
ফরিদপুর-৪ আসনে (ভাঙ্গা, সদরপুর ও চরভদ্রাসন) ৫১ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী শহিদুল ইসলাম। তাঁর বাড়ি জেলার নগরকান্দা উপজেলায়। দলের নির্দেশে এক বছর আগে তিনি এই আসনে কার্যক্রম শুরু করেন। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি ভোটারের মন জয় করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
শহিদুল ইসলাম (৫৫) ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার তালমা ইউনিয়নের কোনাগ্রামের বাসিন্দা। তিনি কৃষক দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক। নগরকান্দা ফরিদপুর-২ (নগরকান্দা-সালথা) আসনের অন্তর্ভুক্ত।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি দলের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে ফরিদপুর-২ আসন ছেড়ে ফরিদপুর-৪ আসনে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি শুরু করেন শহিদুল ইসলাম। সেদিন নগরকান্দার কোনাগ্রামে শহিদুল ইসলামের বাড়িতে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। সমর্থকদের কাঁদিয়ে নিজ আসন (ফরিদপুর–২) থেকে সরে দাঁড়ান শহিদুল ইসলাম। ওই দিন নগরকান্দা ও সালথার নেতা-কর্মীদের বিদায় জানান তিনি। পরে সদরপুর, চরভদ্রাসন ও ভাঙ্গার বিএনপি ও কৃষক দলের নেতা-কর্মীরা তাঁদের নেতা হিসেবে তাঁকে বরণ করে নেন।
ফরিদপুর-২ আসনে বিএনপির প্রার্থিতা নিয়ে শহিদুলের সঙ্গে বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক (ঢাকা বিভাগ) শামা ওবায়েদের বিরোধ চলছিল। দুজনের বাড়িই নগরকান্দায়। ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে একজন নিহত হন। এ ঘটনায় ওই রাতেই শহিদুল ইসলাম ও শামা ওবায়েদের দলীয় প্রাথমিক পদসহ সব পর্যায়ের পদ স্থগিত করা হয়। তবে ওই বছরের ১০ নভেম্বর উভয়ের ক্ষেত্রেই এ স্থগিতাদেশ তুলে নেওয়া হয়। তবে দুই নেতার এ বিরোধ অব্যাহত ছিল। বিশেষত সালথায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বেশ কয়েকটি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
গত বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি শহিদুল ইসলাম কর্মী-সমর্থকদের বিদায় জানিয়ে বলেন, ‘এই নগরকান্দায় এত যুদ্ধ, এত সংগ্রাম। আপনারা জানেন, এখানে আরও একজন মানুষ আছেন। তিনিও অনেক বড় নেতা। তারেক রহমান আমাকে ফরিদপুর-৪ আসনের জন্য কাজ করার কথা বলেছেন। আমি আমার নেতার কথা ফেলতে পারিনি। সম্পর্ক হয় আদর্শের। এ সম্পর্ক রক্তের সম্পর্কের চেয়ে অনেক মূল্যবান।’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেছিলেন, ‘নগরকান্দার বন্ধুদের বলি, দলের এ সিদ্ধান্ত আমি অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলব। দলের বাইরে যাব না। কপালে যা আছে, আল্লাহ যা লিখে দিয়েছেন, নেতা যা ভালো বুঝবেন তা–ই করবেন।’
নেতার ওপর আস্থা রেখেছিলেন শহিদুল। ফরিদপুর-৪ আসনে কাজ করার নির্দেশ পেয়ে এক মুহূর্তের জন্যও বসে থাকেননি। তিন উপজেলায় দলকে সংগঠিত করেছেন, ইউপি চেয়ারম্যানদের কাছে টেনে নিয়েছেন। যেসব আওয়ামী লীগ নেতার স্থানীয় পর্যায়ে বদনাম নেই, তাঁদের দলে ভিড়িয়েছেন এই বলে, ‘যাঁরা আওয়ামী লীগ করেছেন, তাঁরা সবাই তো খারাপ নন। সবাইকে তো আমি বঙ্গোপসাগরে ফেলে দিতে পারব না।’
গত এক বছরে শহিদুলকে কঠিন বাস্তবতার মুখে পড়তে হয়। গত সেপ্টেম্বরে নির্বাচন কমিশন সচিবালয় ভাঙ্গা উপজেলার দুটি ইউনিয়ন আলগী ও হামিরদী ফরিদপুর-৪ থেকে কেটে ফরিদপুর-২ আসনের সঙ্গে জুড়ে দেয়। এর পেছনে শহিদুলের হাত আছে—এমন প্রচার চালানো হয় তাঁর বিরুদ্ধে। এই বিভাজন নিয়ে তীব্র আন্দোলন শুরু হয়। বিভাজন বাতিল করতে হাইকোর্টে ধরনা দিয়ে দীর্ঘ অপেক্ষার পর জনগণের দাবি আদায় করে এলাকায় বিজয়ীর বেশে ফেরেন শহিদুল।
ফরিদপুর–৪ আসনে মোট আটজন প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। ভোট গ্রহণের এক সপ্তাহ আগে দুটি ঘটনা জামায়াত প্রার্থী মো. সরোয়ার হোসাইন ও স্বতন্ত্র প্রার্থী এ এ এম মুজাহিদ বেগের প্রচারণায় নতুন মাত্রা যোগ করে। ৫ ফেব্রুয়ারি এই আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মিজানুর রহমান জামায়াতের প্রার্থীকে সমর্থন দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। আরেকটি ঘটনা হলো, এই আসনের সাবেক সংসদ সদস্য কেন্দ্রীয় যুবলীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মজিবুর রহমান চৌধুরীর (নিক্সন) স্বতন্ত্র প্রার্থী মুজাহিদ বেগকে সমর্থন দেওয়া।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফরিদপুর–৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী শহিদুল ইসলাম ১ লাখ ২৭ হাজার ৪৪৩ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। ৭৫ হাজার ৮০৫ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে জামায়াতের প্রার্থী মো. সরোয়ার হোসাইন এবং ৫৬ হাজার ১৬০ ভোট পেয়ে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী মুজাহিদ বেগ।
দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ফরিদপুর-৪ আসন। ১৯৭৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এই আসনে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ছাড়া জাতীয় কোনো নির্বাচনে জিততে পারেনি বিএনপি। এই আসনে নগরকান্দার কোনাগ্রাম থেকে আসা ‘বহিরাগত’ শহিদুল ইসলামের এমন জয় অনেকের কাছেই ছিল অপ্রত্যাশিত। তবে মাঠপর্যায়ে তাঁর ধারাবাহিক তৎপরতা, গ্রামভিত্তিক গণসংযোগ, কৃষক সংগঠনের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ও ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা দ্রুতই জনসমর্থনে রূপ নেয়। কেন্দ্রীয় কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তাঁর পরিচিতি তৃণমূলে শক্ত ভিত্তি তৈরি করে দেয়। বিজয়ের পরদিনই তিনি ভাঙ্গার চান্দ্রা ইউনিয়নের পাচকুল গ্রামে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মো. সরোয়ার হোসাইনের বাসায় গিয়ে তাঁর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে বলেন, ‘আমরা প্রতিপক্ষ ছিলাম না, প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলাম। নির্বাচন শেষ, এখন উন্নয়নের রাজনীতি হবে।’
২০২৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি নেতার নির্দেশে শূন্য হাতে নিজ সংসদীয় আসন ছেড়ে ফরিদপুর-৪–এর উদ্দেশে পা বাড়িয়েছিলেন শহিদুল ইসলাম। ঠিক এক বছর পর তিনি নির্বাচনে জয়ী হলেন। নির্বাচনের পরদিন ১৩ ফেব্রুয়ারি ভাঙ্গা বাজারের ঈদগাহ মাঠে হাজারো মানুষের সমাবেশে শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমি শূন্য হাতে আপনাদের কাছে এসেছিলাম। আপনারা আমাকে ফেলে দেননি। বরং আমাকে মন ভরে ভোট দিয়েছেন। শূন্য হাতে আপনাদের কাছে এসেছিলাম, আজ আমি পূর্ণ, আজ আমি ধন্য। আপনাদের এই ঋণ কোনো দিন শোধ করতে পারব না।’