৯ লাখ টাকা বকেয়া থাকায় প্রতিষ্ঠানটির ভবনে বিদ্যুৎ–সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
মাদারীপুরে ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজির (আইএইচটি) কার্যক্রম প্রায় তিন বছর আগে উদ্বোধন করা হয়েছে। চলতি বছর সরকারি প্রতিষ্ঠানটির তিনটি বিভাগে ভর্তি হয়েছেন ৮৯ শিক্ষার্থী। কিন্তু জনবলসংকটে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম চালু হয়নি। এতে বিপাকে পড়েছেন ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীরা।
এদিকে ৯ লাখ টাকা বকেয়া থাকায় প্রতিষ্ঠানটির ভবনে বিদ্যুৎ–সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এতে প্রতিষ্ঠানটির যে কয়েকজন কর্মচারী নিয়মিত হাজিরা দেন, তাঁরা ভোগান্তি পোহাচ্ছেন।
২০১৭-১৮ অর্থ বছরে মাদারীপুরে ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজির আটতলাবিশিষ্ট একাডেমিক ভবনসহ মোট ৯টি ভবন নির্মাণ করে স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। এতে ব্যয় হয় ৩২ কোটি ৮২ লাখ টাকা। ২০২০ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজির কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়। প্রায় তিন বছর পার হয়ে গেলেও প্রতিষ্ঠানটি এখন পর্যন্ত কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি। এটি চালু হলে ৪ বছর মেয়াদি কোর্সে প্যাথোলজিস্ট, মেডিকেল ল্যাব টেকনিশিয়ান, ডেন্টাল, ফিজিওথেরাপি, স্বাস্থ্য পরিদর্শক, ফার্মাসি, রেডিও থেরাপি, ল্যাবরেটরিসহ বিভিন্ন শাখায় প্রতিবছর সাড়ে তিন শ শিক্ষার্থী ভর্তি হতে পারবেন।
মাদারীপুর পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সৈয়দারবালী মৌজায় প্রায় দুই একর জায়গায় ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজির ক্যাম্পাস। চারপাশে সীমানাপ্রাচীর দেওয়া এই প্রতিষ্ঠানে ভেতরে আটতলা একাডেমিক ভবন, রাধাচূড়া ছাত্রীনিবাস, কৃষ্ণচূড়া ছাত্রনিবাস, গ্যারেজ কাম ড্রাইভার রেস্ট হাউস, সাব স্টেশন, স্টাফদের জন্য দুটি কোয়ার্টার ও অধ্যক্ষের বাসভবন রয়েছে। এ ছাড়াও আইএইচটির মধ্যেই মাদারীপুর বক্ষব্যাধি হাসপাতালের আরবান হেলথ সার্ভিসের নতুন ভবনের নির্মাণকাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। তবে আইএইচটির রজনীগন্ধা স্টাফ কোয়ার্টারের তিনতলা ভবনেই বক্ষব্যাধি ক্লিনিকের কার্যক্রম চলছে।
গত সোমবার বেলা ১১টার দিকে আইএইচটি ঘুরে দেখা যায়, ভেতরে বহিরাগত লোকজনের আনাগোনা। বক্ষব্যাধি ক্লিনিকের দুয়েকজন সেবাপ্রত্যাশী আসা-যাওয়া করছেন। আইএইচটি অফিস সহায়ক মোহাম্মদ বায়েজিদ ও সাঁটলিপি মুদ্রাক্ষরিক ও কম্পিউটার অপারেটর এনায়েত হোসেন ছাড়া ভেতরে পুরো ৯টি ভবনে আর কেউ নেই। একাডেমিক ভবনে ঢুকতেই বাইরের ছয়টি গ্লাস ভাঙা। ভবনটির ভেতরের একটি বড় গ্লাসও ভাঙা। ভবনের ভেতরের বিভিন্ন অংশের রং খসে খসে পড়ছে। কিছু স্থানে হয়ে পড়েছে ড্যাম্প। একাডেমি ভবনসহ প্রতিটি ভবনে দামী দামী আসবাব ও মূল্যবান যন্ত্রপাতিতে পড়েছে ধুলার আস্তর। আইএইচটির প্রতিটি ভবনের আনাচকানাচে ও নিচতলায় সিগারেটের টুকরা পড়ে আছে।
একাডেমিক ভবনের নিচে দাঁড়িয়ে কথা হয় মাদারীপুর ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজির অফিস সহায়ক মো. বায়েজিদের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘স্থানীয় ছেলেপেলে এখানে আসে, আড্ডা দেয়। আমি এখানে একাই বেশির ভাগ সময় থাকি। তাঁদের নিষেধ করলে ঝামেলা। তা ছাড়া প্রধান গেট তো বন্ধ রাখা যাচ্ছে না। টিবি ক্লিনিকের (বক্ষব্যাধি ক্লিনিক) লোকজন ভেতরে আসা–যাওয়া করে।’
মোহাম্মদ বায়েজিদ জানালেন, প্রায় এক বছর আগে সৈয়দারবালী এলাকায় আওয়ামী লীগের দুপক্ষের সংঘর্ষ হয়। তখন দুপক্ষের ইটপাটকেল এসে পড়ে আইএইচটির একাডেমিক ভবনে। এ কারণে বাইরের ছয়টি গ্লাস ভেঙে গেছে।
প্রতিষ্ঠানটি জন্য একজন অধ্যক্ষ নিয়োগ করা থাকলেও তিনি অফিস করেন না। মোহাম্মদ বায়েজিদ বলেন, ‘হাবিবুর রহমান স্যার বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া ক্যাম্পাসে আসেন না। তিনি বাড়িতেই থাকেন। অধ্যক্ষের বাসভবনে তিনি ওঠেননি।’
মাদারীপুর ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজির কার্যক্রম চালু না হলেও ইতিমধ্যে ২২ মাসে ৯ লাখ ১০ হাজার ৮৮৫ টাকা বিদ্যুৎ বিল বকেয়া পড়েছে। এ কারণে প্রায় এক বছর ধরে প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। বিদ্যুৎ বিল পরিশোধে কোন উদ্যোগও নেওয়া হয়নি প্রতিষ্ঠান থেকে।
প্রতিষ্ঠানটির সাঁটলিপি মুদ্রাক্ষরিক ও কম্পিউটার অপারেটর এনায়েত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘এক বছর ধরে বিদ্যুৎহীন অবস্থায় আছি। বাসা থেকে ল্যাপটপে চার্জ দিয়ে কাজ থাকলে শরীয়তপুর থেকে মাদারীপুরে অফিসে আসি।’
প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হাবিবুর রহমান বলেন, ‘কারা, কীভাবে ৯ লাখ টাকার বিদ্যুৎ ব্যবহার করেছে, আমার জানা নেই। সেখানে থাকার পরিবেশ নেই। জরুরি কাজ হলে আমি প্রতিষ্ঠানে যাই।’
গত ১৬ জুন মাদারীপুর আইএইচটিতে ২০২১-২২ শিক্ষা বর্ষে ভর্তি শুরু হয়। ফার্মাসি, রেডিও থেরাপি ও ল্যাবরেটরি বিভাগে মোট ৮৯ জন শিক্ষার্থী। অন্যান্য আইএইচটিতে গত সেপ্টেম্বরে ক্লাস শুরু হয়ে গেলেও মাদারীপুর আইএইচটিতে ক্লাস কবে নাগাদ শুরু হবে, তা নিয়ে রয়েছে অনিশ্চয়তা।
ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজি পরিচালনার জন্য শিক্ষক, প্রশিক্ষকসহ বিভিন্ন বিভাগে ৪০ থেকে ৫০ জন লোকবল প্রয়োজন। মাদারীপুর আইএইচটি চালুর জন্য লোকবলের চাহিদা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলেও কার্যকর কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অধ্যক্ষসহ তিনজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ হাবিবুর রহমান বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানটির একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য যে লোকবল দরকার, তা আমাদের এখানে নেই। মন্ত্রণালয়ে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের ক্লাস শুরু করতে হলে অতি দ্রুতই লোকবল দিতে হবে।’