
মোহাম্মদ টিপু আজ বৃহস্পতিবার সকাল আটটার দিকে মুরাদপুর থেকে নিউমার্কেট যাওয়ার জন্য বের হন। অন্য দিনের মতো ৩ নম্বর রুটের মিনিবাসে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাঁর। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেও কোনো মিনিবাস পাননি। শেষ পর্যন্ত সিএনজিচালিত অটোরিকশা নিয়ে নিউমার্কেটে যেতে হয় তাঁকে। এতে ভাড়া গুনতে হয়েছে ১৮০ টাকা।
টিপু প্রথম আলোকে বলেন, ‘যেখানে ১০ টাকা ভাড়া দিয়ে যেতে পারতাম, সেখানে বাড়তি ১৭০ টাকা খরচ হলো। সীমিত আয়ের মধ্যে এখন এই বাড়তি খরচ দুর্ভোগে ফেলবে।’
চট্টগ্রাম নগরের নিউমার্কেট থেকে মুরাদপুর হয়ে চলাচলকারী ৩ নম্বর রুটের মিনিবাসে ভাড়া বাড়ানোর দাবিতে আজ বৃহস্পতিবার সকাল থেকে যান চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। দুপুর ১২টা পর্যন্ত মুরাদপুর এলাকায় এই রুটের কোনো মিনিবাস চলতে দেখা যায়নি। এতে যাত্রীদের বিকল্প যানে গন্তব্যে যেতে হয়েছে। বাড়তি ভাড়াও গুনতে হয়েছে তাঁদের।
তবে সকালে কিছু মিনিবাস চলাচল করেছে। মাঝপথে সেগুলোও বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এমন পরিস্থিতিতে পড়েন মোহাম্মদ মোশাররফ। তিনি আতুরার ডিপো থেকে ৩ নম্বর রুটের একটি মিনিবাসে ওঠেন। তাঁর গন্তব্য ছিল প্রবর্তক মোড়। কিন্তু বাসটি মুরাদপুরে পৌঁছানোর পর তাঁকে নামিয়ে দেওয়া হয়। ভাড়া সমন্বয় না হলে গাড়ি আর সামনে যাবে না বলে চালক জানান।
মোহাম্মদ মোশাররফ প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্বাভাবিক সময়ে আতুরার ডিপো থেকে প্রবর্তক মোড় পর্যন্ত যেতে ৭ টাকা ভাড়া লাগে। আজ মুরাদপুরে নামিয়ে দেওয়ায় ভেঙে ভেঙে যেতে হয়েছে। সব মিলিয়ে ২০ টাকা ভাড়া লেগেছে।’
চট্টগ্রামে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা গ্যাসসংকটকে কেন্দ্র করে নগরের বিভিন্ন রুটের গণপরিবহনে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। সিএনজি ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে গ্যাস নেওয়া এবং দৈনিক ট্রিপ কমে যাওয়ার কথা বলে চালকেরা যাত্রীদের কাছ থেকে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি টাকা নিচ্ছেন। এ নিয়ে বিভিন্ন রুটে যাত্রী ও পরিবহনশ্রমিকদের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডার ঘটনাও ঘটছে।
পরিবহনমালিকদের দাবি, গ্যাস নিতে একটি গাড়িকে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এতে গাড়ির ট্রিপ কমছে, বাড়ছে পরিচালন ব্যয়। এমন পরিস্থিতিতে গ্যাসচালিত গণপরিবহনের ভাড়া সমন্বয়ের দাবি তুলেছেন পরিবহনমালিক ও শ্রমিকেরা।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহজাহান প্রথম আলোকে বলেন, গ্যাসচালিত হিউম্যান হলারের জন্য দীর্ঘদিন ধরে নতুন কোনো ভাড়ার তালিকা দেওয়া হয়নি। তাঁর জানামতে, ২০১১ সালের পর এই ধরনের গাড়ির ভাড়ার নতুন তালিকা হয়নি। ফলে ৩, ৭, ৮ ও ১০ নম্বর রুটসহ বিভিন্ন রুটে ভাড়া আদায় নিয়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে।
মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, ডিজেলচালিত বাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ৪২ পয়সা নির্ধারিত রয়েছে। কিন্তু গ্যাসচালিত হিউম্যান হলারের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ভাড়ার তালিকা না থাকায় চালক ও সহকারীরা নিজেদের মতো ভাড়া আদায় করছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে যাত্রীদের কাছ থেকে দুই থেকে পাঁচ টাকা বেশি চাওয়া হচ্ছে।
বাড়তি ভাড়া আদায়কে সমর্থন করেন না জানিয়ে মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, ‘ভাড়ার তালিকা না থাকায় বিশৃঙ্খলা হচ্ছে। বিআরটিএর উচিত গ্যাসের দামের সঙ্গে সমন্বয় করে ভাড়া নির্ধারণ করা এবং সেই তালিকা প্রতিটি গাড়িতে দৃশ্যমান রাখা। তাহলে যাত্রী ও পরিবহনশ্রমিকদের মধ্যে বাদানুবাদ হবে না।’
গ্যাসসংকটের কারণে পরিবহন খাতের ব্যয় বেড়েছে বলেও দাবি করেন শাহজাহান। তিনি বলেন, আগে অল্প সময়ের মধ্যে গাড়িতে গ্যাস নেওয়া গেলেও এখন ফিলিং স্টেশনে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এতে চালকদের সময় ও খরচ দুটোই বাড়ছে। গণপরিবহনকে তাই সিএনজি ফিলিং স্টেশনে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
শুধু ভাড়া নয়, প্রশাসনের অভিযানের কারণেও অনেক মালিক গাড়ি বের করেননি বলে দাবি করেন মোহাম্মদ শাহজাহান। তিনি বলেন, বুধবার নগরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালানো হয়েছে। ফিটনেস থাকা গাড়িকেও বিভিন্ন কারণে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা হয়েছে। এত বড় অঙ্কের জরিমানার আশঙ্কায় অনেক মালিক গাড়ি রাস্তায় নামাননি।
মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে গ্যাসের দামের সঙ্গে ভাড়া সমন্বয় করতে হবে। হিউম্যান হলারের জন্য নির্দিষ্ট ভাড়ার তালিকা প্রকাশ ও তা গাড়িতে দৃশ্যমান রাখতে হবে। একই সঙ্গে গণপরিবহনকে গ্যাস সরবরাহে অগ্রাধিকার এবং অভিযানের নামে হয়রানি বন্ধ করতে হবে।
তবে স্থানীয় পর্যায়ে ভাড়া বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। বিআরটিএ চট্টগ্রামের উপপরিচালক মো. সানাউল হক প্রথম আলোকে বলেন, গণপরিবহনের ভাড়া নির্ধারণের জন্য কেন্দ্রীয় কমিটি রয়েছে। গাড়ি চলাচল বন্ধ করে দিলেই স্থানীয় পর্যায় থেকে ভাড়া বাড়ানো বা কমানো যায় না। ভাড়া পরিবর্তনের দাবি থাকলে নিয়মতান্ত্রিকভাবে আবেদন করতে হবে। কেন্দ্রীয় কমিটি তা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে। নতুন ভাড়া নির্ধারণ করা হলে সে অনুযায়ী গেজেট প্রকাশ করতে হবে।
৩ নম্বর রুটের মিনিবাস চলাচল বন্ধ থাকার বিষয়টি আগে জানতেন না বলেও জানান সানাউল হক। তিনি বলেন, বিআরটিএর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা নগরের বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছেন। তবে ৩ নম্বর রুটে গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে তাঁর কথা হয়নি।