
চট্টগ্রামে সংসদীয় আসন রয়েছে ১৬টি। এর মধ্যে বেসরকারি ফলে ৯টিতে জয়লাভ করেছেন বিএনপির প্রার্থীরা। আরও তিনটি সংসদীয় আসনে বিএনপির প্রার্থীরা এগিয়ে রয়েছেন। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা জিতেছেন দুটি সংসদীয় আসনে। বাকি দুটি আসনে বিএনপির প্রার্থীর ফলাফল আদালতের নির্দেশনায় স্থগিত রয়েছে।
২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এবার এমন ভালো ফল করল বিএনপি। ওই নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ১৫ আসনের মধ্যে ১৩টি আসন জিতেছিল (বর্তমানে ১৬টি আসন রয়েছে)।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে সাতটা থেকে ভোট গ্রহণ শুরু হয়। শেষ হয় বিকেল সাড়ে চারটায়। সন্ধ্যার পর থেকে ফল ঘোষণা করতে শুরু করেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা। রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কার্যালয়ের ঘোষিত ফল অনুযায়ী, চট্টগ্রাম নগরের চারটি আসনের দুটিতে জয়লাভ করেছেন এবং বাকি দুটিতে এগিয়ে আছেন ধানের শীষের প্রার্থীরা।
চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি-বাকলিয়া) আসনে বেসরকারি ফলে জয়লাভ করেছেন বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি ভোট পেয়েছেন ১ লাখ ৯ হাজার ৩৮৮। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর এ কে এম ফজলুল হক পেয়েছেন ৫৩ হাজার ৮০৭ ভোট।
বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত পৌনে তিনটায় নগরের চট্টগ্রাম জেলা স্টেডিয়ামের প্রাথমিক ফলাফল সংগ্রহ ও পরিবেশন কেন্দ্রে এই ফল ঘোষণা করেন বিভাগীয় কমিশনার মো. জিয়াউদ্দীন। চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি-বাকলিয়া) আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ১৬ হাজার ৩৬৩ জন। মোট প্রার্থী ১০ জন। কেন্দ্র রয়েছে ১২১টি।
চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা) আসনে জয়লাভ করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি ১৪৪ কেন্দ্রে পেয়েছেন ১ লাখ ১৫ হাজার ৯৯৯ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ শফিউল আলম পেয়েছেন ৭৬ হাজার ৬৮১ ভোট।
চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও) আসনে এগিয়ে আছেন নগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহ। চট্টগ্রাম-১০ আসনে এগিয়ে আছেন সাঈদ আল নোমান এবং চট্টগ্রাম-৫ আসনে মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন।
নগরের বাইরে চট্টগ্রাম জেলায় ১২টি আসন রয়েছে। এর মধ্যে ৭টিতে জিতেছেন বিএনপির প্রার্থীরা। একটিতে এগিয়ে আছেন। দুটি স্থগিত আছে। জামায়াতে ইসলামী জিতেছে দুটিতে।
চট্টগ্রাম-১ (মিরসরাই) আসনে বিএনপির প্রার্থী নুরুল আমিন ১ লাখ ২৮ হাজার ৭৯৯ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ ছাইফুর রহমান পেয়েছেন ৮৪ হাজার ৫৩৮ ভোট।
চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ) আসনে বেসরকারি ফলে বিএনপির মোস্তফা কামাল পাশাকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছে। তিনি ধানের শীষ প্রতীকে ৭২ হাজার ৩৫৩ ভোট পেয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের প্রার্থী মুহাম্মদ আলা উদ্দীন দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ৩৭ হাজার ১৫৭ ভোট পেয়েছেন। এই আসনে পোস্টাল ভোট পড়েছে ৪ হাজার ৭৮৪টি। দাঁড়িপাল্লা ২ হাজার ৫০৫ ভোট এবং ধানের শীষ ৬৮৪ ভোট পেয়েছে। আসনটিতে মোট ভোটার ২ লাখ ৬০ হাজার ৪৮৫ জন।
চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনে বিএনপির গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী ১ লাখ ১২ হাজার ২৩৭ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামী ফ্রন্টের মোহাম্মদ ইলিয়াছ নূরী পেয়েছেন ২৭ হাজার ১৪৬ ভোট।
চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসনে বিএনপির হুমাম কাদের চৌধুরী পেয়েছেন ১ লাখ ১ হাজার ৪৪৫ ভোট। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী জামায়াতে ইসলামীর এ টি এম রেজাউল করিম পেয়েছেন ৪১ হাজার ৭১৯ ভোট।
চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনের বেসরকারি ফলে বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ এনামুল হককে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছে। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৩৪ হাজার ৮০ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বৃহত্তর সুন্নি জোটের বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের প্রার্থী ছৈয়দ এয়ার মোহাম্মদ পেয়ারু পেয়েছেন ২৮ হাজার ৭৭৭ ভোট। এ ছাড়া ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ ফরিদুল আলম পেয়েছেন ২০ হাজার ৯৪২ ভোট। বৃহস্পতিবার রাত ১টায় আসনের সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ফারহানুর রহমান এই ফলাফল ঘোষণা করেন।
চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনের বেসরকারি ফলে বিএনপির প্রার্থী সরওয়ার জামাল নিজামকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছে। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ২৫ হাজার ৪৬০ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বৃহত্তর সুন্নি জোটের বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের প্রার্থী এস এম শাহজাহান পেয়েছেন ৫৪ হাজার ৬২৭ ভোট। এ ছাড়া ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মাহমুদুল হাসান চৌধুরী পেয়েছেন ৩৪ হাজার ৩৫ ভোট। গতকাল রাত সাড়ে ১১টায় চট্টগ্রাম-১৩ আসনের সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা তাহমিনা আক্তার ও সজীব কান্তি রুদ্র এই ফলাফল ঘোষণা করেন।
হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ-সাতকানিয়া আংশিক) আসনে জয়লাভ করেন বিএনপি প্রার্থী জসীম উদ্দীন আহমেদ। প্রাথমিক ফলাফলে তিনি ৭৬ হাজার ৪৯৩ ভোট পেয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির ওমর ফারুক। তিনি পেয়েছেন ৭৫ হাজার ৪৭৭ ভোট।
চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনের বেসরকারি ফলে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরীকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছে। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৭২ হাজার ৬১ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী নাজমুল মোস্তফা আমিন পেয়েছেন ১ লাখ ২৭ হাজার ২৫ ভোট। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলনের শরীফুল আলম চৌধুরী ২৮৭৩ ভোট পেয়েছেন। গতকাল রাত সাড়ে ১১টায় চট্টগ্রাম-১৩ আসনের সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম ও খোন্দকার মাহমুদুল হাসান এই ফলাফল ঘোষণা করেন।
চট্টগ্রাম-১৫ আসনটিতে মোট ভোটার ৫ লাখ ৬ হাজার ৫৯। ২০টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা নিয়ে বিস্তৃত এই আসনে ভোটকেন্দ্র রয়েছে ১৫৭টি। এর মধ্যে সাতকানিয়ায় ৯০টি ও লোহাগাড়ায় ৬৭টি ভোটকেন্দ্র রয়েছে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসনের প্রার্থী মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম ৯৩ হাজার ১৬৭ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পেয়েছেন ৮৩ হাজার ১০৫ ভোট।এ আসনে বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ লেয়াকত আলী পেয়েছেন ৫৫ হাজার ৪৯২ ভোট।
আদালতের নির্দেশে চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) ও চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনে বিএনপির প্রার্থীদের ফলাফল প্রকাশ স্থগিত রয়েছে। চট্টগ্রাম-৪ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বহালের হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে করা লিভ টু আপিল (আপিল করার অনুমতি চেয়ে আবেদন) মঞ্জুর করেছেন আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের আপিল বিভাগ ৩ ফেব্রুয়ারি এ আদেশ দেন।
হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে জামায়াতের প্রার্থী মো. আনোয়ার সিদ্দিকী ও যমুনা ব্যাংক পৃথক লিভ টু আপিল ও আবেদন করে। লিভ মঞ্জুর হওয়ায় এখন আপিলের ওপর শুনানি হবে। আদেশের পর আনোয়ার সিদ্দিকীর জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ হোসেন প্রথম আলোকে জানিয়েছিলেন, ‘আপিল বিভাগ লিভ মঞ্জুর করেছেন। আদালত বলেছেন, আসলাম চৌধুরী নির্বাচন করতে পারবেন; কিন্তু ফলাফলটা আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্থগিত থাকবে, ফলাফল প্রকাশ করা হবে না।’
এর আগে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তা ৩ জানুয়ারি আসলাম চৌধুরীর মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে বৈধ ঘোষণা করেছিলেন। তবে তাঁর বিরুদ্ধে ঋণখেলাপির অভিযোগে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) আপিল দায়ের করা হয়েছিল। জামায়াতের প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকী অভিযোগটি করেছিলেন। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকও পৃথক আপিল করে।
চট্টগ্রাম-২ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী সারোয়ার আলমগীরের প্রার্থিতা ফিরিয়ে দিতে হাইকোর্টের দেওয়া আদেশের বিরুদ্ধে জামায়াতের প্রার্থীর করা লিভ টু আপিল (আপিল করার অনুমতি চেয়ে আবেদন) মঞ্জুর করেছেন আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ ৩ ফেব্রুয়ারি এ আদেশ দেন।
আদেশের পর সারোয়ার আলমগীরের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আহসানুল করিম প্রথম আলোকে বলেন, লিভ (আপিল করার অনুমতি) দিয়েছেন আপিল বিভাগ। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন সারোয়ার আলমগীর। লিভ মঞ্জুর হওয়ায় আপিলের ওপর শুনানি হবে। এই আপিলের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ফলাফলের গেজেট প্রকাশ করা যাবে না। হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিলটি করেছিলেন চট্টগ্রাম-২ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মুহাম্মদ নুরুল আমিন।