চার স্বজনকে হারিয়ে বিলাপ করছিলেন রহিমা বেগম (৭০)। গতকাল শুক্রবার রাতে জামালপুর সদর উপজেলার রানাগাছা ইউনিয়নের দড়িহামিদপুর ভাটিপাড়া গ্রামে
চার স্বজনকে হারিয়ে বিলাপ করছিলেন রহিমা বেগম (৭০)। গতকাল শুক্রবার রাতে জামালপুর সদর উপজেলার রানাগাছা ইউনিয়নের দড়িহামিদপুর ভাটিপাড়া গ্রামে

ময়মনসিংহে দুর্ঘটনা

‘আমার জামাই, নাতিন আর পুতিও মইরা গেছে, সব হারাইছি’

‘আল্লাহ, আমার পুড়ি (মেয়ে) কী করে খাবো, আমি কী করে খাওয়াবো? আমার জামাই মইরা গেছে। আমার নাতিন আর পুতিও মইরা গেছে। সব হারাইছি। আমার সব শেষ গো, আল্লাহ গো।’

জামাতা, বেয়াইন, নাতনি ও নাতনির ছেলেকে হারিয়ে বিলাপের সুরে কথাগুলো বলছিলেন রহিমা বেগম (৭০)। গতকাল শুক্রবার সকালে তাঁদের সবাইকে বিদায় দিয়েছেন। অথচ এর কিছুক্ষণ পরই পান সড়ক দুর্ঘটনায় সবার মৃত্যুর খবর। তখন থেকেই স্বজনেরা তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু কোনোভাবেই থামছিল না এই বৃদ্ধার কান্না।

গতকাল শুক্রবার দুপুরে ময়মনসিংহ নগরের রহমতপুর বাইপাস সড়কের দাপুনিয়া হাড়গুজির পাড় এলাকায় রাজীব পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে অটোরিকশার চালকসহ সাতজন নিহত হন। তাঁদের মধ্যে ছয়জনই জামালপুরের বাসিন্দা।

ওই ছয়জনের মধ্যে একই পরিবারের চারজন। তাঁরা হলেন জামালপুর সদর উপজেলার দড়িহামিদপুর ভাটিপাড়া গ্রামের মোফাজ্জল হোসেন (৫৫), তাঁর মা রাশিদা বেগম (৮৫), মেয়ে মর্জিনা (২৫) ও মর্জিনার পাঁচ বছর বয়সী ছেলে মিনাল। নিহত অপর দুজন হলেন একই ইউনিয়নের বীর গোবিন্দবাড়ী গ্রামের সুজন আলী (৩৪) ও নান্দিনা বাদেচান্দি গ্রামের আকরাম আলী (৪৮)। নিহত অপর নারী ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাসিন্দা।

স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে বাড়ির পরিবেশ

গতকাল সন্ধ্যায় দড়িহামিদপুর ভাটিপাড়া গ্রামে মোফাজ্জল হোসেনের বাড়িতে চলে মাতম। স্বজন হারানোর খবর পেয়ে আশপাশের গ্রামের মানুষও সেখানে আসেন।
পেশায় রাজমিস্ত্রি মোফাজ্জল হোসেন স্ত্রী ও এক ছেলেকে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গাজীপুরের হোতাপাড়া এলাকায় থাকতেন। মা রাশিদা বেগম ও বিবাহিত মেয়ে মর্জিনাকে নিজের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য আগের দিন বাড়িতে এসেছিলেন মোফাজ্জল।

পরিবারের সদস্যরা বলেন, গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মা রাশিদা বেগম, দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা মেয়ে মর্জিনা ও নাতি মিনালকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হন মোফাজ্জল। নান্দিনা থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ময়মনসিংহ যাওয়ার কথা ছিল তাঁদের। সেখান থেকে বাসে করে গাজীপুরে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই ময়মনসিংহে বাসের চাপায় অটোরিকশাটি দুমড়েমুচড়ে যায়। এতে তাঁরা নিহত হন।

রাজীব পরিবহনের বাসের কারণে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে। সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, একই পরিবারের চারজন মারা গেছেন। তাঁদের মধ্যে মর্জিনা অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। তিনি এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চান।
সোহেল রানা, প্রতিবেশী

মোফাজ্জলের ভাবি ইসমতারা বলেন, ‘আমার দেবর গাজীপুরে থেকে রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। গতকাল বাড়িতে এসেছিলেন আমার শাশুড়ি, ভাতিজি ও নাতিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আমার ভাতিজি দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিল। একসঙ্গে সবাইকে হারিয়ে আমরা নিঃস্ব হয়ে গেছি।’

বাড়ির উঠানে বসে মোফাজ্জলের স্মৃতিচারণা করছিলেন তাঁর শাশুড়ি রহিমা বেগম। তিনি বলেন, ‘আমার যা লাগত, সবই জামাই দিত। আমারে সবাই আদর করত। আমার জামাইয়ের চেয়ে নাতিরা আবার বেশি আদর করত। এহন সব শেষ হয়ে গেল।’ কথা বলতে বলতে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন রহিমা। আশপাশের নারীরা তাঁকে ধরে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন।

প্রতিবেশী সোহেল রানা অভিযোগ করে বলেন, রাজীব পরিবহনের বাসের কারণে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে। সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, একই পরিবারের চারজন মারা গেছেন। তাঁদের মধ্যে মর্জিনা অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। তিনি এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চান।