
নওগাঁর রানীনগরে গণ–অভ্যুত্থানের পর বরখাস্ত হওয়া আবাদপুকুর কলেজের অধ্যক্ষ ও রানীনগর উপজেলা আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সহসভাপতি জি এম মাসুদ রানা জুয়েলের ওপর হামলা হয়েছে। আদালতের রায়ে কলেজে যোগদান করতে গেলে আজ রোববার দুপুর ১২টার দিকে প্রতিষ্ঠানটির প্রাঙ্গণে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় তাঁর মোটরসাইকেল ভাঙচুর ও আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, অধ্যক্ষ জি এম মাসুদ রানা আজ বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কলেজে আসেন। কলেজে প্রবেশ করার সময় কিছু লোক তাঁকে কলেজে প্রবেশে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন। লোকজনের বাধা উপেক্ষা করে অধ্যক্ষ মাসুদ রানা তাঁর কক্ষে প্রবেশ করেন। দুপুর ১২টার দিকে ৩০–৪০ জন লোক অধ্যক্ষের কক্ষে প্রবেশ করে তাঁকে গালাগাল করেন। এরপর তাঁকে টেনেহিঁচড়ে কক্ষ থেকে বের করে মারধর করা হয়। একপর্যায়ে অধ্যক্ষ মাসুদ রানা অজ্ঞান হয়ে পড়েন। খবর পেয়ে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং মাসুদ রানাকে উদ্ধার করে নওগাঁ জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যায়।
নওগাঁ জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা আবু জার গাফফার বলেন, অধ্যক্ষ জিএম মাসুদ রানার দুপুর ১টার দিকে হাসপাতালে আনা হয়। তাঁর দুই পা ও এক হাতের হাড়ে ফ্রাক্চার (চিড়) আছে। প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর তিনি অর্থোপেডিক ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অধ্যক্ষ মাসুদ রানা প্রথম আলোকে বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কিছু লোক আমার বিরুদ্ধে নানা মিথ্যা অভিযোগ তুলে আমাকে লাঞ্ছিত করে কলেজ থেকে বের করে দেয়। পরবর্তী সময়ে কলেজের ব্যবস্থাপনা কমিটি আমাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করে। এই বরখাস্ত আদেশের বিরুদ্ধে আমি হাইকোর্টে রিট পিটিশন করি এবং পরবর্তী সময়ে শুনানি করে হাইকোর্ট আমাকে কলেজে যোগদান করার জন্য নির্দেশ দেন।’
অধ্যক্ষ মাসুদ রানা অভিযোগ করেন, ‘আজ বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কলেজে যোগদান করতে যাই। কলেজে ঢুকতেই বহিরাগত কিছু লোক কলেজ ক্যাম্পাসে ঢুকে আমাকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করে। তারা আমাকে কলেজ থেকে বের হয়ে যেতে বলে। এরপরও সেই বাধা উপেক্ষা করে আমি আমার কক্ষে প্রবেশ করি। ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সালাহউদ্দিনের কাছ থেকে দায়িত্ব বুঝিয়ে নেওয়ার সময় বহিরাগত ৩০-৪০ লোক কক্ষে প্রবেশ করে আমার ওপর হামলা চালায়। তারা আমাকে কক্ষ থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করে আমাকে লাঠি ও রড দিয়ে মারতে শুরু করে। একপর্যায়ে আমি অজ্ঞান হয়ে পড়লে আমাকে কলেজ মাঠে ফেলে রেখে চলে যায়। এ ঘটনায় আমি মামলা করব।’
প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অধ্যক্ষ জি এম মাসুদ রানা আবাদপুকুর কলেজে চাকরি দেওয়ার নাম করে অনেকের কাছ থেকে টাকা নিয়ে চাকরি দেননি বলে অভিযোগ আছে। এ ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে কলেজ তহবিলের টাকা আত্মসাতেরও অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ২০২৪ সালের ১৮ নভেম্বর কলেজের ব্যবস্থাপনা কমিটি তাঁকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করে।
এ বিষয়ে কলেজের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও রানীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাকিবুল হাসান বলেন, ‘অধ্যক্ষের ওপর হামলার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে থানার ওসির সঙ্গে কথা বলেছি। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে অধ্যক্ষকে উদ্ধারের পর হাসপাতালে ভর্তি করেছে।’
ইউএনও রাকিবুল হাসান আরও বলেন, ‘আমি যতটুকু জানি, অধ্যক্ষ রাকিবুল হাসান আবাদপুকুর কলেজে ডিগ্রি সেকশন খোলার নাম করে বেশ কিছু লোকজনকে কলেজে চাকরি দেওয়ার নাম করে টাকা নিয়েছিলেন। ওই সমস্ত পাওনাদাররা এর আগে একাধিকবার আমার কাছে অভিযোগও করেছিলেন। চাকরিবঞ্চিত ওই ব্যক্তিরাই বিক্ষুব্ধ হয়ে তাঁকে মারধর করে থাকতে পারে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
রানীনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাকারিয়া মণ্ডল বলেন, অধ্যক্ষকে মারধর ও মোটরসাইকেলে আগুন দেওয়ার ঘটনায় এখন পর্যন্ত থানায় কোনো অভিযোগ দেওয়া হয়নি। লিখিত অভিযোগ পেলে দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।