চাঁদপুর মতলব দক্ষিণের নারায়ণপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রের পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা খালেদা আক্তার
চাঁদপুর মতলব দক্ষিণের নারায়ণপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রের পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা খালেদা আক্তার

চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ 

স্বাভাবিক প্রসবে মায়েদের ভরসা ‘খালেদা আপা’ 

প্রসববেদনায় কাতর হাবিবা আক্তার নিজের মা ও স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে গত বুধবার গভীর রাতে আসেন পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা খালেদা আক্তারের বাসায়। সেদিন খালেদা কিছুটা অসুস্থ ছিলেন। এরপরও নারীকে নিয়ে যান বাসার নিচতলায় তাঁর কার্যালয়ের একটি কক্ষে। ঘণ্টাখানেক প্রচেষ্টার পর সেখানে স্বাভাবিক প্রসব করান হাবিবাকে। এরপর ওই মায়ের হাতে তুলে দেন ফুটফুটে কন্যাসন্তান।

হাবিবা আক্তারের বাড়ি চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলার দুলিয়াউড়া গ্রামে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘খালেদা আপা কোনো সমস্যা ছাড়াই আমার স্বাভাবিক প্রসব করিয়েছেন। তাঁর হাতেই আমার মেয়েসন্তানের জন্ম হয়। সন্তান ও আমি দুজনেই সুস্থ আছি। তাঁর কারণে আমার বাচ্চা নিরাপদে দুনিয়ার আলো দেখতে পাইছে। এ জন্য আমি আপার কাছে ঋণী।’

প্রায় সাড়ে ১৩ বছর ধরে প্রসূতি হাবিবার মতো মতলব দক্ষিণ উপজেলা ও পার্শ্ববর্তী হাজীগঞ্জ উপজেলার ২ হাজার ২০০ মায়ের স্বাভাবিক প্রসব করিয়েছেন স্বাস্থ্যকর্মী খালেদা আক্তার। এ তথ্য নিশ্চিত করেছে উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কার্যালয়। খালেদা উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রের পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা (এফডব্লিউভি) পদে কর্মরত। ওই পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রের একটি ফ্ল্যাটে পরিবার নিয়ে থাকেন তিনি। তাঁর স্বামীর বাড়ি উপজেলার কালিকাপুর গ্রামে। 

গত পয়লা আগস্ট রাতে প্রসববেদনা নিয়া খালেদা আপার কাছে আসি। আপা যত্ন কইরা প্রসব করাইছে। আপা এক টাকাও নেন নাই। সবকিছু হাসিমুখে করছে।
রুমানা শাহানাজ , গৃহবধূ

উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রসূতি মায়েদের নির্ভরতা ও আস্থার নাম ‘খালেদা আপা’। স্বাভাবিক প্রসবে তাঁর সুনাম পাশের হাজীগঞ্জ ও কচুয়া উপজেলার মায়েদের কাছেও পৌঁছেছে। প্রায় সাড়ে ১৩ বছর ধরে মা ও নবজাতকদের সেবা করছেন তিনি। এ পর্যন্ত আটবার উপজেলার সেরা পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকার পুরস্কার লাভ করেন এই স্বাস্থ্যকর্মী। 

খালেদা আক্তার বলেন, প্রতি মাসে গড়ে ১৪টি স্বাভাবিক প্রসব হয় তাঁর হাতে। সে হিসাবে বছরে হয় ১৬৮টি স্বাভাবিক প্রসব। উপজেলার প্রায় সব এলাকা ও হাজীগঞ্জ উপজেলার রাজারগাঁও এলাকার মায়েদের স্বাভাবিক প্রসব করিয়েছেন তিনি। 

গত শনিবার সকালে নারায়ণপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, একটি কক্ষে কয়েকজন প্রসূতি বসে আছেন। তাঁদের নানাভাবে পরামর্শ দিচ্ছেন খালেদা আক্তার। প্রসবের আগে তাঁদের রক্তের চাপ ঠিক আছে কি না পরীক্ষা করে দেখছেন।

খালেদা আক্তার টাঙ্গাইলের পরিবার পরিকল্পনা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে স্বাভাবিক প্রসব ও মিডওয়াইফারির ওপর ১৮ মাসের প্রশিক্ষণ নেন। এরপর ২০১৩ সালের ১৬ এপ্রিল উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা পদে চাকরিতে যোগদান করেন।

খালেদা আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঝড়-তুফানের সময়, গভীর রাইতেও প্রসববেদনা নিয়ে মায়েরা আমার কাছে আসেন। শরীর অসুস্থ থাকলেও তাঁদের ডাকে সাড়া দিই। খাটাখাটনি কইরা স্বাভাবিক প্রসব করাই। মায়ের কোলে ফুটফুটে বাচ্চা তুলে দিই। নিজের যত কষ্টই হোক, মায়ের মুখে হাসি দেখলে খুব স্বস্তি-শান্তি লাগে।’

কথা বলে জানা গেছে, ২০০৭ সালে খালেদা আক্তার এসএসসি পাস করেন। এরপর পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা পদে পরীক্ষা দিয়ে নির্বাচিত হন। টাঙ্গাইলের পরিবার পরিকল্পনা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে স্বাভাবিক প্রসব ও মিডওয়াইফারির ওপর ১৮ মাসের প্রশিক্ষণ নেন। এরপর ২০১৩ সালের ১৬ এপ্রিল উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা পদে চাকরিতে যোগদান করেন।

স্বাস্থ্যকর্মী খালেদা আক্তারের প্রতি নিজের কৃতজ্ঞতার কথা জানিয়ে উপজেলার লেকোটা গ্রামের গৃহবধূ রুমানা শাহানাজ (৩০) বলেন, ‘গত পয়লা আগস্ট রাতে প্রসববেদনা নিয়া খালেদা আপার কাছে আসি। আপা যত্ন কইরা প্রসব করাইছে। সন্তান ও আমি দুজনেই সুস্থ আছি। আপা এক টাকাও নেন নাই। সবকিছু হাসিমুখে করছে। আপার কাছে আইসা খুব ভরসা পাইছি।’

স্বাভাবিক প্রসবে খালেদা আক্তারের নিষ্ঠা ও দক্ষতার প্রশংসা করেন অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা দীপ্ত দাস। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক স্বাভাবিক প্রসবকে গুরুত্ব দিয়ে ওই স্বাস্থ্যকর্মী যেভাবে শ্রম ও সেবা দিচ্ছেন, তা প্রশংসিত হওয়ার দাবি রাখে।