
গ্রামীণ বাজারের ভেতর ছোট্ট চায়ের দোকানের বসে আছেন মধ্যবয়সী কয়েকজন। সবার মুখেই নির্বাচনের আলোচনা। প্রার্থীরা কে, কেমন—বিশ্লেষণ করছেন দোকানি ও ক্রেতারা। মাদারীপুর সদর উপজেলার চরনাচনা বাজারে গতকাল বুধবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে চিত্র।
মিনিট দশেক পরই ওই বাজারে হর্ন বাজিয়ে প্রবেশ করল কয়েকটি মোটরসাইকেল ও একটি গাড়ি। গাড়ি থেকে নামলেন মাদারীপুর-২ (রাজৈর ও সদরের একাংশ) আসনে বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী মিল্টন বৈদ্য। তাঁকে ঘিরে সমর্থকেরা স্লোগান দিচ্ছেন—‘প্রার্থী কি আছে? থাকলে বলো কলস, সেই নেতা মিল্টন ভাই, মা-বোনদের কলস, উন্নয়নে কলস।’ মিল্টন বৈদ্য দোকানে দোকানে গিয়ে প্রচারপত্র বিলি করছেন এবং তাঁর নির্বাচনী প্রতীক কলসে ভোট প্রার্থনা করে দোয়া চাইছেন।
চরনাচনা বাজারে চায়ের দোকানি ইকবাল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই প্রথম আমার দোকানে কোনো প্রার্থী সরাসরি আইলো। তাঁর আন্তরিকতা খুব ভালো। সবাইকে কাছে টেনে জড়িয়ে ধরছেন। বিষয়টা আমাগো কাছেই ভালো লাগছে। আগে তাঁর নাম শুনছি, কিন্তু এবারই তাঁরে প্রথমবার দেখলাম।’
এক ঘণ্টা চরনাচনা বাজার ও এলাকায় গণসংযোগ করে মিল্টন বৈদ্য চলে গেলেন পার্শ্ববর্তী কালিকাপুর এলাকায়। সেখানে তিনি ঘরে ঘরে ভোট প্রার্থনা করেন। সেখান থেকে চলে গেলেন নতুন রাজারহাট, মিরাকান্দি এলাকায়। গণসংযোগের একপর্যায় মিল্টন বৈদ্য সনাতন ধর্মের এক অনুষ্ঠানেও যোগ দেন। সেখানে তিনি ভোটারদের উদ্দেশে বলেন, ‘এবার নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন হচ্ছে। আপনারা দলে দলে ভোটকেন্দ্রে যাবেন। যদি আমাকে আপনাদের ভালো মনে হয় তাহলে আমি আপনাদের কাছে কলস প্রতীকে ভোট চাই। কোনো সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও ভণ্ড কোনো ব্যক্তিকে আপনাদের মূল্যবান ভোট দিয়েন না। মনে রাখবেন, পরিবর্তনের চাবি এবার আপনাদের হাতে।’
মিল্টন বৈদ্য গতকাল রাত প্রায় সাড়ে ৮টা পর্যন্ত নির্বাচনী এলাকার বিভিন্ন গ্রাম ও বাজারে গণসংযোগ করেন। মিল্টন বৈদ্য বলেন, ‘আমি জনগণের জন্য লড়ছি। ছাত্রজীবন থেকে বিএনপির রাজনীতি করেছি। এখন মানুষের জন্য রাজনীতি করে যাচ্ছি। রাজৈর উপজেলার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত। জেলায় কোনো শিল্পায়ন নেই। কর্মসংস্থানের কোনো উদ্যোগ নেই। সব মিলকারখানা বন্ধ। আমি গণমানুষের ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটাতে চাই। মানুষের সুখে–দুঃখে পাশে থাকতে চাই। তাই জনসভা, মিছিল, মিটিং করে ভোট চাই না। ভোট চাই মানুষের দ্বারে গিয়ে। মানুষের কথা শুনি, ভোটাররা তাদের প্রত্যাশার কথা আমাকে জানায়। তাদের কষ্টের কথা জানায়। আমি তাদের প্রত্যাশা পূরণের আশা দিচ্ছি। যদি নির্বাচিত হতে পারি আমার নির্বাচনী এলাকার গণমানুষের উন্নয়ন ঘটাব।’
মিল্টন বৈদ্য ২০১৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছিলেন । তিনি জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য। তিনি কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
রাজৈর উপজেলার আমগ্রাম এলাকায় মিল্টন বৈদ্যের বাড়ি। এখান থেকে তিনি তাঁর নির্বাচনী সব কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। ২০১৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন পান মিল্টন বৈদ্য। তিনি জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য। তিনি কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ালেখা অবস্থায় ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এই নেতা ২০১৪ সালে রাজৈর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বিএনপি থেকে মনোনয়ন চেয়েছিলেন। দলীয় সমর্থন না পাওয়ায় তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন। এখানে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন মাদারীপুর জেলা বিএনপির সদস্যসচিব জাহান্দার আলী মিয়া।
আমি গণমানুষের ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটাতে চাই। মানুষের সুখে–দুঃখে পাশে থাকতে চাই। তাই জনসভা, মিছিল, মিটিং করে ভোট চাই না। ভোট চাই মানুষের দ্বারে গিয়ে। মানুষের কথা শুনি, ভোটাররা তাদের প্রত্যাশার কথা আমাকে জানায়।মিল্টন বৈদ্য, স্বতন্ত্র প্রার্থী
নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী জাহান্দারের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী মিল্টন বৈদ্য। নির্বাচনে এই দুই প্রার্থীকে ঘিরে চলছে উত্তাপ। দলের নেতা–কর্মীদের মধ্যেও একটি বড় অংশ মিল্টন বৈদ্যের হয়ে প্রচার কাজে অংশ নিয়েছেন।
এই দুজন ছাড়াও অন্য প্রার্থীরা হলেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আলী আহমদ চৌধুরী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আব্দুস সোবাহান, জাতীয় পার্টির মহিদুল ইসলাম মুহিদ হাওলাদার, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল বাসদের (মার্ক্সবাদী) দিদার হোসেন, কল্যাণ পার্টির সুবল চন্দ্র মজুমদার এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী কামরুল ইসলাম সাঈদ আনসারী, শহীদুল ইসলাম খান ও রেয়াজুল ইসলাম।