
নৌকায় গাদাগাদি করে রাখা গরু। কোনো নৌকায় ৫-৭টি গরু; কোনোটিতে আবার ২৫-৩০টি। গরুর পাশেই ধান, জাল ও সংসারের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। এগুলো যাবে পদ্মার ওপারের চর থেকে শহরের পারে। চরের বাসিন্দারা নিজ ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে যাচ্ছেন; সঙ্গে নিয়েছেন শেষ সম্বল গবাদিপশুগুলোকে।
রাজশাহীর পবা উপজেলার হরিয়ান ইউনিয়নের চর খিদিরপুরের মিডিল চরের চিত্র এখন এমনই। পদ্মার পানি বাড়তে থাকায় চরের অনেক বাড়ির উঠান ডুবে গেছে। কোথাও ঘরের ভেতর পানি ঢুকে যাচ্ছে। কোথাও আবার পানির মধ্যেই গবাদিপশু বেঁধে রেখেছেন বাসিন্দারা। রান্নার সুযোগ নেই, খাবারের সংকট, নেই গরু-ছাগল রাখার নিরাপদ জায়গাও। তাই কয়েক দিন ধরে চর ছাড়ছেন মানুষ।
বুধবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চর খিদিরপুরের মিডিল চরে গিয়ে দেখা যায়, অনেক বাড়ির উঠান পানিতে তলিয়ে গেছে। কোনো কোনো বাড়ির উঠান শুকনো থাকলেও চারপাশে পানি। যেকোনো সময় সেখানেও পানি ঢুকে পড়ার আশঙ্কা করছেন বাসিন্দারা। তাঁদের রাত কাটছে উৎকণ্ঠায়। এর মধ্যে আবার সাপের ভয়।
চরের বাসিন্দা মো. রাকিবের প্রায় ৫০টি গরু। এর মধ্যে প্রায় ৪০টি গরু নৌকায় করে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে এসেছেন তিনি। রাকিব বলেন, ‘চরে থাকবার কোনো অবস্থা নেই। সব বাড়িঘর ডুইবে গিয়েছে। গরু নিয়ে বইসে আছি। খুব কষ্টের মধ্যে আছি ভাই। আমাদের একটু সাহায্য করলি ভালো হয়।’
শুধু রাকিব নন, চরবাসীর অনেকেরই জীবিকার প্রধান অবলম্বন গবাদিপশু। কারও ৫০টি, কারও ৬০টি, কারও শতাধিক, আবার কারও কয়েকটি গরু-ছাগল। পানি বাড়ায় ঘরবাড়ি ছেড়ে যেতে হলেও এসব পশু ফেলে যাওয়ার সুযোগ নেই।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, একটি নৌকায় ২৫-৩০টি গরু আনা হচ্ছে। যার যত গবাদিপশু, সামর্থ্য অনুযায়ী সেগুলো নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
এই পরিস্থিতিতে চরের বাসিন্দা মনোয়ারা বেগম অসহায় হয়ে পড়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমার সব ডুইবে গেছে। তো শহরে জাগা নাই গো। জাগা না থাকলে কার বাড়িতে উইঠব? গরু-ছাগল রাখবার জাগা নাই। গরু শুইতে পারছে না। সকাল থেইক্যে এখনও পর্যন্ত খাইনি। এই যে গরু-ছাগলকে কী খাইতে দিব, সেটাই বুঝতে পারছি নে।’
চর থেকে শহরে আসতেও নৌকার ভাড়া দিতে হয়। সেই টাকাও অনেকের হাতে নেই। মনোয়ারা বলেন, টাকা থাকলে তাঁরা গবাদিপশু নিয়ে আগেই নিরাপদ জায়গায় চলে আসতেন।
স্বামীহারা মরিয়ম বেগমও বুধবার সন্তানদের নিয়ে শহরের দিকে যাচ্ছিলেন। নৌকায় বসে তিনি বলেন, কয়েক দিন ধরে তাঁরা পানির মধ্যে দুর্ভোগে আছেন। গবাদিপশুগুলোও পানিতে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের দেখাশোনা করার মতো পরিস্থিতি নেই।
বর্ষা এলেই একই দুর্ভোগ
চরের বাসিন্দা মো. রেজাউল বলেন, বর্ষা এলেই তাঁদের এমন দুর্ভোগে পড়তে হয়। দুই থেকে তিন মাস পর্যন্ত কষ্ট করে থাকতে হয়। এবারও নদীর পানি বাড়ায় চলাফেরা কঠিন হয়ে পড়েছে। বেড়েছে সাপের উপদ্রব। গবাদিপশুর খাবার জোগাড় করাও কঠিন হয়ে গেছে।
রেজাউল বলেন, এত দিন তাঁরা সরকারি কোনো সহায়তা পাননি। তবে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহায়তা দেওয়ার কথা শুনে কিছুটা আশ্বস্ত হয়েছেন।
চর খিদিরপুরের এই চরে দুই শতাধিক বাড়ি রয়েছে। স্থানীয় ইউপি সদস্য শহিদুল ইসলাম বলেন, সেখানে প্রায় ১০ হাজার গবাদিপশু রয়েছে। পানি বাড়তে থাকায় এসব পশুর নিরাপদ আশ্রয় ও খাবারের ব্যবস্থা এখন বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চরের বাসিন্দারা জানান, কেউ ১৫ দিন ধরে পানি বাড়ছে। পানি না কমা পর্যন্ত তাঁদের আবার কয়েক মাস দুর্ভোগ পোহাতে হবে। এর মধ্যে অনেকে ধান, জ্বালানি, প্রয়োজনীয় মালামাল, সন্তান ও গবাদিপশু নিয়ে চর ছাড়ছেন।
শুধু চর খিদিরপুর নয়, রাজশাহীর চর খানপুর, মাঝারদিয়াড়, ১০ নম্বর চর ও চর আষাড়িয়াদহেও পানি বাড়ায় মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। পদ্মাঘেঁষা রাজশাহী শহরের নিম্নাঞ্চলের কিছু এলাকাও প্লাবিত হয়েছে। নগরের তালাইমারী শহীদ মিনার এলাকায় রাজশাহী আলোর পাঠশালার মাঠও জলমগ্ন হয়েছে।
রাজশাহীতে পদ্মা নদীর পানির বিপৎসীমা ১৮ দশমিক শূন্য ৫ মিটার। বুধবার দুপুরে পানি ১৬ দশমিক ৮৫ মিটার পর্যন্ত উঠেছে। রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উপবিভাগীয় প্রকৌশলী রাশেদুল ইসলাম বলেন, সম্প্রতি ফারাক্কার উজানে গঙ্গার বিভিন্ন স্থানে পানি বিপৎসীমার ওপরে উঠেছে। সেই পানি ধীরে ধীরে বাংলাদেশের দিকে আসছে। ফলে রাজশাহীতে পদ্মার পানি আরও বাড়তে পারে।
প্রকৌশলী রাশেদুল ইসলাম আরও বলেন, রাজশাহীতে বন্যা ও জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় প্রস্তুতি অন্য অনেক এলাকার তুলনায় কিছুটা ভিন্ন। কারণ, সেপ্টেম্বরেও এখানে নদীর পানি বাড়তে পারে। এমনকি বর্ষা শেষ হওয়ার পরও হঠাৎ ভারী বৃষ্টিতে ছোট নদী ও খাল উপচে বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়।
শহরের পাড়ে খাবার বিতরণ
চর থেকে নৌকায় করে যাঁরা শহরের পাড়ে আসছেন, তাঁদের জন্য মালেক ডগার ঘাটে খাবার ও ত্রাণের ব্যবস্থা করেছে রাজশাহী জেলা প্রশাসন।
বুধবার দুপুরে সেখানে পাঁচ শতাধিক মানুষের দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। চরের বাসিন্দা মো. জামু বলেন, ‘ডিসি স্যার আমাদিককে ত্রাণ দিয়্যাছে। তারপরে দুপুরের খাবার দিয়্যাছে। এটা ভালো ল্যাগছে।’ মো. আজাদ একজন বলেন, ‘আজ আমরা ত্রাণ পাইয়াছি। আমাদিককে বলেছে, গরু-বাছুর রাইখবার জাগা কইরে দেবেন জেলা প্রশাসক।’
রাজশাহীর জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, বন্যাকবলিত মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে চর, মাঝারচরসহ তিনটি স্থানে মেডিক্যাল ক্যাম্প পরিচালনা করা হচ্ছে। সেখানে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হচ্ছে। পানিবাহিত রোগের বিস্তার ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ওষুধও দেওয়া হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য আপাতত ভ্রাম্যমাণ একটি জায়গায় আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেখানে গবাদিপশুও রাখা হয়েছে।
চর খিদিরপুরকে ঘিরে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথাও জানান জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, এ জন্য সরকারের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রায় ১০ ফুট উঁচু দুটি বড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। সেখানে মানুষের পাশাপাশি কয়েক হাজার গবাদিপশু রাখার সুযোগ থাকবে।