কক্সবাজারের রিসোর্ট থেকে সাইবার প্রতারণা অভিযোগে গ্রেপ্তার চীন ও তাইওয়ানের ছয় নাগরিককে আদালতে আনা হয়। আজ বিকেলে কক্সবাজার আদালত প্রাঙ্গনে
কক্সবাজারের রিসোর্ট থেকে সাইবার প্রতারণা অভিযোগে গ্রেপ্তার চীন ও তাইওয়ানের ছয় নাগরিককে আদালতে আনা হয়। আজ বিকেলে কক্সবাজার আদালত প্রাঙ্গনে

কক্সবাজারের রিসোর্টে ‘সাইবার ফাঁদ’, গোপন ল্যাব, গ্রেপ্তার সেই ৬ বিদেশি তিন দিনের রিমান্ডে

কক্সবাজারের বিভিন্ন রিসোর্টে সাইবার ফাঁদ পেতে প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে করা মামলায় গ্রেপ্তার ছয় বিদেশিকে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। আজ সোমবার দুপুরে তাঁদের কক্সবাজারের সিনিয়র বিচারিক হাকিম আদালতে হাজির করে পাঁচ দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হয়। শুনানি শেষে আদালতের বিচারক এস এম গিয়াস উদ্দিন তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

রিমান্ডে নেওয়া ছয়জন হলেন তাইওয়ানের নাগরিক ওয়েই ছিং ওয়েন এবং চীনের নাগরিক সু ইয়াংফান, ইয়ান চ্যাংশেং, সু হাইয়াং, উ চিয়ানশিয়ং ও ঝাং ঝেমিং।

রিমান্ড মঞ্জুরের বিষয়টি নিশ্চিত করে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক আবুল কালাম বলেন, পাঁচ দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হয়েছিল। আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। সুবিধাজনক সময়ে তাঁদের সাইবার প্রতারণার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী শওকত ওসমান বলেন, ছয় বিদেশির অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা এবং তাঁদের কাছ থেকে উদ্ধার করা ডিভাইসগুলোর বিষয়ে আরও গভীর তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে। এ কারণে আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।

তবে আসামিপক্ষের আইনজীবী ও কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আবদুল মান্নান বলেন, সাইবার অপরাধের সত্যতা বের করা যেমন জরুরি, তেমনি তাঁরা যদি পর্যটন বা অন্য কোনো বৈধ কাজে বাংলাদেশে এসে থাকেন, তাহলে তাঁদের আইনি মুক্তির সুযোগও রয়েছে। অন্যথায় দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হতে পারে।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আজ সকাল নয়টার দিকে জেলা কারাগার থেকে প্রিজন ভ্যানে করে ছয় বিদেশিকে আদালতে আনা হয়। শুনানি শেষে বেলা তিনটার দিকে তাঁদের আবার কারাগারে পাঠানো হয়।

যেভাবে গ্রেপ্তার

পুলিশ ও আদালত সূত্র জানায়, ৩ সেপ্টেম্বর কক্সবাজার শহরের কলাতলী ও সুগন্ধা এলাকার কয়েকটি হোটেলে বিশেষ অভিযান চালিয়ে ছয় বিদেশিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ৪ সেপ্টেম্বর তাঁদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সাইবার প্রতারণার চক্রের মূল হোতা ঝান ইউয়ান ফান ওরফে বাবর আলী, পাই লেডিং, উ জিপিং ও জিয়ান ঝাং এখনো পলাতক। তাঁদের তিন বাংলাদেশি সহযোগীও আত্মগোপনে রয়েছেন।

অভিযানে পুলিশ ১ হাজার ৯৩৮টি আইফোন, ৫০টি আধুনিক মনিটর, ৪৪টি সিপিইউ, ৩০টি কি-বোর্ড, দুটি ল্যাপটপ, দুটি প্রিন্টার, ৪০টি মাউস, একটি আইপিএস ও ২৪টি কানেকশন বোর্ড জব্দ করে। এ ছাড়া ১৫টি নোট খাতা, একটি ডায়েরি, চারটি গ্রামীণফোন ও একটি রবি সিম, চীনের দুটি জাতীয় পতাকা এবং চীনা পুলিশের একটি র‌্যাঙ্ক ব্যাজ ও টাই উদ্ধার করা হয়।

একটি গোপন আস্তানায় প্রায় দুই হাজার আইফোন কেন রাখা হয়েছিল এবং এগুলো কোনো বিশেষ সফটওয়্যারের মাধ্যমে পরিচালিত হতো কি না, তা জানতে জব্দ করা ডিভাইসগুলো ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।

৪ সেপ্টেম্বর রামু থানায় সাইবার সুরক্ষা আইনে করা মামলায় ওই ছয় বিদেশিকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। মামলায় আরও চারজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া চীনা ও তাইওয়ানের আরও প্রায় ৩০০ নাগরিককে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। গ্রেপ্তার ছয় বিদেশির কাছ থেকে ছয়টি মুঠোফোন, পাঁচটি পাসপোর্ট ও তিনটি পরিচয়পত্র জব্দ করা হয়।

মামলার বাদী ও রামু থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মিন্টু দত্ত বলেন, পলাতক বিদেশিদের অবস্থান শনাক্ত করে তাঁদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

রিসোর্টে গোপন ল্যাবের অভিযোগ

মামলাটি এখন সিআইডি তদন্ত করছে। কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপারেশন) মো. অহিদুর রহমান বলেন, মেরিন ড্রাইভের একাধিক রিসোর্টে চীনা নাগরিকদের গোপন আস্তানা ও ডিজিটাল ল্যাব স্থাপনের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর বাংলাদেশ সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে ঢাকায় অবস্থিত চীনা দূতাবাসকে বিষয়টি জানানো হয়।

অহিদুর রহমান বলেন, ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় আগস্টের শেষ দিকে ও সেপ্টেম্বরের শুরুতে দুই দফায় চীনা দূতাবাসের তিন সদস্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল কক্সবাজারে এসে কথিত গোপন ল্যাব পরিদর্শন করে।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২৫ আগস্ট মেরিন ড্রাইভের মেরিনা বিচ ভিলা রিসোর্টে আরেকটি অভিযান চালানোর সময় পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে চীন ও তাইওয়ানের বেশ কিছু নাগরিক রিসোর্টের পেছনের দরজা দিয়ে সমুদ্রসৈকতে নেমে পড়েন। পরে অন্ধকারে তাঁরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। পুলিশ তখন বিভিন্ন ডিভাইস জব্দ এবং ল্যাবটি সিলগালা করে দেয়।

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিকদের পাসপোর্ট ও ভিসার কপি সংশ্লিষ্ট জেলার বিশেষ শাখায় দেওয়ার বিধান রয়েছে; কিন্তু রিসোর্টে অবস্থানকারী চীন ও তাইওয়ানের নাগরিকদের ক্ষেত্রে তা করা হয়নি। বিদেশিদের রিসোর্ট ভাড়া দেওয়ার তথ্যও মালিকপক্ষ জেলা বিশেষ শাখাকে জানায়নি।

এজাহারে আরও বলা হয়, বিদেশিরা কী উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে অবস্থান করছেন, কোন ধরনের ভিসায় এসেছেন এবং রিসোর্টের ভেতরে কী ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন—এসব বিষয়ে সন্তোষজনক তথ্য দিতে পারেননি।

পুলিশের অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, চীনা নাগরিকেরা কর্মসংস্থান ভিসায় (ই-ভিসা) বাংলাদেশে আসেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর (ডিআইপি) তাঁদের বাংলাদেশে আসার তথ্য জানলেও পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) ফরেন ডেস্ক বা বিদেশি সহায়তা সেল বিষয়টি জানত না।