ঈদের দিন দুপুরেরর পর থেকেই সাভারের হেমায়েতপুরের হরিণধরায় চামড়াশিল্প নগরে কোরবানির কাঁচা চামড়া আসতে শুরু করেছে। বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টার দিকে শিল্পনগরীর আজমীর লেদারে
ঈদের দিন দুপুরেরর পর থেকেই সাভারের হেমায়েতপুরের হরিণধরায় চামড়াশিল্প নগরে কোরবানির কাঁচা চামড়া আসতে শুরু করেছে। বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টার দিকে শিল্পনগরীর আজমীর লেদারে

সাভারে শিল্পনগরে আসতে শুরু করেছে চামড়া, দামে অসন্তুষ্ট বিক্রেতারা

পবিত্র ঈদুল আজহার পশু কোরবানি পর আজ বৃহস্পতিবার দুপুরের পর থেকে সাভারের হেমায়েতপুরের হরিণধরায় চামড়াশিল্প নগরে ঢাকা ও আশপাশের এলাকাগুলো থেকে কোরবানির চামড়া আসতে শুরু করেছে। আজ (বৃহস্পতিবার) রাত ৮টা পর্যন্ত এ শিল্পনগরে ৭৯ হাজার ২১৮ পিস কাঁচা চামড়া প্রবেশ করেছে। এদিকে কাঁচা চামড়া বিক্রি করতে এসে সঠিক দাম পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন অনেক বিক্রেতা।

বিভিন্ন ট্যানারির মালিক ও বিসিকের কর্মকর্তারা জানান, এ বছর কমবেশি ১ কোটি পিস কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। যথাযথভাবে এসব চামড়া ক্রয়-বিক্রয় ও সঠিক ব্যবস্থাপনায় কাঁচা চামড়া সংরক্ষণ, চামড়াশিল্প নগরীর শৃঙ্খলা রক্ষার লক্ষ্যে বিসিক, শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, স্থানীয় ও জেলা প্রশাসন, স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো যৌথভাবে কাজ করছে।

বৃহস্পতিবার দুপুরের পর থেকে হেমায়েতপুরের হরিণধরায় চামড়াশিল্প নগরের বিভিন্ন ট্যানারিগুলোতে ট্যানারিমালিক, শ্রমিকসহ ট্যানারি–সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ব্যস্ততা বাড়তে থাকে। ট্যানারিগুলোতে কেউ ট্রাক থেকে গুনে গুনে চামড়া নামাচ্ছেন, কেউ পচন রোধে দ্রুত সময়ের মধ্যে যথাযথ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে চামড়ায় লবণ দিচ্ছেন।

এদিকে কাঁচা চামড়া বিক্রি করতে এসে সঠিক দাম পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন অনেক বিক্রেতা। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রতিবছর লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেয়। ১৩ মে খাত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করে চামড়া দাম নির্ধারণ করেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। এবার ঢাকায় গরুর প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৬২ থেকে ৬৭ টাকা, যা গত বছর ছিল ৬০ থেকে ৬৫ টাকা। সাধারণত বড় আকারের গরুর চামড়া ৩১ থেকে ৪০ বর্গফুট, মাঝারি আকারের গরুর চামড়া ২১ থেকে ৩০ এবং ছোট আকারের গরুর চামড়া ১৬ থেকে ২০ বর্গফুটের হয়।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, সে হিসাবে লবণযুক্ত ছোট আকারের এক পিস চামড়ার দাম ৯৯০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। আর মাঝারি আকারের লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৮৫০ টাকা এবং বড় আকারের লবণযুক্ত গরুর চামড়া ১ হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।

সরকার লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করলেও কোরবানি ঈদের পরপরই ব্যবসায়ীরা সাধারণত কাঁচা চামড়া কিনে থাকেন। একেকটি কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াজাত করতে লবণ ও শ্রমিকের মজুরি বাবদ খরচ পড়ে যায় গড়ে ৩৫০ টাকা। সে হিসাবে ঢাকায় ছোট আকারের কাঁচা চামড়া ৬৫০ থেকে ৮৫০ টাকা, মাঝারি আকারের কাঁচা চামড়া ৯৫০ থেকে দেড় হাজার টাকা ও বড় আকারের চামড়া ১ হাজার ৫৫০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হওয়ার কথা।

বিকেলে ৫টার দিকে সাভারের নয়ারহাট এলাকা থেকে চামড়াশিল্প নগরের পাশে চামড়ার আড়তে ১৩২ পিস চামড়া বিক্রি করতে এসেছেন মাওলানা মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। নয়ারহাটের চাকলগ্রামে তাঁর মাদ্রাসা রয়েছে। তিনি বলেন, ‘চামড়া আনছি ১৩২ পিস। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত দাম পাচ্ছি না। সারা দিন পরিশ্রম এবং আমাদের যাতায়াত যে খরচ আছে। কিন্তু চামড়ার দাম প্রতি পিস ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা বলতেছে। ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, চামড়াশিল্পে একটা সিন্ডিকেট চলতেছে দীর্ঘদিন ধরে। এটার আজ পর্যন্ত আমরা সমাধান পাই নাই।’

ধামরাইয়ের একটি মাদ্রাসা থেকে ৫০ পিস চামড়া বিক্রি করতে আড়তে এসেছেন মুফতি মোহাম্মদ আবুল হাসান শাহ্জলি। তিনি বলেন,‘ চামড়ার দাম ৪০০ টাকা বলতেছে, কেউ ৩০০ টাকা বলতেছে। গত বছর আমরা ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা করে বিক্রি করছি।’

ঈদের দিন দুপুরেরর পর থেকেই সাভারের হেমায়েতপুরের হরিণধরায় চামড়াশিল্প নগরে কোরবানির কাঁচা চামড়া আসতে শুরু করেছে। বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টার দিকে শিল্পনগরীর আজমীর লেদারে

চামড়াশিল্প নগরের একটি ট্যানারির সঙ্গে দরদাম ঠিক হয়েছে জানিয়ে রাজধানীর আগারগাঁও থেকে ৭৫ পিস চামড়া নিয়ে আসা হাফেজ মোহাম্মদ ইয়াসিন বলেন, ‘ট্যানারিতে যাইতেছি একটা দামাদামি হইছে অনেক কষ্টের পর। জোরাজুরির পর আমরা ৬৬০ টাকা করে দাম পাইছি।’

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সাধারণ সম্পাদক ও সমতা লেদারের মালিক মো. মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, এ বছর গরু, ছাগল, মহিষ, ভেড়া—সব মিলিয়ে কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা কমবেশি ১ কোটি পিস। চামড়া সংগ্রহ এবং প্রসেস মিলিয়ে সময় লাগবে প্রায় ৩ মাস।

মো. মিজানুর রহমান বলেন, কোরবানির পর চামড়া ৪ থেকে ৬ ঘণ্টার মধ্যে সংরক্ষণ করা না হলে চামড়ার গুণগত মান সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কমতে থাকে। একটা পর্যায়ে এটার আর কোনো মূল্য থাকে না। গুণগত মানের ওপর ভিত্তি করে চামড়ার দামেও কমবেশি হয়ে থাকে। খোঁজ নিয়ে জেনেছেন, সাভারে ট্যানারি স্টেটে, ট্যানারি স্টেটের পাশের আড়ত এবং ঢাকার পোস্তায় গড়ে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকার মধ্যে প্রতি পিস চামড়া বিক্রি হচ্ছে। গুণগত মান ভালো থাকায় কিছু চামড়া ৮০০ টাকাও বিক্রি হয়েছে বলে শুনেছেন।

মিজানুর রহমান আরও বলেন, কাঁচা চামড়া কেনার পর লবণ দেওয়া, স্থান ভাড়া, পরিবহন ও শ্রমিকের খরচ মিলিয়ে প্রতি পিস চামড়ায় ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা খরচ হবে বলে জানান ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান। তিনি আরও বলেন, ‘সে হিসাবে ৫০০, ৬০০ বা ৭০০ টাকায় চামড়া কেনাবেচা ঠিকই আছে বলা যায়। তবে ঢাকা ও এর আশপাশে আমরা কখনোই চাইব না এর নিচে চামড়া কেনাবেচা হোক। এ ছাড়া যদি স্থানীয় পর্যায়ে যথাযথ প্রক্রিয়ায় লবণজাত করে এরপর চামড়াগুলো বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হয়, সে ক্ষেত্রে ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে দরদাম করার সুযোগ বেশি থাকবে। লবণযুক্ত চামড়ার গুণগত মান ঠিক থাকলে ট্যানারির মালিকেরা ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা দিয়েও চামড়া কিনে থাকেন।’

বিসিক চামড়াশিল্প নগরীর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মেহরাজুল মাঈয়ান প্রথম আলোকে বলেন, রাত ৮টা পর্যন্ত এ শিল্পনগরে ৭৯ হাজার ২১৮ পিস কাঁচা চামড়া প্রবেশ করেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিমাণ আরও বাড়বে। চামড়াশিল্প নগরে চামড়া ক্রয়-বিক্রয়সহ এর আশপাশের সার্বিক ব্যবস্থাপনা স্বাভাবিক রাখতে অতিরিক্ত স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগসহ সংশ্লিষ্ট সব দপ্তর সম্মিলিতভাবে করছে।