
উৎপাদন খরচের তুলনায় দাম মিলছে কম। এর ওপর হঠাৎ বৃষ্টিতে ক্ষতি হয়েছে লবণমাঠের। এমন অবস্থায় বিপাকে পড়েছেন কক্সবাজারের লবণচাষিরা। অনেক চাষি মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই লবণ উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছেন।
চলতি মৌসুমে (১৫ নভেম্বর থেকে ১৫ মে) জেলার প্রায় ৬৮ হাজার ৫০০ একর জমিতে লবণ চাষ হয়েছে। চাষের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন প্রায় ৪২ হাজার চাষি। তাঁদের বেশির ভাগই বৃষ্টির আশঙ্কায় এরই মধ্যে লবণ উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে কক্সবাজারের টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীর দ্বীপের উত্তরপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বঙ্গোপসাগর ও নাফ নদীর সঙ্গে যুক্ত ‘ভরা খালের’ দুই পাশে কয়েক শ একরের লবণমাঠ। কয়েকটি জায়গায় সাদা লবণের স্তূপ। বিশাল মাঠে হাতে গোনা কয়েকজন শ্রমিক লবণ সংগ্রহের কাজ করছেন। মাঠে এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে কালো পলিথিন।
ভরা খালের পাশে কিছু নৌকা ও ছোট ট্রাকে লবণ বোঝাই করছিলেন কয়েকজন শ্রমিক। তাঁদের একজন জানান, বৃষ্টিতে লবণ নষ্ট হবে, তাই গুদামে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
আবদুল জলিল নামের একজন চাষির সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, ৭ ও ৮ এপ্রিল কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে খালের দুই পাশে ৭০০ থেকে ৮০০ একর মাঠে লবণ উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় উৎপাদিত লবণও বিক্রি করা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘এক মণ লবণ উৎপাদন করতে খরচ হয় ২৯০ টাকা, বিক্রি করতে হচ্ছে ২৪০ থেকে ২৫০ টাকা। লোকসান দিয়ে আর কত লবণ বিক্রি করব?’
আবদুল জলিল জানান, গত বছরের ২৭ নভেম্বর ভরা খালের উত্তর পাশে ১ একর মাঠে লবণ চাষ শুরু করেন তিনি। ৭ এপ্রিল পর্যন্ত ৪ মাস ১০ দিনে মাঠে উৎপাদিত হয়েছে ৪৫০ মণ লবণ। তিনি বলেন, ‘গত চার মাসই লোকসান দিয়ে লবণ বিক্রি করেছি। দাদনের টাকা পরিশোধ করব দূরে থাক, সংসার চালাব কী দিয়ে ভেবে পাচ্ছি না।’
আরেক চাষি ফরিদুল আলম বলেন, লবণের মৌসুম শেষ হয়ে আসছে, হাতে আছে মাত্র ২০ থেকে ২৫ দিন। এর মধ্যে কালবৈশাখী-বৃষ্টি হতে পারে। একবার বৃষ্টি হলে ৭ থেকে ৮ দিন লবণ উৎপাদন বন্ধ থাকে। তাই বাড়তি টাকা খরচ করে অল্প কিছুদিনের জন্য মাঠ সংস্কারের পর পুনরায় লবণ উৎপাদনে নামার সাহস চাষিরা পাচ্ছেন না। তিনি জানান, ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে লবণ বিক্রি হয়েছে ১৯০ থেকে ২১০ টাকায়। মার্চের মাঝামাঝিতে এসে লবণের দাম কিছুটা বেড়ে ২৩০ থেকে ২৫০ টাকা হয়।
আরেক কৃষক জালাল আহমদ বলেন, ‘আগামী ১৫ মে লবণ উৎপাদনের মৌসুম শেষ হবে। এখন বৃষ্টির যা অবস্থা, লবণের দাম না বাড়লে চাষিরা পুনরায় উৎপাদন শুরুর ঝুঁকি নেবে না। দাম অন্তত প্রতি মণ ৪০০ টাকা হওয়া উচিত।’
টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা, রঙিখালী, ঝিমংখালী, খারাংখালী, মৌলভীবাজার এলাকায় গিয়েও দেখা যায়, বেশির ভাগ লবণমাঠে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। রঙিখালীর চাষি নবী হোসেন বলেন, ‘সামনে কালবৈশাখীর তাণ্ডব, ঝড়বৃষ্টি হতে পারে। তখন ৭ থেকে ৮ দিন উৎপাদন বন্ধ থাকবে। এরপর ১০ থেকে ১৫ দিনের জন্য মাঠ সংস্কার করে লাভ নেই।’
এক মণ লবণ উৎপাদন করতে খরচ হয় ২৯০ টাকা, বিক্রি করতে হচ্ছে ২৪০ থেকে ২৫০ টাকা। লোকসান দিয়ে আর কত লবণ বিক্রি করব?আবদুল জলিল, লবণচাষি, টেকনাফ।
মহেশখালীর হারিয়ারঘোনার চাষি আনচার উল্লাহ মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ৮ এপ্রিল এক ঘণ্টার বৃষ্টিতে তাঁর ২৫০ মণ লবণ ভেসে গেছে। এর পর থেকে লবণ উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। এপ্রিল মাসে আরও ঝড়বৃষ্টি হবে, সেই আশঙ্কায় তিনি আর মাঠ সংস্কার করছেন না।
মহেশখালী উপজেলার কুতুবজোমের চাষি নবাব মিয়া ও ঘটিভাঙার চাষি গিয়াস উদ্দিন জানান, নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে ঘন কুয়াশা ও শৈত্যপ্রবাহ থাকার কারণে উপজেলার লবণচাষিদের মাঠে নামতে ২০ থেকে ২৫ দিন দেরি হয়েছে। এখন আবার বৈরী পরিবেশের কারণে ১৫ থেকে ২০ দিন আগেই মাঠ ছাড়তে হচ্ছে। এ কারণে লবণ উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। অধিকাংশ চাষি ঋণ ও দাদনের টাকায় লবণ চাষে নামেন। লবণ উৎপাদন কম হওয়ায় ঋণের টাকা পরিশোধ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তাঁরা।
লবণ উৎপাদনে ধস
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) দেওয়া তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে (১৫ নভেম্বর থেকে ১৫ মে পর্যন্ত) কক্সবাজার সদর, কুতুবদিয়া, মহেশখালী, পেকুয়া, চকরিয়া, ঈদগাঁও, টেকনাফ ও চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় ৬৮ হাজার ৫০৫ একর জমিতে লবণের চাষ হয়েছে। ৬ এপ্রিল পর্যন্ত লবণ উৎপাদিত হয়েছে ১৩ লাখ ৭৩ হাজার ২৭২ মেট্রিক টন, যা গত মৌসুমের (একই সময়ে) তুলনায় ৪ লাখ ৪৯ হাজার মেট্রিক টন কম। গত মৌসুমে একই সময়ে লবণ উৎপাদিত হয়েছিল ১৮ লাখ ২২ হাজার ১৬২ মেট্রিক টন। চলতি মৌসুমে লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৮ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন। দেশে লবণের চাহিদা ২৭ লাখ ৩৫ হাজার মেট্রিক টন।
লক্ষ্যমাত্রার কম লবণ উৎপাদনের কারণ জানতে চাইলে বিসিকের কক্সবাজার লবণ উন্নয়ন প্রকল্পের মাঠ পরিদর্শক মো. ইদ্রিস আলী প্রথম আলোকে বলেন, ৭ ও ৮ এপ্রিলের ভারী বৃষ্টিতে শতভাগ লবণমাঠ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর পর থেকে লবণ উৎপাদন বন্ধ আছে। বৃষ্টির পানিতে শত শত চাষির লবণ গলে (নষ্ট) গেছে। তিনি আরও বলেন, চলতি মৌসুমে শৈত্যপ্রবাহ ও ঘন কুয়াশার কারণে চাষিদের লবণ উৎপাদনে নামতে ২০ থেকে ২৫ দিন বিলম্ব হয়েছে। উৎপাদিত লবণের ন্যায্যমূল্য পাওয়া যাচ্ছে না। এখন প্রচণ্ড রোদ দেখা দিলেও ঝড়বৃষ্টির শঙ্কা থাকায় চাষিরা মাঠে নামতে সাহস পাচ্ছেন না। মৌসুমের শেষ মুহূর্তে এসে ক্ষতিগ্রস্ত চাষিরা দিশা হারিয়ে ফেলছেন। জেলায় প্রান্তিক চাষির সংখ্যা প্রায় ৪২ হাজার জানিয়ে তিনি বলেন, সর্বশেষ ৬ এপ্রিল এক দিনে লবণ উৎপাদিত হয়েছিল ১৩ হাজার ৬০০ মেট্রিক টন।
লবণ উৎপাদনে জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিসিক কক্সবাজার লবণ শিল্প উন্নয়ন কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক মো. জাফর ইকবাল ভূঁইয়া। তিনি বলেন, বর্তমানে মাঠ ও মিল (কারখানা) পর্যায়ে নতুন-পুরোনো মিলে ১০ লাখ ৭০ হাজার মেট্রিক টন লবণ মজুত রয়েছে।
লবণচাষি ও কক্সবাজার-৩ (সদর, রামু ও ঈদগাঁও) আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল বলেন, বৈরী পরিবেশ ও দুর্যোগের কবলে পড়ে লবণচাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অন্যদিকে উৎপাদিত লবণের ন্যায্যমূল্য পাওয়া যাচ্ছে না। সংকটের অজুহাত দেখিয়ে একটি সিন্ডিকেট লবণ আমদানির চেষ্টা করছে। লবণ আমদানি হলে প্রান্তিক চাষিদের দুঃখ-দুর্দশা আরও বেড়ে যাবে। লবণ উৎপাদন, পরিবহন, বিপণন ও ব্যবসায় সঙ্গে জেলার অন্তত ১০ লাখ মানুষ জড়িত।