প্রতিযোগিতায় তির নিক্ষেপ করছে নারী তিরন্দাজদের একটি দল। বিরামপুর, দিনাজপুর। ৪ অক্টোবর ২০২৬
প্রতিযোগিতায় তির নিক্ষেপ করছে নারী তিরন্দাজদের একটি দল। বিরামপুর, দিনাজপুর। ৪ অক্টোবর ২০২৬

বিরামপুরে নারী তিরন্দাজদের তির-ধনুকের দক্ষতায় মুগ্ধ দর্শকেরা

সবুজে ঘেরা গ্রামে বিশাল খেলার মাঠ। সেই মাঠে কিশোরী থেকে মাঝবয়সী নারীরা। এক হাতে বাঁকা ধনুক আর আরেক হাতে সুচালো তির। দৃষ্টিসীমার ৫০ ফুট দূরে পুঁতে রাখা কলাগাছে। বাঁকানো ধনুক থেকে তির ছুড়তেই বিদ্যুৎ–গতিতে গিয়ে বিঁধছে কলাগাছে। আর এই দৃশ্য দেখে শত শত নারী–পুরুষ ও শিশু–কিশোরের করতালি ও হর্ষধ্বনিতে মুখর গোটা মাঠ।

ব্রিটিশবিরোধী সাঁওতাল বিদ্রোহ, আত্মরক্ষার সামাজিক কৌশল আর বন্য প্রাণী শিকারে হাতের তৈরি দেশীয় অস্ত্র হিসেবে তির-ধনুক ব্যবহারের ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার ধানজুড়ি কবরস্থান মাঠে আজ রোববার দিনব্যাপী হয়ে গেল তির-ধনুক প্রতিযোগিতা। ধানজুড়ি আদিবাসী স্পোর্টিং ক্লাব এ প্রতিযোগিতার আয়োজন করে।

সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত এ প্রতিযোগিতায় ধানজুড়ি মিশন এলাকার মানজি পরিষদের আওতায় ১২টি দল অংশ নেয়। প্রতিটি দলে ৫ জন করে মোট ৬০ জন তিরন্দাজ অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে ১৫ জন নারী তিরন্দাজের তির নিক্ষেপ ছিল প্রতিযোগিতার বিশেষ আকর্ষণ।

প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া নারী তিরন্দাজদের অধিকাংশই গৃহিণী ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী। প্রতিযোগীদের কেউ সেজেছেন রঙিন শাড়িতে। আবার কেউ কেউ খোঁপায় গুঁজেছেন রঙিন ফুল। মঞ্চের মাইকের ঘোষণায় মাঠের মাঝখানে চলছে প্রতিযোগীদের হাতে তির-ধনুকের ক্যারিশমা। নারী তিরন্দাজের হাতে থাকা ধনুক থেকে তিন লক্ষ্যভেদ করা মাত্রই মাঠের চারপাশ মুখর হয় দর্শকদের হর্ষধ্বনি আর করতালিতে। আর সে সময় নির্দিষ্ট সীমানার বাইরে তির-ধনুক হাতে অপেক্ষমাণ প্রতিযোগী তিরন্দাজদের চোখেমুখে প্রতিপক্ষ দলকে পরাস্ত করার দৃঢ় সংকল্প।

তির নিক্ষেপ করছেন এক তিরন্দাজ

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পল্লির ওই মাঠে তির-ধনুকের এ খেলা দেখতে আসা দর্শকের সংখ্যা ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রতিযোগিতায় পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের অংশগ্রহণ থাকায় প্রতিযোগী ও দর্শকদের মধ্যে ছিল বাড়তি কৌতূহল।

তিরন্দাজ শান্তনি মুরমু প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি একজন মা হিসেবে তির-ধনুক খেলতে এসেছি। এটি আমাদের সামাজিক ঐতিহ্য। আমাদের এ খেলা দেখে যাতে আমাদের মেয়েরা, বাবুরা (ছেলে) খেলা শিখতে পারে, সে জন্য আমরা খেলছি।’ তিনি বলেন, ‘এ প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পাওয়াটা বড় বিষয় নয়, বরং এ খেলা দেখে আমাদের সন্তানেরা নিজেদের আত্মরক্ষার জন্য তির-ধনুকের ব্যবহার শিখতে অনুপ্রাণিত হবে।’

তির–ধনুক প্রতিযোগিতা উপভোগ করছেন নারী দর্শকেরা

প্রতিযোগিতার আয়োজক কমিটির সমন্বয়ক রঞ্জিত হেম্ব্রম প্রথম আলোকে বলেন, তির-ধনুক হচ্ছে সাঁওতাল সম্প্রদায়ের একটি ঐতিহ্য। সাঁওতাল পরিবারের যুবকেরা প্রতিবছর একবার করে হলেও তির-ধনুক নিয়ে শিকারে বের হন। এই অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে, এই ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে যেন সব সময় তুলে ধরতে পারি।

প্রতিযোগিতায় জবই দল চ্যাম্পিয়ন ও ডিএলসি দল রানারআপ হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ধানজুড়ি মিশনের পালপুরোহিত ফাদার মানুয়েল হেম্ব্রম।