প্রতিবন্ধী ক্রীড়াবিদ চাঁদমান শাহরিয়ার
প্রতিবন্ধী ক্রীড়াবিদ চাঁদমান শাহরিয়ার

কথা বলতে পারেন না, শোনেন না কানেও, সেই শাহরিয়ার এখন মা-বাবার গর্ব

আড়াই বছর বয়সে জ্বর বদলে দেয় পুরো জীবন। টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে হারান নিজের বাক্‌ ও শ্রবণশক্তি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই শিশুটি হয়ে ওঠে পরিবারের গর্ব—এমনকি দেশের মুখ। আন্তর্জাতিক মঞ্চে একে একে জেতেন তিনটি স্বর্ণপদক।

প্রতিবন্ধী ক্রীড়াবিদ চাঁদমান শাহরিয়ারের জীবনের গল্পটা এমন। তাঁর বয়স ১৯ বছর। গত বছরের সেপ্টেম্বরে মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত বিশেষ অলিম্পিকে তিনটি স্বর্ণপদক জিতেছেন তিনি। ওই অলিম্পিকে এশিয়া প্যাসিফিক ব্যাডমিন্টন প্রতিযোগিতায় পুরুষ সিঙ্গেল, পুরুষ ডাবলস ও পুরুষ ইউনিফায়েড—তিনটি ইভেন্টেই তিনি পদক পান। বাংলাদেশের অটিস্টিক ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড়দের মধ্যে বর্তমানে তিনি শীর্ষে রয়েছেন।

শাহরিয়ারের বাড়ি ফেনী পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর বিরিঞ্চি এলাকার কামাল হাজারী সড়ক এলাকায়। বাবা মোহাম্মদ বেলাল আহমেদ ও মা নূর নাহার। এ দম্পতির পরপর চার কন্যাসন্তানের পর জন্ম হয় তাঁর। একমাত্র ছেলে হওয়ার আনন্দ তখন ছিল পরিবারজুড়ে। এ কারণেই আদর করে তাঁর নাম রাখা হয়েছিল চাঁদমান শাহরিয়ার। তবে আড়াই বছর বয়সেই পরিবারে এ আনন্দে ভাটা পড়ে।

শাহরিয়ার শুনতে ও স্বাভাবিকভাবে পড়তে না পারায় তাঁর শিক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে পরিবার। কোথায় ভর্তি করানো যায়—এই প্রশ্নে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ঘুরতে থাকেন মা–বাবা। একপর্যায়ে ২০১২ সালে তাঁকে ভর্তি করা হয় ফেনী বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক স্কুলে।

এই স্কুলই বদলে দেয় শাহরিয়ারের জীবনের গতিপথ। এখানে এসে প্রথমবার নিজেকে প্রকাশের সুযোগ পান তিনি। ছবি আঁকা, খেলাধুলা সবকিছুতেই ধীরে ধীরে ফুটে উঠতে থাকে তাঁর প্রতিভা।

যেভাবে ক্রীড়াবিদ হন শাহরিয়ার

ছয় বছর বয়সে বিদ্যালয়ের ভর্তি হওয়ার পর থেকেই বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় নিয়মিত অংশ নেওয়া শুরু করেন শাহরিয়ার। একাধিক প্রতিযোগিতাতেও জয়ী হন তিনি। এরপরই বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নজরে আসেন। ৫০ ও ১০০ মিটার দৌড় থেকে চিত্রাঙ্কন—সব প্রতিযোগিতায় প্রথম হন তিনি। প্রায় ছয় ফুট (৫ ফুট ১১ ইঞ্চি) লম্বা শাহরিয়ার পরবর্তী সময়ে ফুটবল, সাঁতার ও ব্যাডমিন্টনেও দক্ষতা অর্জন করেন।

অবশ্য শাহরিয়ার শুধু বিদ্যালয়ের গণ্ডিতেই আটকা থাকেননি। জেলা, বিভাগ ও জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া শুরু করেন তিনি। নিয়মিত পেতে থাকেন সাফল্যও। ২০১৮ সালে বিশেষ অলিম্পিক চট্টগ্রাম বিভাগীয় ট্যালেন্ট হান্ট প্রতিযোগিতাতেও অংশ নিয়েছিলেন। ওই প্রতিযোগিতায় ব্যাডমিন্টন ও সাঁতারে প্রথম এবং দৌড়ে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন তিনি। তবে ঠান্ডাজনিত শারীরিক সমস্যার কারণে পরবর্তী সময়ে সাঁতার থেকে ছিটকে পড়তে হয় তাঁকে।

এরপরই জেঁকে বসে করোনার মহামারি। তবে তখনো থেমে থাকেননি শাহরিয়ার। তখন চিত্রাঙ্কনে সুনাম কুড়াতে থাকেন তিনি। তাঁর আঁকা দৃষ্টিনন্দন ছবি সে সময় স্থান পায় প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের শুভেচ্ছা বার্তায়।

গত এক দশকে জেলা, বিভাগ ও জাতীয় পর্যায়ে অন্তত দুই ডজন মেডেল ও সনদ অর্জন করেছেন শাহরিয়ার। তবে ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যায় তাঁর অনেক মেডেল ও সনদ পানিতে নষ্ট হয়ে যায়।

২০২২ সালে জাতীয় পর্যায়ে ব্যাডমিন্টন টুর্নামেন্টে একক ও দ্বৈত ইভেন্টে রানারআপ হন শাহরিয়ার। এই সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালে জার্মানিতে অনুষ্ঠিত বিশেষ অলিম্পিকে তাঁর অংশ নেওয়ার কথা ছিল। তবে আইনি জটিলতায় শেষ পর্যন্ত এটি হয়ে ওঠেনি।

তবে অংশ নিতে না পারার বঞ্চনা তাঁকে দমাতে পারেনি। এরপরও তিনি নিয়মিত অনুশীলন চালাতে থাকেন। অবশেষে গত বছরের সেপ্টেম্বরে মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত বিশেষ অলিম্পিকে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। সরকারি সহায়তার পাশাপাশি ধারদেনা ও অনুদানের টাকায় সেখানে যান তিনি।

২০২৭ সালে দক্ষিণ আমেরিকার চিলিতে অনুষ্ঠেয় বিশেষ অলিম্পিকে অংশ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে শাহরিয়ারের। তবে অর্থাভাবে এ প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা করছে তাঁর পরিবার ও প্রতিবেশীরা।

বাংলাদেশ ব্যাডমিন্টনের জাতীয় দলের কোচ ও ফেনী ব্যাডমিন্টন একাডেমির পরিচালক আবদুল হান্নান বলেন, ‘বাংলাদেশের অটিস্টিক ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড়দের মধ্যে শাহরিয়ার দেশের ১ নম্বর। ২০২৭ সালের স্পেশাল অলিম্পিকের তালিকায় তাঁর নাম শীর্ষে রয়েছে। কিন্তু আর্থিক সংকটে তাঁর পথচলা ঝুঁকির মুখে।’

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শাহরিয়ারের বাবা মোহাম্মদ বেলাল আহমেদ কুয়েতপ্রবাসী ছিলেন। ২০২১ সালে তিনি দেশে ফেরেন। এর পর থেকে ফেনী শহরের রেলগেট এলাকায় ছোট্ট একটি পানের দোকান দিয়েছেন। এ দোকানের আয় থেকেই মূলত এখন সংসার চলছে। এ কারণে ঢাকায় নিয়মিত প্রশিক্ষণ, উন্নত মানের ক্রীড়া সরঞ্জাম ও আবাসিক খরচ—সব মিলিয়ে যে ব্যয়, তা বহন করা সম্ভব হচ্ছে না।

শাহরিয়ারের প্রতিবেশী মাহবুবুর রহমান বলেন, এলাকাবাসী শাহরিয়ারকে নিয়ে গর্ব করেন। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একাধিক স্বর্ণপদকজয়ী এই ক্রীড়াবিদের পাশে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের দাঁড়ানো প্রয়োজন।

ফেনী বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক স্কুলের প্রধান শিক্ষক জাকারিয়া ফারুক বলেন, ‘শাহরিয়ার বিদ্যালয়টির অন্যান্য শিক্ষার্থীর তুলনায় অনেক বেশি মেধাবী। সরকার নিয়মিত আর্থিক সহায়তা দিলে তিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের সুনাম আরও বাড়াতে পারবেন।’

ফেনী জেলায় বর্তমানে ক্রীড়া কর্মকর্তার পদ শূন্য। সদ্য বিদায়ী জেলা ক্রীড়া কর্মকর্তা হীরা আক্তার বলেন, প্রতিবন্ধী শাহরিয়ার বাংলাদেশের গর্ব। তাঁর পাশে সরকারি সংস্থার পাশাপাশি সর্বস্তরের মানুষ দাঁড়ানো প্রয়োজন। মালয়েশিয়ার স্বর্ণপদক অর্জনের পর তাঁকে নিয়ে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। জেলা প্রশাসক আশ্বাস দিলেও তিনি বদলি হওয়ায় আর এগোনো যায়নি।