আষাঢ় মাস। মাঝে মাঝেই আকাশে ঘোর করে মেঘ জমছে, ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামছে। দিনের বেলা কখনো হালকা রোদের গা ভিজিয়ে যায় এই বৃষ্টি—প্রকৃতি এখন এ রকমই। সকালের নরম আলোতে গাছ, ফুল প্রকৃতি তখন আরও নরম, আরও কাছের হয়ে আছে। গাছের পাতায়, ফুলের পাপড়িতে, ঘাসের ঠোঁটে জমে আছে বৃষ্টির ফোঁটা—আর্দ্র মমতা হয়ে তারাও যেন একেকটি বৃষ্টির ফুল। বৃষ্টিধোয়া পাতারা আরও সবুজ হয়ে উঠেছে। ফুলগুলো আরও মায়াবী, আরও স্নিগ্ধ রূপ খুলে নিঃশব্দ-নীরবে যেন রূপবতী ফুলদের জলসা বসিয়েছে।
শুক্রবার সকালে মৌলভীবাজারের পৌর জনমিলন কেন্দ্রের পাশে গড়ে ওঠা ‘প্রবীণাঙ্গনে’ গিয়ে অনেক রঙের, অনেক জাতের ফুলের সঙ্গে দেখা। বৃষ্টিধোয়া নরম ফুলগুলো দেখে একটি কবিতার অনুবাদ মনে পড়ে, ‘উহা ফুটিয়া থাকে কারণ উহা ফুটিয়াই থাকে/উহা নজরে নজরে রাখে না নিজেকে/জানিতেই চাহে না কেহ উহাকে দেখিল কি দেখিল না...।’
প্রবীণাঙ্গনের ফুলগুলোও এ রকমই। কেমন উদাস, উদার। বাগানের একপাশে পৌর জনমিলন প্রাঙ্গণে প্রতিদিন সকালের মতো একদল প্রবীণ শরীরচর্চা করছেন। শুধু আকাশটা মেঘলা ছিল—এই আষাঢ়ে এমনটাই তো হয়ে থাকে, এমন বাদলঘোরইতো এই বর্ষায় প্রকৃতিকে আরও কাছের করে রাখে।
এই প্রবীণাঙ্গনে ফোটা ফুলগুলো হয়তো শরীরচর্চা করতে যাঁরা আসেন, তাঁদের আসা-যাওয়ার পথে কারও চোখে পড়ে থাকে—কেউ হয়তো দাঁড়িয়ে দেখেন ফুলের এই নিঃশব্দ-নীরব আনন্দ জলসাটি। একসঙ্গে অনেক ফুল, অনেক ফুলের পাপড়ি মেলা আনন্দ। কেউ হয়তো না দেখেই চলে গেছেন। এতে ফুলগুলোর তেমন কিছুই আসে যায় না—তারা আছে তাদের মতো। যার যখন ফোটবার, সে তখনই ফুটছে।
প্রবীণাঙ্গনে ঢোকার মুখ থেকেই শুরু হয় মুগ্ধ হওয়ার পালা। অঙ্গনটি এত সবুজ হয়ে আছে—চোখ ফেরানো যায় না। সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে ফুটে আছে সাদা, লাল, গোলাপি, হলুদ নানা রঙের ফুল। সবগুলো ফুলই চোখকাড়া, মনজুড়ানো। ফুলের পাপড়িতে ফোঁটা ফোঁটা হয়ে জমে আছে রাতের বৃষ্টি। মৃদু বাতাস চলছে। তাতে ফুলসমেত গাছের শাখাগুলো দুলছে—যেন তারা এইমাত্র জলদিঘি থেকে স্নান সেরে উঠে এসেছে, সেই জলভেজা শরীর নিয়ে নাচছে। গাছের গোড়ায় ঘাসগুলো আরও মনোরম, আরও সবুজ হয়ে আছে। বড় আকারের কিছু গাছে জড়িয়ে আছে লতানো ফুলের ঝাড়। এগুলোর অনেকটাতে ফুল নেই—তবু এত সবুজ, এত মায়া। তারা যেন কিছুতেই গাছকে ছাড়তে চাইছে না। বেশির ভাগ ফুলের গাছই ছোট ও মাঝারি উচ্চতার।
প্রবীণাঙ্গনের হাঁটাপথ ধরে যত ভেতরে যাওয়া যায় তত দেখা যায়, এই ছোট অঙ্গনটি এখন অনেক রূপ-লাবণ্য ধরে আছে। শুধু কি ফুলই আছে—গাঢ় হয়ে জমে থাকা আগুন শিখার মতো অগ্নীশ্বর পাতাবাহার থেকে শুরু করে আছে অনেক জাতের রঙিন পাতার গাছ। দেশ-বিদেশের নানা জাতের ফুলের মধ্যে আছে লাল ও হলুদ রঙ্গন। নারীর ঝোপালো খোঁপার মতো থোকা থোকা রঙ্গন ফুটে আছে গাছে। লাল, হলুদ ও গোলাপি অলকানন্দা ফুল—মনে হয় বহুকাল ধরেই যেন তারা কারও অপেক্ষায় কাতর। কে তাকে ডাকছে, কে তাকে ডাকেনি—তাদের কিছুই যায় আসে না, তাদের অপেক্ষাও ফুরায় না। ফুটেছে জবা, মুসেন্ডা, কলাবতীরাও—সবাই ফুটেছে যার যার রূপে। ঘাসের শরীর থেকে কিছু ওপরে ফুটে আছে নীল রঙের গ্রাউন্ড অর্কিড—এই নীলে তারাই বা কম কিসে।
তোতা পাখির ঠোঁটের মতো ডালে ডালে ফুটেছে হলুদ-সোনালি হেলিকনিয়া (তোতার ঠোঁট)। মন হয় একঝাঁক পাখি বসে আছে ডালে। কারও সাড়া পেলেই এই সাতসকালে তারা ডাল ছেড়ে শূন্যে উড়াল দেবে। সবুজ পাতাদের ওড়না সরিয়ে ফুটে আছে গোলাপি কেউ, ফুটেছে লিপস্টিক জিনজার। লম্বাটে সবুজ পাতার ফাঁকে আরও লম্বাটে পাপড়ি মেলে আছে সাদা-হালকা গোলাপির মিশেলে সুখদর্শন ফুল। আছে চিরপরিচিত গোলাপ, ফুটেছে সাদা ফুরুস। রূপে কেউ থেকে কেউ পিছিয়ে নেই। যার যার মতো সবাই রূপবতী এই ‘প্রবীণাঙ্গনে’।
শহরের জ্যেষ্ঠ নাগরিকদের একটুখানি অবসর কাটানো, নীরব-নির্জনে বসে আনন্দ-বিনোদনের জন্য মৌলভীবাজার পৌরসভার উদ্যোগে এই প্রবীণাঙ্গন গড়ে তোলা হয়েছে। নানা জাতের ফুলগাছে সাজিয়ে তোলা হয়েছে। একসময়ের উঁচু-নিচু এলোমেলো এই টিলাভূমিকে দৃষ্টিনন্দন করা হয়েছে। পৌর জনমিলন কেন্দ্র থেকে প্রবীণাঙ্গনকে আলাদা করে দেওয়া হয়েছে, যাতে জনমিলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠানাদি হলেও জ্যেষ্ঠ নাগরিকেরা অস্বস্তিবোধ না করেন, বিব্রত না হন। ২০১৯ সালের নভেম্বর থেকে অঙ্গনটিকে প্রবীণদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। সেই থেকে সকাল-বিকেলে অনেকেই অবসর সময় কাটাতে এখানে আসেন। তাঁদের সঙ্গে সব সময় আছে কোনো না কোনো রূপবতী ফুল, বসছে ফুলদের জলসা।