ২৪ ধরনের সরঞ্জাম। পুলিশ ও আনসারের সহযোগিতায় বিভিন্ন ধরনের যানবাহনে করে সরঞ্জামগুলো কেন্দ্রে নিয়ে যান প্রিসাইডিং কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
রংপুর বিভাগীয় কমিশনার শহিদুল ইসলাম বলেন, কোনো ধরনের ঝামেলা ছাড়াই সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট গ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।