
অভাব–অনটনের সংসারে বেড়ে উঠেছেন সাগর খান। দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে পড়াশোনা শেষ করেছেন তিনি। ৪৭তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। এর আগেও ৪৬তম বিসিএসে তথ্য ক্যাডারে সুপারিশ পেয়েছিলেন।
সাগরের বাড়ি টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার উয়ার্শী ইউনিয়নের কহেলা গ্রামে। তাঁর বাবা আকবর খান ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালান। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে সাগর সবার বড়। তাঁর বোন আইরিন বেগম গৃহিণী। ছোট দুই ভাই মোহাম্মদ রাব্বি খান ও সাব্বির খান দুটি ব্যাংকে অফিস সহায়ক হিসেবে কর্মরত।
কহেলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেন সাগর। পরে ঢাকার ধামরাই উপজেলার রাজাপুর–কহেলা বাহরাম মল্লিক উচ্চবিদ্যালয় থেকে ২০১৫ সালে বিজ্ঞান বিভাগে গোল্ডেন জিপিএ–৫ নিয়ে এসএসসি পাস করেন। সে সময় তিনি বৃত্তিও পান। এরপর রাজধানীর সরকারি বিজ্ঞান কলেজ থেকে ২০১৭ সালে এইচএসসি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ থেকে ২০২৪ সালে স্নাতক (সম্মান) সম্পন্ন করেন।
সাগরের মা সেলিনা বেগমের স্বপ্ন ছিল ছেলে বিসিএস কর্মকর্তা হবেন। সেই স্বপ্নই অনুপ্রাণিত করেছে জানিয়ে সাগর বলেন, ‘এসএসসি পরীক্ষা পর্যন্ত আমাদের বাড়িতে বিদ্যুৎ ছিল না। কুপি ও হারিকেনের আলোয় পড়াশোনা করেছি। কেরোসিন না থাকলে দিনের আলোতেই পড়তাম। এসএসসির পর টিউশনি করে নিজের পড়াশোনার খরচ চালিয়েছি। রাজাপুর গ্রামের গৃহশিক্ষক হৃদয় খান আমাকে পড়ানোর পাশাপাশি আর্থিক সহযোগিতাও করেছেন।’
সাগর বলেন, গত বছরের ২ জুলাই একটি বেসরকারি ব্যাংকে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন। চাকরিতে যোগদানের মাত্র ৯ দিন পর তাঁর মা মারা যান। পরে ৪৬তম বিসিএসে তথ্য ক্যাডারে সুপারিশ পেলেও মায়ের স্বপ্ন পূরণে প্রশাসন ক্যাডারের প্রস্তুতি চালিয়ে যান। ৪৭তম বিসিএসে সেই লক্ষ্য পূরণ হয়েছে। মেধাতালিকায় তাঁর অবস্থান ৩৫তম।
সাগরকে নিয়ে গর্ববোধ করেন ছোট ভাই সাব্বির খান। এমন সফলতা মা দেখে না যেতে পারায় আক্ষেপ করে বলেন, ‘বাবা অনেক কষ্ট করে আমাদের বড় করেছেন। ভাইয়ের এই সাফল্যে সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন আমাদের মা।’
ছোটবেলা থেকেই সাগর পড়াশোনায় বেশ আগ্রহী ছিলেন। সেই আগ্রহ ও পরিশ্রমই তাঁকে এমন সাফল্যের সঙ্গ দিয়েছে বলে মনে করেন বন্ধু কল্লোল খান। তিনি বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই ওকে যেভাবে দেখেছি, তা অবাক করার মতো। ছোটবেলা থেকেই লক্ষ্য অর্জনে তার অসাধারণ নিষ্ঠা ও একাগ্রতা ছিল। অন্যদের মতো এত সাধারণ ছিল না।’
সাগরের বাবা আকবর খান বলেন, ‘আমার মতো অভাবীর ঘরে আল্লাহ চাঁদের আলো দিয়েছেন। অভাবের কারণে সব সময় আমি ওর আবদার পূরণ করতে পারতাম না। তবে ওর চাহিদা যে এত সুন্দর হইব, তা কহনো ভাবতেও পারি নাই। ও আমাগো সবার মুখ উজ্জ্বল করেছে। আমি চাই, ও সততা আর নিষ্ঠার সঙ্গে দেশের মানুষের সেবা করুক।’
এমন সাফল্যকে সমাজের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করেন রাজাপুর–কহেলা বাহরাম মল্লিক উচ্চবিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মুহম্মদ আবদুল খালেক। তিনি বলেন, ‘সাগর শুধু আমাদের বিদ্যালয়ের নয়, সারা দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য অনুকরণীয়। এটি প্রমাণ করে, পরিস্থিতি নয়, ইচ্ছাশক্তিই সাফল্যের মূল।’