চট্টগ্রাম নগরের দেওয়ান হাটে ছুটা মাংস বিক্রির হাট। আজ বেলা তিনটার দিকে
চট্টগ্রাম নগরের দেওয়ান হাটে ছুটা মাংস বিক্রির হাট। আজ বেলা তিনটার দিকে

চট্টগ্রামে ছুটা মাংসের হাট

‘মা মেডিক্যালে ভর্তি, মাংস বিক্রি করে ওষুধ কিনব’

ঈদের দুপুর। চট্টগ্রাম নগরের দেওয়ানহাট মোড়ে তখন ছোট ছোট দলে বসে মাংস বিক্রি করছেন অনেকে। কারও সামনে পলিথিনে রাখা গরুর মাংস। কোথাও হাড়, চর্বি আর মাংস একসঙ্গে রাখা। কেউ দাম হাঁকছেন। কেউ দরাদরি করছেন। পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতেই মানুষ থেমে দেখছেন। কেউ আধা কেজি, কেউ দুই-তিন কেজি কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।

মোড়ের এক পাশে বসেছিলেন সখিনা বেগম। সামনে ৭-৮ কেজি গরুর মাংস। দুপুর পর্যন্ত হালিশহরের বিভিন্ন বাড়ি ঘুরে এই মাংস সংগ্রহ করেছেন তিনি। পরে বিক্রির জন্য চলে আসেন দেওয়ানহাটে। মাংসের দাম হাঁকছিলেন ৬ হাজার টাকা। কিন্তু ৪ হাজার টাকার বেশি উঠছিল না। তাই মাংস নিয়েই বসে ছিলেন পথের পাশে।

একফাঁকে কথা হয় সখিনা বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, তাঁর মা লাইলা বেগম এক সপ্তাহ ধরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি। বুকের ব্যথা আর উচ্চ রক্তচাপে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। মায়ের দেখাশোনা করতে গিয়ে কয়েক দিন ধরে পোশাক কারখানাতেও যেতে পারছেন না তিনি।

সখিনা বললেন, ‘মা মেডিক্যালে ভর্তি। প্রতিদিন ২ থেকে ৩ হাজার টাকার ওষুধ লাগে। মাংস বিক্রি করে মায়ের জন্য ওষুধ কিনব। এখন টাকার খুব দরকার। এ কদিনে জমা টাকা সব শেষ।’

৩৫ বছর বয়সী সখিনা থাকেন নগরের ইপিজেড এলাকায়। দুই ছেলেকে নিয়ে তাঁর সংসার। বড় ছেলে রিকশা চালান। ছোট ছেলে সবজির দোকানে কাজ করে। স্বামী কয়েক বছর আগে দ্বিতীয় বিয়ে করে আলাদা হয়ে গেছেন। কোনো খোঁজখবরও নেন না। খরচ দেন না।

সখিনা বলেন, ‘আমার ছয় ভাই। আমি একমাত্র মেয়ে। মা-বাবা দুজনই অসুস্থ। ভাইয়েরা কেউ খরচ দেয় না। কষ্ট করে চলি। আজ সারা দিন বাড়ি বাড়ি গিয়ে মাংস খুঁজে আনলাম। এখন বিক্রি করে কিছু টাকা পাব।’

তবে সব মাংস বিক্রি করেননি তিনি। এক কেজির মতো রেখে দিয়েছেন বাসার জন্য। তিনি বললেন, ‘মাংস খাওয়ার মতো অবস্থা নাই। তবু ঈদের দিন ছেলেরা খাবে। তাই একটু রাখছি।’

দেওয়ানহাটে শুধু সখিনা নন, আরও ১৫ থেকে ২০ জনকে দেখা গেল খুঁজে আনা কোরবানির মাংস বিক্রি করতে। কারও সামনে দুই কেজি। কারও সামনে ১০-১২ কেজি। বেশির ভাগই নিম্ন আয়ের মানুষ। কেউ রিকশাচালক। কেউ দিনমজুর। কেউ বাসাবাড়িতে কাজ করেন।

মোহাম্মদ দেলোয়ার নামের এক ব্যক্তি জানান, তিনটি বাড়িতে আজ মাংস কাটার কাজ করেছেন। সেখান থেকে ৪-৫ কেজি মাংস পেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি একা থাকি। রিকশা চালাই। গ্যারেজে ঘুমাই। এত মাংস খাওয়ার লোক নাই। তাই বিক্রি করে টাকাটা বাড়িতে পাঠাব।’

শুধু দেওয়ানহাট নয়, ঈদের দিন চট্টগ্রাম নগরের আরও কয়েকটি এলাকায় এমন মাংসের অস্থায়ী বাজার বসে। দুই নম্বর গেট, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, নিউমার্কেট ও আন্দরকিল্লা এলাকায় ঘুরেও একই চিত্র দেখা গেছে।

কোথাও ফুটপাতের পাশে। কোথাও সড়কের মোড়ে। আবার কোথাও বাজারের গলিতে বসে বিক্রি হচ্ছে কোরবানির মাংস। অনেকে বাসাবাড়ি থেকে পাওয়া মাংস বিক্রি করছেন। কেউ আবার কসাইয়ের কাজ করে পাওয়া অংশ বিক্রি করছেন।

দেওয়ানহাট থেকে ৬ কেজি মাংস কিনেছেন আবু জাফর। দাম পড়েছে ৫ হাজার টাকা। তিনি বলেন, ‘মাংস, চর্বি, হাড়—সব মিলিয়ে আছে। কোরবানি দেওয়ার সামর্থ্য নাই। কিন্তু বাসায় খালি হাতে যাওয়া যায় না। তাই প্রতিবছর এখান থেকে মাংস কিনি।’

ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, বাজারের তুলনায় ঈদের দিন কিছুটা কম দামে মাংস পাওয়া যায়। তাই অনেকেই বিকেলের দিকে এসব জায়গায় ভিড় করেন।

দেওয়ানহাটে কথা হয় পোশাকশ্রমিক মোহাম্মদ শফিউলের সঙ্গে। কয়েক কেজি মাংস কিনে ব্যাগে ভরছিলেন তিনি। থাকেন নগরের ইপিজেড এলাকায়। শফিউল বলেন, ‘কোরবানি দেওয়ার সামর্থ্য নাই। সংসার চালাতেই কষ্ট হয়। তারপরও ঈদের দিন বাসায় একটু ভালো খাবার তো লাগবে। এখান থেকে কম দামে মাংস কিনলাম। দুই মেয়ে খুশি হবে।’