
সকাল থেকেই রৌদ্রোজ্জ্বল নীল আকাশ। ভ্যাপসা গরম, মাঝেমধ্যে হালকা বাতাস বইছে। আকাশে হেলিকপ্টার, উড়োজাহাজ, ঘোড়া, চিলসহ নানা আকৃতি ও রঙের ঘুড়ি। জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার সন্ন্যাসতলীতে শুক্রবার বসেছে শতবর্ষী ঐতিহ্যের ঘুড়ির মেলা। মেলা ঘিরে পুরো এলাকায় উৎসবের আমেজ।
প্রতিবছর জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষ শুক্রবার ক্ষেতলালের মামুদপুর ইউনিয়নের জিয়াপুর ও মহব্বতপুর গ্রামের মধ্যবর্তী তুলসীগঙ্গা নদীর তীরবর্তী সন্ন্যাসতলীতে এ মেলা বসে। রীতি অনুযায়ী, এবারও শুক্রবার সকাল থেকে মেলা শুরু হয়েছে। এক দিনের অনুমতি থাকলেও কেনাবেচা ও দর্শনার্থীদের উপস্থিতি পরদিন পর্যন্ত থাকে বলে জানিয়েছেন আয়োজকেরা।
স্থানীয় ব্যক্তিদের ভাষ্য, সন্ন্যাসতলীর মন্দিরকে কেন্দ্র করে কয়েক শ বছর আগে এ মেলার সূচনা হয়। ক্ষেতলাল উপজেলা সদর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে এ মেলার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ঘুড়ি। সারা বছর অপেক্ষার পর শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সী মানুষ এখানে এসে ঘুড়ি কেনেন ও পাশের খোলা মাঠে ওড়ান। কার ঘুড়ি কত ওপরে উঠবে কিংবা কে কার ঘুড়ির সুতা কাটতে পারবেন, তা নিয়ে চলে দিনভর প্রতিযোগিতা। মেলাকে কেন্দ্র করে আশপাশের গ্রামের বাড়িগুলোতে আত্মীয়স্বজনেরা আসেন। ঘুড়ির পাশাপাশি বাঁশের তৈরি মাছ ধরার সরঞ্জাম, মৌসুমি ফল, মিষ্টি, গৃহস্থালিসামগ্রী ও কাঠের আসবাবও বিক্রি হয়। দ্বিতীয় দিনটি মূলত নারীদের কেনাকাটার জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়। মেলাটি স্থানীয়ভাবে মিলনমেলায় পরিণত হয়।
শুক্রবার বিকেলে মেলায় গিয়ে দেখা যায়, সন্ন্যাসতলী মন্দিরসংলগ্ন এলাকায় বিভিন্ন খাবার, মিষ্টি ও প্রসাধনীর দোকান বসেছে। পাশের মাঠজুড়ে রয়েছে ১৫০ থেকে ২০০ ঘুড়ির দোকান। সেখানে শিশু-কিশোরসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষের ভিড়। বিক্রেতারা জানান, ৫০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত দামের ঘুড়ি বিক্রি হচ্ছে। এর মধ্যে ‘চায়না চিল’ ঘুড়ির চাহিদা সবচেয়ে বেশি।
জালালপুর গ্রামের বাসিন্দা আফজাল হোসেন (৬০) বলেন, ‘জন্মের পর থেকে এই মেলা দেখে আসছি। আশপাশের জেলা থেকেও মানুষ এখানে আসেন। তবে মেলার প্রধান আকর্ষণ ঘুড়ি।’
বগুড়া থেকে ক্ষেতলালে আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে এসেছেন আসলাম হোসেন। মেলায় ঘুড়ি কেনার পর বলেন, ‘দুটি চায়না চিল ঘুড়ি ৭৫০ টাকায় কিনেছি। এত বড় ঘুড়ির মেলা আগে দেখিনি। খুব ভালো লাগছে।’
আক্কেলপুর পৌরসভার বাসিন্দা আজাদ হোসেন বলেন, ‘নাতি ঘুড়ি কেনার জন্য জেদ ধরেছিল। তাই মেলায় এসেছি। ছোটবেলায় আমিও এখান থেকে ঘুড়ি কিনেছি।’
ঘুড়ি বিক্রেতা নয়ন ইসলাম বলেন, ‘চায়না চিল, দেশি ঘুড়ি, বাক্স, ঘোড়া, হাঁস ও বিমান আকৃতির নানা ধরনের ঘুড়ি এনেছি। এর মধ্যে চায়না চিল সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে। শিশু-কিশোর থেকে বয়স্ক সব বয়সী মানুষ ঘুড়ি কিনছেন। ১০-১২ বছর ধরে সন্ন্যাসতলীর মেলায় আসছি।’
মেলা কমিটির সভাপতি মন্টু চন্দ্র দাস বলেন, পূর্বপুরুষদের সময় থেকে এই মেলা চলে আসছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যবসায়ীরা মেলায় আসেন। এখানে অনেক ঘুড়ি বিক্রি হয়।
ক্ষেতলাল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুক্তাদুল আলম বলেন, সন্ন্যাসতলীর ঘুড়ির মেলার এক দিনের অনুমতি রয়েছে। মেলার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।