কুমিল্লা শহরে কান্দি খালের প্রস্থের তুলনায় ছোট আকারের কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে। এতে ভারী বৃষ্টির সময় পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। গতকাল নগরের শাকতলা এলাকায়
কুমিল্লা শহরে কান্দি খালের প্রস্থের তুলনায় ছোট আকারের কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে। এতে ভারী বৃষ্টির সময় পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। গতকাল নগরের শাকতলা এলাকায়

বর্ষায় জলাবদ্ধতা 

কুমিল্লার ‘দুঃখ’ কান্দি খাল

৮০ থেকে ৯৫ ফুট প্রশস্ত কান্দি খাল এখন অনেক স্থানে মাত্র ৮ থেকে ১৫ ফুটে নেমে এসেছে। 

হাঁটু থেকে কোথাও কোথাও কোমরসমান পানি মাড়িয়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছাতে হয়েছে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের। ১৩ জুলাই টানা বর্ষণে কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজসহ নগরের বিভিন্ন এলাকায় সৃষ্টি হওয়া জলাবদ্ধতার সেই দৃশ্য দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। ওই দিন পরীক্ষার কারণে বিষয়টি আলোচনায় এলেও কুমিল্লা নগরবাসীর কাছে জলাবদ্ধতা নতুন কিছু নয়।

নগরের কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, বছরের পর বছর ধরে নগরের পানি অপসারণের প্রধান মাধ্যম কান্দি খাল। এই খাল দখল, ভরাট ও অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণের ফলেই কুমিল্লা এখন সামান্য বৃষ্টিতেই তলিয়ে যায়। প্রায় ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই খাল হয়ে পানি গুঙ্গাইজুড়ি খাল পেরিয়ে ডাকাতিয়া নদীতে গিয়ে পড়ে। অথচ একসময় ৮০ থেকে ৯৫ ফুট প্রশস্ত এই খাল এখন অনেক স্থানে মাত্র ৮ থেকে ১৫ ফুটে নেমে এসেছে। এর মধ্যেই কোথাও খালের ওপর প্রস্থের তুলনায় ছোট আকারের কালভার্ট, কোথাও স্টিলের সেতু, কোথাও আবার পাইপলাইন বা স্থায়ী দখল—সব মিলিয়ে খালটি কার্যত সরু নালায় পরিণত হয়েছে।

কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. ইউসুফ মোল্লা (টিপু) বলেন, নগরের পানি অপসারণের অন্যতম প্রধান মাধ্যম কান্দি খাল। পানি চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে এমন কোনো স্থাপনা রাখা হবে না। সরকারি প্রতিষ্ঠান হোক বা ব্যক্তি—সবাইকে আইন মানতে হবে। ইতিমধ্যে কয়েকটি প্রতিবন্ধকতা অপসারণ করা হয়েছে। যারা নিজ দায়িত্বে কালভার্টসহ স্থাপনা সরাবে না, সেগুলো সিটি করপোরেশন ভেঙে দেবে। পাশাপাশি খালের সীমানা নির্ধারণ করে অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গতকাল রোববার সরেজমিনে নগরের সালাউদ্দিন মোড় থেকে নোয়াগাঁও চৌমুহনী পর্যন্ত ঘুরে দেখা যায়, সরকারি প্রতিষ্ঠানসহ খালের পাড়ে অসংখ্য ব্যক্তি যাতায়াতের সুবিধার জন্য ছোট ছোট কালভার্ট নির্মাণ করেছেন। অনেক জায়গায় বহুতল ভবনের অংশ খালের ভেতরে চলে গেছে। বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের সীমানাপ্রাচীরও খালের জায়গা দখল করে রেখেছে। সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের কার্যালয়, আইইবিসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সামনে খালের প্রস্থের তুলনায় অনেক ছোট কালভার্ট নির্মাণ করায় পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

এলাকার কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কান্দি খালের ‘কফিনে শেষ পেরেকটি’ মারা হয় কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়কটি চার লেনে উন্নীতকরণের সময়। ২০১৮ সালে ৫৯ কিলোমিটার দীর্ঘ কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়কটি চার লেনে উন্নীতকরণের কাজ শুরু হয়। ওই সময় কুমিল্লা নগরের টমছম ব্রিজ এলাকা থেকে পদুয়ার বাজার পর্যন্ত দুই লেনের সড়কটি চার লেন করতে গিয়ে কান্দি খালের প্রায় অর্ধেক সংকুচিত করে সওজ। প্রকল্পটির কাজ চলাকালে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের মেয়র ছিলেন মনিরুল হক সাক্কু। তিনি সে সময় কান্দি খাল ভরাট আটকাতে পারেননি। ওই চার লেন প্রকল্পের কাজ করতে গিয়ে খালটির প্রায় অর্ধেক অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলার পর থেকে কুমিল্লা নগরে জলাবদ্ধতার তীব্রতা বেড়েছে।

জানতে চাইলে সওজ অধিদপ্তর কুমিল্লার নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার গোলাম মোস্তফা প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠান কান্দি খালের কোনো সম্পত্তি দখল করেনি।

কুমিল্লার ইতিহাস-গবেষক আহসানুল কবীর প্রথম আলোকে বলেন, তিন দশক আগেও কুমিল্লা নগরে এমন জলাবদ্ধতা ছিল না। নগরের বেশির ভাগ পানি কান্দি খাল হয়ে গুঙ্গাইজুড়ি খালের মাধ্যমে ডাকাতিয়া নদী হয়ে অপসারণ হতো। ৮০ ফুটের বেশি প্রস্থের খাল ১০-১৫ ফুটের নালায় পরিণত হওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতে নগরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে।

কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. ইউসুফ মোল্লা বলেন, নগরের পানি অপসারণের অন্যতম প্রধান মাধ্যম কান্দি খাল। পানি চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে এমন কোনো স্থাপনা রাখা হবে না। সরকারি প্রতিষ্ঠান হোক বা ব্যক্তি—সবাইকে আইন মানতে হবে। ইতিমধ্যে কয়েকটি প্রতিবন্ধকতা অপসারণ করা হয়েছে। যারা নিজ দায়িত্বে কালভার্টসহ স্থাপনা সরাবে না, সেগুলো সিটি করপোরেশন ভেঙে দেবে। পাশাপাশি খালের সীমানা নির্ধারণ করে অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।