
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে একটি ফার্নেস অয়েল তৈরির কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণে দগ্ধ দুই শ্রমিক ঘটনার চার দিন পর মারা গেছেন। ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁদের মৃত্যু হয়। গোয়ালন্দ উপজেলা প্রশাসন ও গোয়ালন্দ ঘাট থানা–পুলিশ বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
ওই দুজন হলেন গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার মোল্লাপাড়া গ্রামের সোহেল রানা (২৪) ও মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার বিনন্দাপুর গ্রামের শাওন মুন্ডা (১৬)।
চিকিৎসক ও স্বজনদের সূত্রে জানা গেছে, সোহেল রানার শরীরের প্রায় ৬০ শতাংশ এবং শাওন মুন্ডার প্রায় ৭০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছিল। সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল সোমবার রাতে তাঁদের মরদেহ নিজ নিজ বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গোয়ালন্দ উপজেলার উজানচর ইউনিয়নের বিশ্বনাথপাড়ায় অবস্থিত ‘ঢাকা পাইরোলাইসিস কোম্পানি’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে ফার্নেস অয়েল, ব্ল্যাক কার্বন ও স্টিলের তার উৎপাদন করা হয়। গত বৃহস্পতিবার সকালে কারখানার শ্রমিকেরা বয়লারে পুরোনো টায়ার পোড়ানোর কাজ করছিলেন। সকাল ১০টার দিকে বয়লার বিস্ফোরিত হলে দুই শ্রমিক দগ্ধ হন। পরে কারখানার শ্রমিক ও স্থানীয় লোকজন তাঁদের উদ্ধার করে প্রথমে গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে পাঠান।
চিকিৎসক ও স্বজনদের সূত্রে জানা গেছে, সোহেল রানার শরীরের প্রায় ৬০ শতাংশ এবং শাওন মুন্ডার প্রায় ৭০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছিল। সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল সোমবার রাতে তাঁদের মরদেহ নিজ নিজ বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।
প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী বাহাউদ্দীন বাহারের দাবি, দগ্ধ দুই শ্রমিককে বাঁচাতে তাঁরা সর্বোচ্চমানের চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা করেন। তারপরও শ্রমিকদের বাঁচানো গেল না। তিনি দাবি করেন, কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণ ঘটেনি, বয়লারের ভেতরের অতিরিক্ত গরম গ্যাস বের হয়ে দুই শ্রমিক দগ্ধ হন। শ্রমিকদের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়েছে। নিজেদের অসাবধানতার জন্য দুই শ্রমিক আহত হন। কোম্পানির পক্ষ থেকে মৃত দুই শ্রমিকের পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হবে।
গোয়ালন্দ ঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সফিকুল ইসলাম বলেন, গতকাল দুপুরে ঢাকার শাহবাগ থানা থেকে দুই শ্রমিকের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ দাফন করার পর তাঁরা গোয়ালন্দ ঘাট থানায় মামলা করতে আসবেন। মামলা হলে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রায় পাঁচ বছর আগে স্থানীয় প্রভাবশালী আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) কয়েকজন নেতার সহায়তায় পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন নিয়ে জনবহুল এলাকায় কারখানাটি স্থাপন করা হয়। কারখানার লাইসেন্সের মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হলেও তা নবায়ন করা হয়নি। এ ছাড়া পুরোনো টায়ার পোড়ানোর কারণে দীর্ঘদিন ধরে এলাকার পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছিল। কালো ধোঁয়া ও দুর্গন্ধে স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছিল এবং বাড়িঘর, গাছপালা ও কৃষিজমির ক্ষতি হচ্ছিল। এলাকাবাসী একাধিকবার অভিযোগ করলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে তাঁদের অভিযোগ।
কারখানাটির বিরুদ্ধে পরিবেশদূষণসহ বিভিন্ন শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ আছে জানিয়ে গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাথী দাস বলেন, কারখানার লাইসেন্সের মেয়াদও শেষ হয়েছে বলে জানা গেছে। বিষয়টি নিয়ে কারখানা বন্ধসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।