সাজেক অবরোধের প্রভাবে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ হর্টিকালচার পার্কে পর্যটক নেই। আজ বিকেলে তোলা
সাজেক অবরোধের প্রভাবে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ হর্টিকালচার পার্কে পর্যটক নেই। আজ বিকেলে তোলা

সাজেকে অবরোধ

‘এক সপ্তাহ ধরে বেচাবিক্রি নেই, কিস্তির টাকা কেমনে দেব’

‘মাসে কিস্তি দিতে হয় ৩৫ হাজার টাকা। এ ছাড়া দোকান ভাড়া ও কর্মচারীর বেতন দিতে হয় প্রায় ১৭ হাজার টাকা। আগে দিনে গড়ে ১০ হাজার টাকা বিক্রি হতো। সাত দিন ধরে বেচাবিক্রি নেই।  এখন কী করব কিছুই বুঝতে পারছি না। এমন চলতে থাকলে পথে বসা ছাড়া উপায় থাকবে না।’

কথাগুলো বলছিলেন বিকিরণ রোয়াজা। খাগড়াছড়ি সদরের আদালত সড়কে তাঁর কাপড়ের দোকান রয়েছে। পর্যটকেরাই মূলত এ দোকানের ক্রেতা। তবে আট দিন ধরে চলা রাঙামাটির সাজেকে অবরোধের প্রভাবে খাগড়াছড়িতে তেমন পর্যটক আসছেন না। সাজেকের অবস্থান রাঙামাটিতে হলেও এতে যেতে হয় খাগড়াছড়ি হয়ে। অনেকেই সাজেক ঘুরে আসার পর খাগড়াছড়ি শহরে বিভিন্ন কেনাকাটা করেন। এখন আর এ বিক্রি হচ্ছে না।

অবশ্য শুধু বিকিরণ রোয়াজা নন, তাঁর মতো একই অবস্থা খাগড়াছড়ির শতাধিক দোকান, হোটেল ও পরিবহনসংশ্লিষ্টদের। এক সপ্তাহ ধরে তাঁদের কারও তেমন আয় হয়নি। এ কারণে তাঁরা দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।

খাগড়াছড়ি শহরের জুমলাইন মার্কেটের পাহাড়িকা নামের একটি দোকানের কর্মচারী মেকি চাকমা বলেন, ‘সাজেকে যাঁরা ঘুরতে যান, তাঁরাই মূলত আমাদের গ্রাহক। স্থানীয়দের আমাদের নিজস্ব টেক্সটাইলের পোশাকের প্রতি তেমন আগ্রহ নেই। সাজেক বন্ধ থাকায় খাগড়াছড়িতে পর্যটক নেই বললেই চলে। এক সপ্তাহ ধরে কোনো বেচাকেনা নেই। সোম ও মঙ্গলবার সারা দিনে এক টাকারও বিক্রি করতে পারিনি। দোকান খুলে সারা দিন বসে ছিলাম।’

খাগড়াছড়ি শহরের শাপলা চত্বর এলাকার সাদামাটা হোটেলের মালিক দিদারুল আলম বলেন, সাজেক বন্ধ হওয়ার পর প্রতিদিন ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা লোকসান হচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে দোকান বন্ধ করে দিতে হবে।

শহরের মিলনপুর এলাকার গাইরিং হোটেলের ব্যবস্থাপক প্রান্ত ত্রিপুরা বলেন, ‘সাজেক বন্ধ থাকায় আমাদের হোটেলের অর্ধেকের বেশি কক্ষ খালি। আমাদের হোটেলে তবু কিছু অতিথি রয়েছেন। কোনো কোনো হোটেলে একটি কক্ষেও অতিথি নেই।’

সাজেক অবরোধের প্রভাব পড়েছে খাগড়াছড়ির স্থানীয় পর্যটনকেন্দ্রেও। পার্বত্য জেলা পরিষদ হর্টিকালচার পার্কের কর্মচারী মনতোষ ত্রিপুরা বলেন, এক সপ্তাহ ধরে কোনো পর্যটক নেই। প্রতিদিন স্থানীয় ৪০ থেকে ৫০ জন পর্যটক আসছেন। সাজেক খোলা থাকার সময় প্রতিদিন চার–পাঁচ শ টিকিট বিক্রি হতো। এখন পর্যটকের অভাবে জিপ লাইন, জায়ান্ট সুইং বন্ধ রয়েছে। এতে চড়ার মতো কেউ নেই।

পর্যটকের অভাবে পড়ে রয়েছে চাঁদের গাড়ি (পুরোনো জিপ)। আজ বিকেলে খাগড়াছড়ি জেলা শহরের সাজেক কাউন্টারের সামনে থেকে তোলা

আট দিন ধরে সাজেকে অবরোধ

২২ অক্টোবর থেকে সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের ডাকে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ চলছে। এটি এ দুই সংগঠনের তৃতীয় দফা অবরোধ। সংগঠন দুটির অন্যতম দাবি, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (সন্তু লারমা-সমর্থিত জেএসএস) সশস্ত্র সদস্যদের সাজেক এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া।

তবে জেএসএস এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সংগঠনটির তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা প্রথম আলোকে বলেন, সাজেকে সাধারণ মানুষের ওপর ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যদের দীর্ঘদিনের নিপীড়ন ও হয়রানির বিষয়টি আড়াল করতেই এমন মনগড়া অভিযোগ তোলা হচ্ছে।

অবরোধের শুরু হয়েছিল চলতি ১১ অক্টোবর। ওই দিন তিন দাবিতে এক দিনের অবরোধ কর্মসূচি পালন করে সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন। ১৫ অক্টোবর দ্বিতীয় দফায় আবার অবরোধের ডাক দেওয়া হয়। অবশ্য শারদীয় দুর্গাপূজার জন্য ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর কর্মসূচি স্থগিত করা হয়। দুর্গাপূজা শেষে ২১ অক্টোবর এক বিজ্ঞপ্তিতে অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ঘোষণা দেয় দুটি সংগঠন।

এরপর নিরাপত্তাঝুঁকি বিবেচনায় সাজেক পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন। নির্দেশনা অনুযায়ী, ২২ সেপ্টেম্বর সকাল থেকে পর্যটকেরা সাজেক ছাড়তে শুরু করেন। তবে ফেরার পথে উজো বাজার এলাকায় গোলাগুলি হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানায়, ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা গুলি চালিয়েছেন। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে ইউপিডিএফ।

সাজেকে অবরোধ চলাকালে হামলা, লাঠিপেটা এবং ঘরবাড়ি ও দোকানপাট ভাঙচুরের প্রতিবাদে এবং সাজেকবাসীর দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে ‘ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ’ নামের একটি সংগঠন রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে গত শনিবার অর্ধদিবস অবরোধ কর্মসূচি পালন করে।