সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার চামরদানী ইউনিয়নের দক্ষিণ আমজোড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। শুক্রবার তোলা
সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার চামরদানী ইউনিয়নের দক্ষিণ আমজোড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। শুক্রবার তোলা

এক শিক্ষক দিয়ে চলছে স্কুল, এক ক্লাসের সময় অপেক্ষায় অন্য ক্লাস

বিদ্যালয়ে শ্রেণি আছে ছয়টি। শিক্ষার্থী মোট ৫০ জন। কিন্তু পুরো বিদ্যালয়ে শিক্ষক মাত্র একজন। এক শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পড়াতে গেলে বাকি শ্রেণির শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের অপেক্ষায় থাকে। এক মাস ধরে এভাবেই চলছে সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার দক্ষিণ আমজোড়া নুরুন্নাহার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠদান।

বিদ্যালয়টিতে তিন বছর ধরে চলছে শিক্ষকসংকট। ২০২৩ সালের এপ্রিলের পর থেকে কাগজে–কলমে মাত্র একজন শিক্ষক পদায়ন রয়েছে। বর্তমানে বিদ্যালয়ের নিজস্ব কোনো শিক্ষক কর্মরত নেই। এমন অবস্থায় অন্য বিদ্যালয়ের দুজন সহকারী শিক্ষককে এই বিদ্যালয়ে পাঠদানের জন্য সংযুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু তাঁদের একজন যোগ দেননি। প্রায় এক মাস ধরে (১ জুলাই থেকে) কার্যত একজন শিক্ষককে দিয়েই চলছে বিদ্যালয়টির পাঠদান।

দক্ষিণ আমজোড়া গ্রামটি মধ্যনগর উপজেলার হাওর–অধ্যুষিত চামরদানী ইউনিয়নে। এই বিদ্যালয়ের মতো উপজেলায় আরও চারটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক কাগজপত্রে একজন করে। পাঠদান সামলাতে পাশের বিদ্যালয়ের একজন করে শিক্ষক সংযুক্ত রয়েছেন এসব বিদ্যালয়ে। মাত্র দুজন করে শিক্ষক আছেন আরও সাত বিদ্যালয়ে। সব মিলিয়ে মধ্যনগর উপজেলায় শতাধিক শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীরা। 

বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সাল পর্যন্ত বিদ্যালয়টিতে দুজন সহকারী শিক্ষক ছিলেন। তাঁরা হলেন আবদুল হান্নান ও পারভীন আক্তার। ওই বছরের ৮ মার্চ সহকারী শিক্ষক জান্নাতুল ফেরদৌস ও হারুন অর রশিদ বিদ্যালয়ে যোগ দেন।

শিক্ষক যায়, শিক্ষক আসে, সংকট কাটে না

উপজেলা সদরের মধ্যনগর বাজার থেকে দক্ষিণ আমজোড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দূরত্ব প্রায় ১২ কিলোমিটার। বর্ষাকালে সেখানে পৌঁছাতে নৌকাই একমাত্র ভরসা। ১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টি ২০১৩ সালে সরকারি হয়। মনাই নদের পশ্চিম পাশে অবস্থিত বিদ্যালয়টিতে প্রাক্-প্রাথমিক (শিশু) শ্রেণিতে ৯ জন, প্রথম শ্রেণিতে ১০ জন, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ১০ জন, তৃতীয় শ্রেণিতে ৮ জন, চতুর্থ শ্রেণিতে ৯ এবং পঞ্চম শ্রেণিতে ৪ জন শিক্ষার্থী রয়েছে।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সাল পর্যন্ত বিদ্যালয়টিতে দুজন সহকারী শিক্ষক ছিলেন। তাঁরা হলেন আবদুল হান্নান ও পারভীন আক্তার। ওই বছরের ৮ মার্চ সহকারী শিক্ষক জান্নাতুল ফেরদৌস ও হারুন অর রশিদ বিদ্যালয়ে যোগ দেন। তখন আবদুল হান্নান ও পারভীন আক্তার বদলি হয়ে অন্যত্র চলে যান। একই বছর তামান্না আক্তার নামে আরেকজন শিক্ষক যোগ দিলেও তিনি চাকরি থেকে অব্যাহতি নেন। হারুন অর রশিদও অন্যত্র বদলি হয়ে যান। তখন সহকারী শিক্ষক জান্নাতুল ফেরদৌস বেশ কিছুদিন একাই বিদ্যালয় সামলান। পরে পাশের বিদ্যালয় থেকে একজন সহকারী শিক্ষককে সেখানে সংযুক্ত করা হয়। 

১ জুলাই থেকে আমাকে একাই ৫০ জন শিক্ষার্থীকে পাঠদান করতে হচ্ছে। এতে সঠিকভাবে পাঠদান করা সম্ভব হচ্ছে না। একা বিদ্যালয়ের পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
সহকারী শিক্ষক পারভীন আক্তার

এর মধ্যে শাহাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক শেখ মহসীন কবীরকে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত দক্ষিণ আমজোড়া বিদ্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছিল। এর মধ্যে গত এপ্রিলে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জান্নাতুল ফেরদৌস মাতৃত্বকালীন ছুটিতে যান। তাঁর ছুটি আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে। 

এরপর শেখ মহসীন কবীরের সংযুক্তির মেয়াদ আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়। একই সময়ের জন্য পাশের রামদীঘা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পারভীন আক্তারকেও দক্ষিণ আমজোড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়। 

তবে পারভীন আক্তার বিদ্যালয়ে যোগ দিলেও শেখ মহসীন কবীর এখনো (দ্বিতীয় মেয়াদের সংযুক্তি) সেখানে যোগ দেননি। ফলে ১ জুলাই থেকে কার্যত একজন শিক্ষক দিয়েই বিদ্যালয়টির পাঠদান কার্যক্রম চলছে।

সহকারী শিক্ষক পারভীন আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, ‘১ জুলাই থেকে আমাকে একাই ৫০ জন শিক্ষার্থীকে পাঠদান করতে হচ্ছে। এতে সঠিকভাবে পাঠদান করা সম্ভব হচ্ছে না। একা বিদ্যালয়ের পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে।’

আর শেখ মহসীন কবীর বললেন, ‘আমার নিজ বিদ্যালয় থেকে দক্ষিণ আমজোড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দূরত্ব প্রায় তিন কিলোমিটার। দুর্গম যাতায়াতব্যবস্থার কারণে আমি নিজ বিদ্যালয়েই শিক্ষার্থীদের পাঠদান করছি। সংযুক্তির আদেশ বাতিলের জন্য খুব শিগগির আবেদন করব।’

যাতায়াতব্যবস্থা ভালো না থাকায় এবং থাকার মতো ভালো পরিবেশ না থাকায় এখানে কোনো শিক্ষক এসে থাকতে চান না বলে জানিয়েছেন মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকা সহকারী শিক্ষক জান্নাতুল ফেরদৌস।

ধারাবাহিক শিক্ষকসংকট চলায় শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় পাঠদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন অভিভাবকেরা। বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর বাবা জসীম মিয়া ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীর বাবা মজনু মিয়া বলেন, প্রয়োজনীয় শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে লেখাপড়ার বদলে হইহুল্লোড় করেই বেশির ভাগ সময় কাটায়। ৫০ জন শিক্ষার্থী হলেও সর্বোচ্চ ৩০ থেকে ৩৫ জন বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকে। শিক্ষকসংকটে লেখাপড়ার খুব ক্ষতি হচ্ছে। 

যাতায়াতব্যবস্থা ভালো না থাকায় এবং থাকার মতো ভালো পরিবেশ না থাকায় এখানে কোনো শিক্ষক এসে থাকতে চান না বলে জানিয়েছেন মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকা সহকারী শিক্ষক জান্নাতুল ফেরদৌস। বর্ষাকালে শিক্ষার্থীর উপস্থিতিও চার ভাগের এক ভাগে নেমে আসে উল্লেখ করে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিদ্যালয়টির পেছনে শ্রম দিতে দিতে এখন আর পারছি না। শিক্ষকের সংখ্যা বাড়াতে হবে।’ 

জেলায় শিক্ষকসংকটের কথা স্বীকার করে সুনামগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহন লাল প্রথম আলোকে বলেন, প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি ও সহকারী শিক্ষকদের পদায়নের কার্যক্রম চলমান আছে। 

এটি হাওরবেষ্টিত উপজেলা হওয়ায় অনেক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা বর্ষাকালে ঝুঁকি নিয়ে বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া করেন। বর্ষাকালে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও কম থাকে। যাবতীয় বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ অবগত রয়েছে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা দিলোয়ার হোসেন

সংকটে হাওরের অন্য বিদ্যালয়ও

মধ্যনগর উপজেলার চারটি ইউনিয়নে ৮৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। অধিকাংশ বিদ্যালয়ে রয়েছে যাতায়াতের বিড়ম্বনা। বর্ষায় ইঞ্জিনচালিত নৌকা এবং হেমন্তকালে হেঁটে, মোটরসাইকেলে ও অটোরিকশায় চড়ে শিক্ষকদের বিদ্যালয়ে আসা–যাওয়া করতে হয়।

উপজেলায় সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত পদ ৩৮৬টি। এর মধ্যে ৭৭টি পদ শূন্য। প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য আছে ৩৮টি বিদ্যালয়ে। এর মধ্যে পাঁচটি বিদ্যালয়ে নিয়মিত শিক্ষক মাত্র একজন। তবে এগুলোতে পাশের বিদ্যালয় থেকে একজন করে শিক্ষককে সংযুক্তি দেওয়া হয়েছে। বিদ্যালয়গুলো হলো দক্ষিণ আমজোড়া নুরুন্নাহার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আমজোড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রূপনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দরাপপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাছুয়াকান্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। 

আমজোড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৭৩ জন। গত বছর ছিল ১১৩ জন। বিদ্যালয়টিতে চারজন শিক্ষক থাকার কথা। কিন্তু তিন বছর ধরে সহকারী শিক্ষক ছৈয়দা সাদিয়া আক্তার একাই কর্মরত। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে থাকা এই শিক্ষক প্রথম আলোকে বলেন, ‘যদিও পাশের বিদ্যালয় থেকে সংযুক্তিতে একজন শিক্ষক দেওয়া হয়েছে। শিক্ষকসংকটের কারণে পাঠদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।’ 

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা দিলোয়ার হোসেন বলেন, এটি হাওরবেষ্টিত উপজেলা হওয়ায় অনেক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা বর্ষাকালে ঝুঁকি নিয়ে বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া করেন। বর্ষাকালে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও কম থাকে। যাবতীয় বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ অবগত রয়েছে।