পদ্মা নদীর নির্মাণাধীন তীর রক্ষা বাঁধে ভাঙন দেখছেন এলাকার লোকজন। গত সোমবার শরীয়তপুরের জাজিরার কাথুরিয়া গ্রামে
পদ্মা নদীর নির্মাণাধীন তীর রক্ষা বাঁধে ভাঙন দেখছেন এলাকার লোকজন। গত সোমবার শরীয়তপুরের জাজিরার কাথুরিয়া গ্রামে

শরীয়তপুরের জাজিরা

পদ্মার তীর রক্ষা বাঁধের ২০০ মিটার অংশ বিলীন, আতঙ্ক

শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলায় পদ্মা নদীর নির্মাণাধীন তীর রক্ষা বাঁধের তিনটি স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। পদ্মার পানি ও স্রোত বাড়ায় গত সাত দিনে নদীতে বিলীন হয়েছে বাঁধটির অন্তত ২০০ মিটার অংশ। ভাঙনের মুখে ইতিমধ্যে ২৫টি পরিবার তাদের বসতবাড়ি সরিয়ে নিয়েছে। আর ভাঙনের কবলে আছে আরও ৩০০টি পরিবারের বাড়িঘর। আতঙ্ক ছড়িয়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে।

পাউবো সূত্র বলছে, পদ্মা সেতু এলাকার নাওডোবা থেকে জাজিরা ইউনিয়নের পাথালিয়াকান্দি পর্যন্ত পদ্মার দক্ষিণ তীরে ১০ দশমিক ৬৭ কিলোমিটার তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। ৩৯টি প্যাকেজে এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ১৩০ কোটি টাকা। উপজেলার পালেরচর ইউনিয়নের কাথুরিয়া, ফরাজী কান্দি ও নাওডোবা ইউনিয়নের পৈলান মোল্যারকান্দি, আলম খার কান্দি এলাকায় ভাঙনে সাতটি দোকান ও গ্রামীণ সড়কের প্রায় ৫০ মিটার অংশ নদীতে চলে গেছে।

২০২৪ সালের মার্চ মাসে পূর্ব নাওডোবা ইউনিয়নের জিরো পয়েন্ট থেকে পাথালিয়াকান্দি পর্যন্ত ৮ দশমিক ৬৭ কিলোমিটার নদীর তীর রক্ষা বাঁধের কাজ শুরু হয়। ২০২৫ সালে পদ্মা সেতু প্রকল্পের তীর রক্ষা বাঁধের একটি অংশে ভাঙন দেখা দিলে প্রকল্পটির সঙ্গে আরও দুই কিলোমিটার অংশ যুক্ত করা হয়।

‘পরিবারে আয় করার মতো কেউ নাই। ঢাকায় হকারি কইরা কাপড় বিক্রি করি। বাড়ি ভাইঙা নিতে এলাকায় আইছি।’
রাহিমা বেগম, ভাঙনে বাড়ি হারানো নারী, কাথুরিয়া গ্রাম, জাজিরা

ভাঙনে বাড়ি হারিয়েছেন ৫৫ বছর বয়সী জাজিরার কাথুরিয়া গ্রামের রাহিমা বেগম। ১৮ বছর আগে তাঁর স্বামী মারা গেছেন। দুই সন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়িতে থাকতেন। চার শতক জমির ওপর সেই বাড়িটি গত সোমবার পদ্মায় বিলীন হয়ে যায়। বাড়ির মালামাল সরানোর সময় আহাজারি করে রাহিমা বলছিলেন, ‘পরিবারে আয় করার মতো কেউ নাই। ঢাকায় হকারি কইরা কাপড় বিক্রি করি। বাড়ি ভাইঙা নিতে এলাকায় আইছি।’

কাথুরিয়া এলাকায় জ্বালানি তেল, রান্নার জন্য তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলপিজি) ও মুদিখানার পণ্য বিক্রি করেন রেজাউল করিম। গত রোববার রাতে মালামালসহ তাঁর দোকান নদীতে তলিয়ে যায়। রেজাউল বলেন, তিন বছর ধরে বাঁধের কাজ হচ্ছে। কিন্তু ভাঙন তো থামছে না। চোখের সামনে সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেলেন। এখন কোথায় গিয়ে দাঁড়াবেন?

নদী ভাঙনের কবলে বসতবাড়ি ও দোকান সরিয়ে নেওয়া হয়। গত সোমবার শরীয়তপুরের জাজিরার কাথুরিয়া গ্রামে

গত মঙ্গল ও সোমবার দুই দিনে কাথুরিয়া-মাঝিরঘাট সড়কের প্রায় ৫০ মিটার অংশ নদীতে বিলীন হয়েছে। এতে সড়কটি দিয়ে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ভ্যান ও মোটরসাইকেল চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। গত সোমবার কাথুরিয়া গ্রামে সরেজমিনে দেখা যায়, বিদ্যুতের সঞ্চালন লাইনের তিনটি খুঁটি তারসহ নদীতে পড়ে গেছে। ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ। আতঙ্কে গ্রামের লোকজন ঘরবাড়ি ও নদীর তীরে থাকার দোকান সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। কেউ কেউ বাড়িতে থাকা গাছপালা কেটে সরাচ্ছেন।

ভাঙনের খবর পেয়ে পাউবোর তিন জনজন কর্মকর্তা কাথুরিয়া এলাকা পরিদর্শন করেছেন। তাঁরা জানান, হঠাৎ করে ভাঙন শুরু হয়েছে। বাঁধের পাশে প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকা এখন ভাঙনের ঝুঁকিতে আছে। ভাঙন ঠেকাতে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে।

তীর রক্ষা বাঁধটির প্রায় পাঁচ কিলোমিটার অংশের ৬০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি ৫ দশমিক ৬৭ কিলোমিটার অংশের নদীতে বালু ভর্তি জিও ব্যাগ ফেলার কাজ চলছিল। বর্ষা মৌসুম হওয়ায় বর্তমানে নদীতে সেই কাজ বন্ধ আছে। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত ব্লক তৈরির কাজ করছে।

তীর রক্ষা বাঁধটির প্রায় পাঁচ কিলোমিটার অংশের ৬০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি ৫ দশমিক ৬৭ কিলোমিটার অংশের নদীতে বালু ভর্তি জিও ব্যাগ ফেলার কাজ চলছিল। বর্ষা মৌসুম হওয়ায় বর্তমানে নদীতে সেই কাজ বন্ধ আছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পাউবোর শরীয়তপুর কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী খান মোহাম্মদ ওয়ালিউজ্জামান বলেন, প্রকল্পের কাজ চলার মধ্যেই গত বছর কয়েকটি এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছিল। এ কারণে ওই অংশের নকশা পরিবর্তন করা হয়। নকশা অনুমোদনের পর বর্ষার আগেই সেখানে আবার কাজ শুরু করা হয়েছিল। এর মধ্যেই নতুন করে ভাঙন শুরু হয়েছে।

৬ দফা ভাঙনে সব হারান নাজমা

কাথুরিয়া গ্রামের ৬৫ বছর বয়সী নাজমা বেগম ২০ বছরে ছয় দফায় নদীর ভাঙনের শিকার হয়েছেন। ভাঙনে ১০ বিঘা ফসলি জমি ও বসতবাড়ি বিলীন হয়েছে তাঁর। এবার তাঁর শেষ সম্বল ২০ শতক জমির ওপর থাকা বসতবাড়িটিও ভাঙনের কবলে পড়েছে।
বাড়ির মালামাল সরিয়ে সড়কের পাশে রেখেছেন। নাজমা বেগম বলেন, ‘মধ্যবিত্ত কৃষি পরিবার ছিল আমাদের। নদীভাঙনে নিঃস্ব হয়েছি। শেষ আশ্রয়ের বাড়িটিও বিলীন হয়ে যাচ্ছে। সন্তান ও অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে কোথায় যাব, বুঝতে পারছি না।’

পদ্মার প্রবল স্রোতে তীরের সড়কের একটি অংশ ভেঙে নদীতে বিলীন হয়েছে। গত সোমবার জাজিরার কাথুরিয়া এলাকায়