নিজের গোলাপবাগানে কাজ করছেন ময়মনসিংহের তরুণ উদ্যোক্তা শামীম মিয়া। সম্প্রতি ময়মনসিংহ সদর উপজেলার দড়ি কুষ্টিয়া গ্রামে
নিজের গোলাপবাগানে কাজ করছেন ময়মনসিংহের তরুণ উদ্যোক্তা শামীম মিয়া। সম্প্রতি ময়মনসিংহ সদর উপজেলার দড়ি কুষ্টিয়া গ্রামে

সবজি বিক্রির জমানো টাকায় কলেজছাত্রের স্বপ্নের গোলাপবাগান

ময়মনসিংহের দড়ি কুষ্টিয়া গ্রামের বাতাসে এখন শুধুই গোলাপের সুবাস। সবুজের বুক চিরে উঁকি দিচ্ছে হোয়াইট অ্যাভাল্যান্স, টপ সিক্রেট, সোলারিয়া আর জুমেলিয়ার মতো হরেক জাতের গোলাপ। সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে দেশি গোলাপের নানা রূপ। কোনোটা গোলাপি, কোনোটা ডার্ক মেরুন, কমলা, আবার কোনোটা গাঢ় গোলাপি। বাদ যায়নি চায়না গোলাপও। চারপাশের সবুজের মাঝে এই রঙের মেলা পুরো এলাকাকে মোহনীয় করে তুলেছে।

বর্ণিল এই পুষ্পরাজ্যের রূপকার তরুণ উদ্যোক্তা ও কলেজছাত্র মো. শামীম মিয়া (২৫)। পড়ালেখার পাশাপাশি অন্যের জমি বর্গা নিয়ে সবজি চাষ করে তিনি স্বপ্নের গোলাপবাগান তৈরি করেছেন। ইতিমধ্যে বাগান দেখতে ও ফুল কিনতে বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষজন ছুটে আসছেন। এই বাগান দিয়েই নিজের ভাগ্য বদলের স্বপ্ন বুনছেন তিনি।

শামীম ময়মনসিংহ সদর উপজেলার কুষ্টিয়া ইউনিয়নের দড়ি কুষ্টিয়া গ্রামের কৃষক মো. সাহেব আলীর ছেলে। মুক্তাগাছা শহীদ স্মৃতি কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের শেষ বর্ষে পড়ছেন। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই মানুষের জমি বর্গা নিয়ে সবজি চাষ করতেন। সেই সবজি বিক্রির জমানো টাকা দিয়ে তিনি গোলাপবাগান করেছেন। সাত লাখ টাকায় বাড়ির পাশে ১০০ শতক জমি ইজারা নিয়েছেন। এর মধ্যে ৫০ শতক জমিতে গোলাপের বাগান এবং ১৯ শতক জমিতে ড্রাগন ফল, ঘাস ও ভুট্টার চাষ করেছেন।

সম্প্রতি গোলাপবাগানে গিয়ে দেখা গেল, নানা জাতের গোলাপ ফুটে আছে। লাল, হলুদ, সাদা, গোলাপিসহ নানা রঙের ফুলে চোখ জুড়িয়ে যায়। সবুজের মাঝে নানা রঙের গোলাপ এলাকাটি মোহনীয় করে তুলেছে। বাগানটিতে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন জাতের পাঁচ হাজার গাছ রয়েছে।

ময়মনসিংহের তরুণ উদ্যোক্তা শামীমের বাগানে নানা জাতের গোলাপ ফুটেছে। সম্প্রতি তোলা

বাগানে কাজ করতে করতেই শামীম জানালেন তাঁর স্বপ্নের কথা। বললেন, ‘এটা আমার স্বপ্নের বাগান। আমি ছোটবেলা থেকে মানুষের জমি বর্গা নিয়ে কৃষিকাজ করি। আমাদের অঞ্চলে গোলাপবাগান নেই; কিন্তু গোলাপের চাহিদা আছে। সেই চিন্তা থেকেই গোলাপবাগান করার পরিকল্পনা করি। আমার এক কৃষি অফিসার চাচাতো ভাইয়ের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে যশোর ও ভারত থেকে চারা এনে বাগান শুরু করি।’

বর্তমানে এই বাগান থেকে তিন–চার দিন পরপর ৩০০ থেকে ৫০০টি ফুল সংগ্রহ করা হয়। প্রতিটি ফুল বিক্রি হয় ১০ টাকায়। ময়মনসিংহ ও মুক্তাগাছার বিভিন্ন দোকানে ফুল সরবরাহ করার পাশাপাশি অনলাইনেও বিক্রি করেন শামীম। তিনি বলেন, ‘আমার বাগানের নামে একটি ফেসবুক পেজ আছে। সেই পেজে বিভিন্ন জায়গা থেকে অর্ডার এলে ফুল পাঠিয়ে দিই। বিয়ে বা গায়েহলুদের মতো অনুষ্ঠানের জন্য গ্রাহকেরা আমাদের পেজে নক দেন। ইতিমধ্যে ৫০ হাজার টাকার মতো ফুল বিক্রি হয়েছে। আশা করি ভালো কিছু হবে।’

তবে শামীমের স্বপ্ন শুধু ফুল বিক্রিতেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিদিন বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ বাগান দেখতে ও ফুল কিনতে আসেন। শামীম মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, এলাকাটিকে পর্যটনকেন্দ্রের মতো গড়তে বাগানটি করেছেন। প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ আসছেন। ছবি তুলছেন ও ফুল কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। তিনি এই বাগান দিয়ে ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখছেন।

ময়মনসিংহের তরুণ উদ্যোক্তা শামীমের গোলাপবাগান দেখতে এসেছেন দুজন। সম্প্রতি তোলা

শামীমের বাগান এখন এলাকার অন্যতম আকর্ষণ। মুক্তাগাছার মনিরুল ইসলাম বন্ধুদের নিয়ে ঘুরতে এসেছিলেন বাগানে। মনিরুল বলেন, ‘গোলাপবাগানে আসতে খুব ভালো লাগে। তাই বন্ধুদের নিয়ে মাঝেমধ্যে ঘুরতে আসি। এ ধরনের বাগান এ অঞ্চলে কোথাও নেই। বাগানে নানা রঙের ফুল দেখতে পারছি। এখানে আসতে কোনো টিকিটও লাগে না।’

বাগান ঘুরতে এসে একগুচ্ছ ফুল কেনেন আরেক দর্শনার্থী মাহমুদুল হাসান। তিনি বলেন, ‘এমন বাগান আমি কোথাও দেখিনি। ৮ থেকে ৯ রঙের ফুল দেখেছি। ফুল ভালোবাসে না কে? ফুল ঘরে রাখলে ঘরের সৌন্দর্য বাড়ে। কাউকে উপহার দিলে তারাও খুশি হয়।’

শামীমের বাবা সাহেব আলী প্রথম আলোকে বলেন, শুরু থেকে পড়ালেখার পাশাপাশি কৃষিকাজে ইচ্ছা ছিল ছেলের। পরিবারের পক্ষ থেকে যা দেওয়ার দিয়ে যাচ্ছেন। এখন জমি ইজারা নিয়ে ফল ও ফুলের বাগান করেছে। আশা করছেন—এই বাগান দিয়ে ছেলে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে উঠবে।

ময়মনসিংহ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জুবায়রা বেগম (সাথী) প্রথম আলোকে বলেন, ময়মনসিংহে এমন গোলাপবাগান আর নেই। পড়ালেখার পাশাপাশি বাগানটি করেছেন ওই তরুণ। এ অঞ্চলে গোলাপবাগান করা সম্ভব, সেটা তিনি করে দেখিয়েছেন। তাঁরা নিয়মিত বাগানটি তদারকি করছেন। ওই তরুণের সাফল্য দেখে অনেকে বাগান করতে উৎসাহিত হচ্ছেন। তাঁরা তাঁদের পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন।