লোডশেডিংয়ে ভোগান্তিতে রোগী ও স্বজনেরা। গত শনিবার দুপুরে নীলফামারী জেনারেল হাসপাতালে
লোডশেডিংয়ে ভোগান্তিতে রোগী ও স্বজনেরা। গত শনিবার দুপুরে নীলফামারী জেনারেল হাসপাতালে

কোথাও অস্ত্রোপচারের শুরুতে লোডশেডিং, কোথাও বন্ধ নেবুলাইজার–প্যাথলজি পরীক্ষা

শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে ৫৮ দিনের শিশু হাফছা জাহানের। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে গত শনিবার চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হয়েছে সে। শ্বাসকষ্ট কমাতে দিনে একাধিকবার নেবুলাইজার দেওয়ার কথা; কিন্তু হাসপাতালে বিদ্যুৎ না থাকায় ঠিকমতো চিকিৎসা দেওয়া যাচ্ছে না। মাথার ওপরের পাখাটিও বন্ধ। গরমে শ্বাসকষ্ট আরও বাড়ছে। অসুস্থ মেয়েকে কোলে নিয়ে কখন বিদ্যুৎ আসবে, সেই অপেক্ষায় রয়েছেন মা কামরুন নাহার। এই চিত্র গতকাল রোববারের।

হাফছা জাহানের মতো একই অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে চট্টগ্রামের পটিয়া ও লক্ষ্মীপুরের রায়পুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার মা ও শিশুদের। পটিয়ায় নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত দেড় বছরের মোফাছিরকে দিনে ছয়বার নেবুলাইজার দেওয়ার কথা থাকলেও গত শনিবার দেওয়া গেছে তিনবার। রায়পুরে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত চার বছরের শিশু মিনু আক্তারের দিনে চারবার নেবুলাইজার প্রয়োজন; কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় নিয়মিত দেওয়া যাচ্ছে না।

উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে ব্যাহত হচ্ছে অন্যান্য চিকিৎসাসেবাও। বিদ্যুৎ চলে গেলে কোথাও নেবুলাইজার, কোথাও এক্স-রে ও ইসিজি বন্ধ থাকছে। এমনকি প্যাথলজি পরীক্ষাও থেমে যাচ্ছে। কোনো কোনো হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের মাঝখানে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় জেনারেটর চালু করতে হচ্ছে। আবার জেনারেটর থাকলেও কোথাও জ্বালানি নেই। ফলে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে এসে রোগী ও স্বজনদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে—কখন বিদ্যুৎ আসবে। আবার বিদ্যুৎহীন সময়ে রোগী ও স্বজনদের সময় কাটাতে হচ্ছে অসহনীয় গরমের মধ্যে। গত শনিবার ও গতকাল দেশের ১টি জেলা সদর ও ১৩টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ঘুরে এবং রোগী, স্বজন ও চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে চিকিৎসাসেবায় বিদ্যুৎ–সংকটের এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

হাসপাতালে বিদ্যুৎ না থাকায় ঠিকমতো চিকিৎসা দেওয়া যাচ্ছে না। মাথার ওপরের পাখাটিও বন্ধ। গরমে শ্বাসকষ্ট আরও বাড়ছে। অসুস্থ মেয়েকে কোলে নিয়ে কখন বিদ্যুৎ আসবে, সেই অপেক্ষায় রয়েছেন মা কামরুন নাহার। এই চিত্র গতকাল রোববারের।

দেশে গ্যাসের সংকটের সঙ্গে এক মাসের বেশি সময় ধরে চলছে বিদ্যুতের সংকটও। মাঝেমধ্যে বৃষ্টি হলে লোডশেডিংয়ের মাত্রা কমে, গরম পড়লে বেড়ে যায়। শুরুতে লোডশেডিংয়ের পুরোটাই ছিল ঢাকার বাইরে। ১২ আগস্ট রাত থেকে সরকারি নির্দেশনায় ঢাকাতেও লোডশেডিং করা হচ্ছে। প্রতিদিন ঢাকার কোনো একটি এলাকায় একবার এক ঘণ্টা করে লোডশেডিং করার কথা থাকলেও সেটি মানা হচ্ছে না।

হাসপাতালে বিদ্যুৎ নেই। ভর্তি শিশুকে কোলে নিয়ে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছেন মা। শনিবার মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও বিদ্যুৎ সঞ্চালন কোম্পানি পাওয়ার গ্রিড পিএলসির (পিজিসিবি) তথ্য বলছে, জ্বালানির অভাবে চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। এর প্রভাব এখন পৌঁছে গেছে উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতেও।

বিদ্যুৎ ছাড়া পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ হাসপাতালের যাবতীয় কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। এমনকি অস্ত্রোপচার শুরুর পরও অনেক সময় বিদ্যুৎ চলে যায়, যা অত্যন্ত ঝুঁকি তৈরি করে। একটি জেনারেটর মেরামত করা হলেও প্রয়োজনীয় জ্বালানি বরাদ্দ না থাকায় তা নিয়মিত সচল রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
বাগমারা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা শংকর কুমার বিশ্বাস

অস্ত্রোপচারও ব্যাহত

রাজশাহীর বাগমারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সপ্তাহখানেক আগে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার চলছিল। অস্ত্রোপচার শুরু হওয়ার পরই লোডশেডিং। হঠাৎ অন্ধকার নেমে এলে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত মুঠোফোনের আলো জ্বালিয়ে এবং দ্রুত তেল কিনে জেনারেটর চালু করে অস্ত্রোপচার শেষ করতে হয়।

৫০ শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন বহির্বিভাগে বিপুলসংখ্যক রোগী চিকিৎসা নেন। গতকাল সরেজমিনে দেখা গেছে, লোডশেডিংয়ের কারণে এক্স-রে, ল্যাবরেটরি ও ইসিজি সেবাও ব্যাহত হচ্ছে।

বাগমারা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা শংকর কুমার বিশ্বাস বলেন, বিদ্যুৎ ছাড়া পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ হাসপাতালের যাবতীয় কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। এমনকি অস্ত্রোপচার শুরুর পরও অনেক সময় বিদ্যুৎ চলে যায়, যা অত্যন্ত ঝুঁকি তৈরি করে। একটি জেনারেটর মেরামত করা হলেও প্রয়োজনীয় জ্বালানি বরাদ্দ না থাকায় তা নিয়মিত সচল রাখা সম্ভব হচ্ছে না।

অস্ত্রোপচার শুরুর প্রায় ১৫ মিনিট পর বিদ্যুৎ চলে যায়। তখন শাপলা বেগমের কন্যাসন্তান জন্ম নেয়। শিশুটিকে ওটি থেকে বের করে আনা হলেও তখনো মায়ের অস্ত্রোপচার শেষ হয়নি, সেলাই চলছিল। কিছুক্ষণ পর জেনারেটর চালু করে বাকি কাজ শেষ করা হয়।

নীলফামারী জেনারেল হাসপাতালেও অস্ত্রোপচারের সময় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। গত শনিবার সকাল থেকে হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে দেখা যায়, বিদ্যুৎ–বিভ্রাটের কারণে রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা, অস্ত্রোপচার ও রোগী ভর্তির কার্যক্রমে ভোগান্তি হচ্ছে। বেলা একটার দিকে অস্ত্রোপচারকক্ষের সামনে ছিল রোগীর স্বজনদের ভিড়। তখন শাপলা বেগম নামের এক নারীকে সিজারের জন্য ওটিতে নেওয়া হয়।

অস্ত্রোপচার শুরুর প্রায় ১৫ মিনিট পর বিদ্যুৎ চলে যায়। তখন শাপলা বেগমের কন্যাসন্তান জন্ম নেয়। শিশুটিকে ওটি থেকে বের করে আনা হলেও তখনো মায়ের অস্ত্রোপচার শেষ হয়নি, সেলাই চলছিল। কিছুক্ষণ পর জেনারেটর চালু করে বাকি কাজ শেষ করা হয়।

বিদ্যুৎ নেই, ফ্যান বন্ধ। চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোববার দুপুরে

অস্ত্রোপচার কক্ষের দায়িত্বে থাকা জ্যেষ্ঠ স্টাফ নার্স বৃষ্টি রায় বলেন, এখানে প্রতিদিন চার থেকে পাঁচটি সিজার করা হয়; কিন্তু বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে এখন একটি বা দুটির বেশি করা যায় না। আজ (শনিবার) একটি করা হয়েছে। তিনি বলেন, এই হাসপাতালে অর্থোপেডিকস, নাক কান গলা (ইএনটি), সার্জারিসহ প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনের পাঁচ–ছয়টি অস্ত্রোপচার করা হয়। লোডশেডিংয়ের কারণে এখন এসব অস্ত্রোপচারের সংখ্যা কমেছে।

অস্ত্রোপচার কক্ষের ইনচার্জ বিধান চন্দ্র রায় বলেন, অস্ত্রোপচারের জন্য যে পরিবেশ দরকার, তা না থাকলে সমস্যা হয়। অস্ত্রোপচারের সময় বিদ্যুৎ চলে গেলে জেনারেটর চালাতে হয়। তখন এসি চালানো যায় না। এ অবস্থায় কর্তব্যরত চিকিৎসক বা নার্সের শরীরের ঘাম রোগীর কাটা স্থানে পড়লে সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে।

কোথাও জেনারেটর আছে, তেল নেই

বিদ্যুৎ চলে গেলে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে জেনারেটর থাকার কথা; কিন্তু বিভিন্ন হাসপাতালে জেনারেটর থাকলেও জ্বালানি তেল থাকে না। চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একমাত্র জেনারেটর জ্বালানির অভাবে বন্ধ। এটি চালাতে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ লিটার তেল প্রয়োজন; কিন্তু ওই তেল কেনার জন্য অর্থ বরাদ্দ নেই।

মতলব দক্ষিণ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসক রাজিব কিশোর বণিক বলেন, হাসপাতালে কয়েক দিন ধরে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ থাকে না। চলে ঘন ঘন লোডশেডিং। ব্যাহত হচ্ছে এক্স-রে, ইসিজি ও নেবুলাইজেশন কার্যক্রম। বিদ্যুতের অভাবে হাসপাতালের সার্বিক চিকিৎসাসেবা বিঘ্নিত হচ্ছে।

লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও জেনারেটর রয়েছে; কিন্তু ডিজেলের বরাদ্দ না থাকায় প্রয়োজনের সময় চালানো যাচ্ছে না।

চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একমাত্র জেনারেটর জ্বালানির অভাবে বন্ধ। এটি চালাতে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ লিটার তেল প্রয়োজন; কিন্তু ওই তেল কেনার জন্য অর্থ বরাদ্দ নেই।

আবার অনেক হাসপাতালে জেনারেটরেরও ব্যবস্থা নেই। যেমন পাবনার বেড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জেনারেটর না থাকায় বিদ্যুৎ চলে গেলে রোগী ও স্বজনদের দুর্ভোগ বেড়ে যায়। প্যাথলজি বিভাগের ইনচার্জ গোলাম সরোয়ার বলেন, বিদ্যুৎ চলে গেলে পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ বন্ধ রাখতে হয়। রোগীদের অপেক্ষা করাতে হয়।

গরমে হাতপাখাই ভরসা। রাজশাহীর বাগমারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোববার দুপুরে

মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রাতে বিদ্যুৎ চলে গেলে মোমবাতি জ্বালাতে হয়। চিকিৎসকেরা মুঠোফোনের টর্চের আলোয় ওয়ার্ডে রোগী দেখেন। জুড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একটি বেসরকারি সংস্থার দেওয়া আইপিএস আছে। সেটি দিয়ে রাতে দুটি ওয়ার্ডে একটি করে বাল্ব জ্বালানো যায়।

এক্স-রে করাতে বাইরে ছুটতে হচ্ছে

বিদ্যুৎ–বিভ্রাটের সবচেয়ে সরাসরি প্রভাব পড়ছে পরীক্ষা-নিরীক্ষায়। টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে লোডশেডিংয়ের সঙ্গে কম ভোল্টেজের কারণে এক্স-রে মেশিন মাঝেমধ্যে অচল হয়ে পড়ছে। গত শনিবার হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, গড়গোবিন্দপুর গ্রামের রফিকুল ইসলাম মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হয়ে হাসপাতালে এসেছেন; কিন্তু এক্স-রে মেশিন চালু না থাকায় বেসরকারি ক্লিনিকে গিয়ে ৫০০ টাকা দিয়ে পরীক্ষা করাতে হয়েছে। সরকারি হাসপাতালে পরীক্ষা করাতে তাঁর খরচ হতো ৫৫ টাকা।

সখীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক্স-রে বিভাগের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট এস এম আমিরুল ইসলাম মোমেন বলেন, লোডশেডিংয়ের পাশাপাশি কম ভোল্টেজ থাকায় এক্স-রে মেশিন মাঝেমধ্যে অচল হয়ে যাচ্ছে।

গতকাল খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে লো-ভোল্টেজের কারণে এক্স-রে সেবা অধিকাংশ সময় বন্ধ থাকছে। চিকিৎসকের পরামর্শে রোগীদের বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে হচ্ছে।

লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গতকাল রোববার হাতের আঙুল ভেঙে যাওয়ায় এক্স-রে করাতে এসেছিলেন কামরুল ইসলাম। প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষা করেও বিদ্যুৎ না আসায় পরীক্ষা না করিয়েই তাঁকে ফিরে যেতে হয়। তিনি বলেন, ‘রায়পুরের চরবংশী থেকে হাসপাতালে এসেছি এক্স-রে করানোর জন্য। এক ঘণ্টা অপেক্ষা করেছি। কখন বিদ্যুৎ আসবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাই বাধ্য হয়ে ফিরে যাচ্ছি।’

গতকাল খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে লো-ভোল্টেজের কারণে এক্স-রে সেবা অধিকাংশ সময় বন্ধ থাকছে। চিকিৎসকের পরামর্শে রোগীদের বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে হচ্ছে।

চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অসুস্থ বৃদ্ধ মায়ের এক্স-রে করাতে এসে গতকাল দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করেছিলেন দক্ষিণ উপজেলা সদরের বাসিন্দা আবদুল ওয়াদুদ। পরে তাঁকে পাশের বেসরকারি হাসপাতালে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

রোগীর পাশে হাতপাখা নিয়ে স্বজনেরা

লোডশেডিং শুধু যন্ত্রপাতি বন্ধ করছে না, হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের স্বাভাবিক জীবনও দুর্বিষহ করে তুলছে। গতকাল পাবনার বেড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, জ্বরে আক্রান্ত ১৮ বছরের ছেলে আশিক হোসেনের পাশে বসে একটানা হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছিলেন তাঁর মা আসমা খাতুন। তাঁর ভাষায়, রাতে বারবার বিদ্যুৎ গেছে। গরমে তাঁর ছেলেসহ অন্য রোগীরাও অস্থির হয়ে পড়েছে।

বিদ্যুৎ নেই, পরীক্ষা–নিরীক্ষা বন্ধ। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে রোগ নির্ণয় কক্ষ ও ওষুধ বিতরণ কক্ষের সামনে অপেক্ষায় রোগী ও তাদের স্বজনেরা। রোববার দুপুরে পাবনার বেড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে

ডায়রিয়ায় আক্রান্ত ৭০ বছরের আমজাদ হোসেনের স্ত্রী আলেয়া খাতুন বলেন, রাতে কয়েকবার বিদ্যুৎ যাওয়ায় স্বামী কষ্ট পেয়েছেন, তিনিও ঠিকমতো ঘুমাতে পারেননি।

রংপুরের তারাগঞ্জের হাসপাতালে গত শনিবার সকাল সাড়ে সাতটা থেকে পরবর্তী ১২ ঘণ্টায় পাঁচ দফায় মোট ৪ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট বিদ্যুৎ ছিল না। গত শনিবার তারাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে কথা হয় শ্বাসকষ্টের রোগী শামীমা বেগমের সঙ্গে। তিনি জানান, হাসপাতালে তিন দিন ধরে ভর্তি। বিদ্যুৎ চলে গেলে তাঁর শ্বাসকষ্ট আরও বেড়ে যায়। নেবুলাইজার চালানো যায় না। তাই হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতে হয়। বিদ্যুৎ চলে গেলে দেড়–দুই ঘণ্টা পর্যন্ত আসে না।

দীর্ঘ সময় লোডশেডিং

মৌলভীবাজারের কুলাউড়া ও জুড়ী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগী ও স্বজনেরা জানান, দিন-রাতে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। গত শনিবার কুলাউড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে কথা হয় রোগীর স্বজন পপি রানীর সঙ্গে। তিনি জানান, নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত দুই বছরের সন্তানকে নিয়ে চার দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি। রাতে বিদ্যুৎ গেলে মোমবাতি জ্বালাতে হয়।

লক্ষ্মীপুরের ছয় উপজেলায় দুই-তিন মাস ধরে লোডশেডিং বেড়েছে। লক্ষ্মীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক শফিউল আলম বলেন, চাহিদার তুলনায় প্রায় ৩০–৩৫ শতাংশ কম বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে।

পাবনার বেড়ায় পল্লী বিদ্যুতের হিসাবে দিনে প্রায় ৯ মেগাওয়াট ও রাতে ১২–১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে। এর বিপরীতে দিনে ২৫–৩০ শতাংশ, রাতে ৩৫–৪০ শতাংশ ঘাটতি থাকছে বলে জানিয়েছেন পাবনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর বেড়া জোনাল কার্যালয়ের ডিজিএম উত্তম কুমার সাহা।

গ্যাস–সংকটে কমছে বিদ্যুৎ উৎপাদন

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও বিদ্যুৎ সঞ্চালন কোম্পানি পাওয়ার গ্রিড পিএলসির (পিজিসিবি) তথ্য বলছে, জ্বালানির অভাবে চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। ফলে সাপ্তাহিক ছুটির মধ্যেও লোডশেডিং কমছে না। গত শনিবার সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছে বেলা তিনটায়, ৩ হাজার ৬১২ মেগাওয়াট। আগের দিন শুক্রবার সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল রাত ১২টায় ৩ হাজার ২৪৪ মেগাওয়াট।

দেশের সবচেয়ে বড় বিতরণ সংস্থা পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) বলছে, শুক্রবার তাদের সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছে ২ হাজার ৬৭৩ মেগাওয়াট। ওই সময় ময়মনসিংহ অঞ্চলে বিদ্যুৎ ঘাটতি ছিল ৪৬ শতাংশ।

[সরেজমিন তথ্য সংগ্রহ করেছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, খুলনা এবং প্রতিনিধি, খাগড়াছড়ি, নীলফামারী, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, পটিয়া, চট্টগ্রাম, বেড়া, পাবনা, মতলব দক্ষিণ, চাঁদপুর, বাগমারা, রাজশাহী, তারাগঞ্জ, রংপুর, জুড়ী, মৌলভীবাজার ও সখীপুর।]