
শরীরে ভুল গ্রুপের রক্ত দেওয়ায় ভোলায় এক প্রসূতির মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তাঁর স্বজনেরা। তাঁদের অভিযোগ, ‘ও’ পজিটিভ রক্তের পরিবর্তে কোনো ধরনের পরীক্ষা ও ক্রস ম্যাচিং ছাড়াই ‘বি’ পজিটিভ রক্ত পুশ করায় ওই প্রসূতির মৃত্যু হয়েছে।
এ ঘটনাকে ‘হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে উল্লেখ করে বিচারের দাবিতে স্বজন ও স্থানীয় লোকজন ভোলা শহরের একটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে বিক্ষোভ করেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানটি তালাবদ্ধ করে পালিয়ে যায়। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
ভোলা শহরের কালীনাথ রায়ের বাজার এলাকায় অবস্থিত বন্ধন হেলথ কেয়ার অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে এ ঘটনাটি ঘটে। গতকাল সোমবার সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির সামনে বিক্ষোভ চলে। খবর পেয়ে পুলিশ ও ক্লিনিক সমিতির নেতারা ঘটনাস্থলে যান। বর্তমানে সেখানে পুলিশ মোতায়েন আছে।
মারা যাওয়া প্রসূতির নাম লামিয়া আক্তার (১৯)। তিনি ভোলা সদর পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের আবহাওয়া অফিস রোড এলাকার বাসিন্দা মো. শরীফের স্ত্রী।
স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, লামিয়ার রক্তের গ্রুপ ছিল ‘ও’ পজিটিভ। ৭ জানুয়ারি বিকেলে প্রসবব্যথা উঠলে তাঁকে বন্ধন হেলথ কেয়ার অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ভর্তি করা হয়। পরদিন বৃহস্পতিবার আনুমানিক বেলা সাড়ে ১১টার দিকে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তিনি একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দেন।
স্বজনদের অভিযোগ, অস্ত্রোপচারের পর লামিয়ার শরীরে রক্তশূন্যতা দেখা দিলেও অস্ত্রোপচারের আগে রক্তের বিষয়ে চিকিৎসক বা ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ কোনো কথা বলেনি। এমনকি রোগীর রক্তের গ্রুপ কী, সে সম্পর্কেও সঠিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। পরে রক্তের প্রয়োজন হলে পরীক্ষা না করেই কর্তব্যরত চিকিৎসক ও নার্সরা জানান, রোগীর জন্য ‘বি’ পজিটিভ রক্ত প্রয়োজন। স্বজনেরা ‘ও’ পজিটিভ রক্ত সংগ্রহ করতে কিছুটা সময় নিলে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ কোনো ধরনের ক্রস ম্যাচিং ছাড়াই নিজেদের কাছে থাকা এক ব্যাগ ‘বি’ পজিটিভ রক্ত রোগীর শরীরে পুশ করে। ওই রক্ত দেওয়ার পরপরই লামিয়ার শরীরে খিঁচুনি শুরু হয় এবং তাঁর অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। পরে তাঁকে জরুরি ভিত্তিতে বরিশালের শের–ই–বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে আইসিইউ ও লাইফ সাপোর্টে চার দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর গতকাল সন্ধ্যায় তিনি মারা যান।
লামিয়ার ভাশুর মো. রাজীব অভিযোগ করেন, রক্তের প্রয়োজন জানালে তাঁদের ‘ও’ পজিটিভ রক্তদাতা সংগ্রহ করতে একটু দেরি হয়। কিন্তু অপেক্ষা না করেই ডায়াগনস্টিকে কর্মরত ব্যক্তিরা রোগীকে নিজেদের কাছে থাকা ‘বি’ পজিটিভ রক্ত দিয়ে দেন। রোগীর অবস্থা খারাপ হলে স্বজনেরা রক্তের ক্রস ম্যাচিং রিপোর্ট চাইলে কর্তৃপক্ষ তা দিতে ব্যর্থ হয়। বরিশালের শের–ই–বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা জানান, অন্য গ্রুপের রক্ত দেওয়ার কারণেই লামিয়ার মৃত্যু হয়েছে।
লামিয়ার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে গতকাল রাতে স্বজন ও স্থানীয় লোকজন ক্লিনিকটির সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। এ সময় তাঁরা লামিয়ার মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড আখ্যা দিয়ে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক, নার্স, স্টাফ ও ক্লিনিকের মালিকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
খবর পেয়ে ভোলা সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ইব্রাহীমসহ জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কথা বলেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার পর সেখানে পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
ভোলার সিভিল সার্জন মো. মনিরুজ্জামান বলেন, তিনি পুলিশ সুপারকে ক্লিনিকের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে বলেছেন। একই সঙ্গে তিনি ঘটনা তদন্তের জন্য একটি তদন্ত কমিটি গঠন করবেন। তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে বাংলাদেশ প্রাইভেট হাসপাতাল–ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক অ্যাসোসিয়েশন ভোলা জেলা শাখার নেতারা বিষয়টি নিয়ে সমঝোতার চেষ্টা করছেন। সংগঠনের সভাপতি মো. জামাল উদ্দিন বলেন, ‘হায়াত–মউত আল্লাহর হাতে। সিজার–পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন কারণে খিঁচুনি দেখা দেয়। ঘটনার চার দিন পর বরিশালের শের–ই–বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। ভুল চিকিৎসা হলে তো তাৎক্ষণিক কিছু হতো।’
ভোলা সদর মডেল থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. জিয়া উদ্দিন বলেন, ভুল চিকিৎসায় প্রসূতির মৃত্যুর অভিযোগে স্বজনদের বিক্ষোভের খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত আছে। লামিয়ার পরিবার থানায় লিখিত অভিযোগ দিলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।