ঢাকায় ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে মারা যাওয়া প্রধান শিক্ষক রনজিলা পারভিনকে শেষবারের মতো দেখতে এসেছে শিক্ষার্থীরা। আজ রোববার বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে
ঢাকায় ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে মারা যাওয়া প্রধান শিক্ষক রনজিলা পারভিনকে শেষবারের মতো দেখতে এসেছে শিক্ষার্থীরা। আজ রোববার বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে

‘রোববার দেখা হবে’ বলা প্রধান শিক্ষক রনজিলার সঙ্গে দেখা হলো না সহকর্মীদের

বগুড়ার বাগবাড়ি বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে আজ রোববার সকালে অন্য রকম নীরবতা। শিক্ষার্থীরা অপেক্ষা করছিল প্রিয় প্রধান শিক্ষক রনজিলা পারভিনকে শেষবারের মতো একনজর দেখার জন্য। বিদ্যালয়ের মাঠে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এলাকার মানুষের ভিড়।

গত বৃহস্পতিবারও সহকর্মীদের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলেছিলেন রনজিলা পারভিন। বলেছিলেন, ‘শুক্রবার ঢাকায় চিকিৎসক দেখাতে যাচ্ছি। সবাই দোয়া করবেন। রোববার সকালে আবার সবার সঙ্গে দেখা হবে।’ কিন্তু সেই দেখা আর হলো না। সহকর্মীরাও কেউ ধারণা করতে পারেননি, তাঁর সঙ্গে সেটিই হবে শেষ কথা। আজ তিনি বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ফিরেছেন, তবে লাশবাহী গাড়িতে সাদা কাপড়ে মোড়ানো কফিনে।

গতকাল শনিবার সকাল ছয়টার দিকে রাজধানীতে ‎জাতীয় সংসদ ভবনের সামনের সড়কে ছিনতাইকারীদের হেঁচকা টানে রিকশা থেকে পড়ে গিয়ে মারা যান রনজিলা পারভিন। চোখের চিকিৎসক দেখানোর জন্য তিনি স্বামীর সঙ্গে শুক্রবার রাতে বগুড়া থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। ভোরে রাজধানীর কল্যাণপুরে দূরপাল্লার বাস থেকে নামেন দুজন। এরপর রিকশায় করে ফার্মগেট এলাকার ইস্পাহানী ইসলামিয়া চক্ষু ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে যাওয়ার কথা ছিল তাঁদের।

বাগবাড়ি বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৯৮১ সালে। রনজিলা পারভিনের দীর্ঘ কর্মজীবনের প্রায় পুরোটা সময় কেটেছে এই বিদ্যালয়কে ঘিরে। বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মেহনাজ আফরিন বলেন, ‘অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বিদ্যালয়টি এলাকায় এখন অনেক সুনাম অর্জন করেছে। এর পুরো কৃতিত্বই ম্যাডামের।’

বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে শিক্ষক ছয়জন। শিক্ষার্থী ৮৬ জন। বিদ্যালয়ের নানা কাজ, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, শৃঙ্খলা—সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল তাঁর দীর্ঘদিনের শ্রম ও মমতা।

শেষ কথাগুলো এখন কেবল স্মৃতি

বৃহস্পতিবার বিদ্যালয় ছুটির পরের সময়টুকু এখন বারবার মনে পড়ছে সহকর্মীদের। মেহনাজ আফরিন বলেন, ‘ছুটির পর প্রধান শিক্ষক ম্যাডাম আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিলেন। বললেন, চিকিৎসক দেখানোর জন্য শুক্রবার ঢাকায় যাচ্ছি। সবাই দোয়া করবেন। রোববার সকালে সবার সঙ্গে আবার দেখা হবে।’ একটু থেমে তিনি বলেন, ‘কিন্তু সেই দেখা যে শেষ দেখা হবে, সেটা তখন বুঝিনি।’

আরেক সহকারী শিক্ষক রিজনোবা আকতারের কাছেও বৃহস্পতিবারের সেই বিকেলটি এখন দুঃসহ স্মৃতি।

সহকারী শিক্ষক বলেন, ‘বৃহস্পতিবার ছুটির পর প্রধান শিক্ষক ম্যাডামের সঙ্গে বিদ্যালয় থেকে বের হয়েছি। বাগবাড়ি বাজারে পৌঁছানোর পর ম্যাডাম আমাকে সঙ্গে নিয়ে পাকা তাল কিনলেন। এরপর বিদায় নিয়ে বললেন, থাকেন, রোববার বিদ্যালয়ে আবার দেখা হবে।’

প্রধান শিক্ষককে শেষবারের মতো দেখতে এসে অভিভাবক ও গ্রামের নারীরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। আজ রোববার বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে

সেই কথাটিই এখন বারবার মনে পড়ছে রিজনোবা আকতারের। তিনি বলেন, ‘কিন্তু আজ রোববার ম্যাডাম আসছেন লাশবাহী গাড়িতে, সাদা কাপড়ে মোড়ানো কফিনে। এই দৃশ্য মেনে নিতে পারছি না।’

রনজিলার আকস্মিক মৃত্যুতে বগুড়ার রহমাননগরের বাসায় এখন কেবল কান্নার শব্দ। তাঁর একমাত্র মেয়ে তাকিয়া আকতার (রাইসা) নবম শ্রেণিতে পড়ে। এই কিশোরী মায়ের এমন আকস্মিক মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না।

রনজিলার বড় ভাই জাহিদ ইসলাম বলেন, ময়নাতদন্ত শেষে বোনের মরদেহ বগুড়ায় আনা হবে। আজ বাদ জোহর বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে তাঁর জানাজা হবে। এরপর গাবতলী উপজেলার তরফহরতাজ উত্তরপাড়ায় তাঁর স্বামীর বাড়ির পারিবারিক গোরস্তানে দাফন করা হবে তাঁকে।

সহকর্মী ও গাবতলীর নিজগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সিদ্দিক মো. আবু বক্কর বলেন, ‘ম্যাডাম খুবই অমায়িক স্বভাবের ছিলেন। তাঁর এ মৃত্যুতে এলাকার শিক্ষক ছাড়াও শিক্ষার্থীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।’