
বর্ণিল সাজে সেজেছে চারপাশ। ভেসে আসছে ঢাকঢোল আর সানাইয়ের সুর। আত্মীয়স্বজন ও অতিথিদের আগমনে উৎসবমুখর পরিবেশ। একটি বিয়ের অনুষ্ঠানকে ঘিরে এই আয়োজন। তবে মানুষের নয়, বট আর পাকুড়গাছের বিয়ে। বটগাছ কনে আর পাকুড়গাছ বর।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার চিলারং ইউনিয়নের কিসমত পাহাড়ভাঙ্গা গ্রামে আজ শুক্রবার বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। সনাতন ধর্মীয় রীতিতে যেভাবে মানুষের বিয়ের আয়োজন করা হয়, ঠিক সেভাবেই এই বিয়ের যাবতীয় আয়োজন সম্পন্ন হয়। অনুষ্ঠান দেখতে দূরদূরান্ত থেকে আসা মানুষের ঢল নামে।
আয়োজকেরা জানান, প্রকৃতি ও ব্যক্তির মঙ্গল কামনায় এ ধরনের বিয়ের আয়োজন করা হয়েছে। বিয়ের বেশির ভাগ ব্যয় বহন করেছেন বর-কনের অভিভাবকেরা। পাশাপাশি ভক্তদের দান-দক্ষিণাও আছে।
বিয়ের আয়োজন শুরু হয় গতকাল বৃহস্পতিবার গায়েহলুদ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। আজ শুক্রবার দুপুরে বিয়ের মূল অনুষ্ঠানে দেখা যায়, কালীমন্দিরের পাশের পুকুরপাড়ে থাকা পাকুড়গাছকে পরানো হয়েছে সাদা ধুতি আর বটগাছকে পরানো হয়েছে লাল-হলুদ শাড়ি, সঙ্গে ফুলের মালা। বিয়ের মণ্ডপে আঁকা হয়েছে আলপনা। তাতে ধান-দুর্বা-হলুদ, সিঁদুর, ধূপকাঠি, কলা, দই, সন্দেশসহ বিভিন্ন পদের মিষ্টান্ন রাখা হয়েছে। বর-কনের অভিভাবকদের বসানো হয়েছে বেদির সামনে। পুরোহিতের মন্ত্রের সঙ্গে চলছে উলুধ্বনি। বাজছে বিয়ের সানাই, ঢাকঢোল, কাঁসর। নিমন্ত্রিত অতিথিরা তা উপভোগ করছেন। বেলা আড়াইটার দিকে সনাতন ধর্মীয় রীতিতে মন্ত্রোচ্চারণের পরই সাত পাকে বাঁধা পড়েন বর-কনে। আমন্ত্রিত অতিথিরা বিভিন্ন উপহার দিয়ে তাঁদের আশীর্বাদ করেন। বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার পরই শুরু হয় মধ্যাহ্নভোজ।
বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সারতে আসা পুরোহিত শুভন চক্রবর্তী বলেন, বর–কনে একসঙ্গে বড় হয়েছে। বট ও পাকুড় হিন্দুশাস্ত্রে দেবতা বৃক্ষ। পূজাতেও এই দুটি গাছ লাগে। এ কারণে বট-পাকুড়ের বিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মূলত ব্যক্তির মোক্ষলাভ ও প্রকৃতি বিনাশের হাত থেকে রক্ষা করা এবং মানুষকে বৃক্ষপ্রেমী করে তোলার উদ্দেশ্যেই এই বিয়ের আয়োজন।
বট-পাকুড়ের এই বিয়েতে কনেপক্ষের পিতার দায়িত্ব পালন করেন চিলারং ইউনিয়নের চিলারং গ্রামের পরিমল চন্দ্র বর্মন (৫৫)। আর বরপক্ষের হয়ে সব দায়িত্ব পালন করেন একই ইউনিয়নের কিসমত পাহাড়ভাঙ্গা গ্রামের বলরাম সরকার (৬০)।
পরিমল চন্দ্র বর্মন জানান, চার বছর আগে বট আর তিন বছর আগে পাকুড়গাছটি লাগানো হয়েছিল। প্রবীণদের পরামর্শে প্রকৃতির মঙ্গল কামনায় তিনি এই বিয়ের আয়োজন করেছেন।
বলরাম সরকার বলেন, ‘পরিবারের বড়দের নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এই বিয়ে দিচ্ছি। বিয়ের উৎসবে কোনো কমতি রাখা হয়নি। আত্মীয়স্বজন ও এলাকাবাসীসহ প্রায় ৪০০ পরিবারকে নিমন্ত্রণ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে সবার জন্য ভোজের ব্যবস্থা তো আছেই।’
ব্যতিক্রমী এই বিয়ে দেখতে আশপাশের গ্রাম থেকেও ছুটে আসেন অনেকে। চিলারং ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য রেজাউল ইসলাম বলেন, ‘বট-পাকুড়ের বিয়ের কথা এত দিন শুনে এসেছি। পরিচিত একজনের কাছে বিয়ের নিমন্ত্রণ কার্ড দেখে কৌতূহলী হয়েই বিয়েবাড়িতে এসেছি।’
বট-পাকুড়ের বিয়ের বিষয়ে ঠাকুরগাঁওয়ের প্রবীণ শিক্ষাবিদ মনতোষ কুমার দে বলেন, এটি মূলত একটি লোকাচার। বট-পাকুড়ের বিয়ে আসলে পরিবেশ সংরক্ষণের বার্তা। এই গাছগুলো প্রকৃতিতে অনেক অবদান রাখে। প্রকৃতিবাদীরা প্রকৃতিপ্রেম থেকে বট-পাকুড়ের বিয়ের আয়োজন করেন।