
মসজিদটির বয়স কেউ বলেন ৫০০ বছর, কেউ বলেন ৭০০ বছর। বিশাল আকারের কালো রঙের এক গম্বুজের মসজিদটি মোগল আমলে তৈরি করা বলে জানেন স্থানীয় বাসিন্দারা। দেয়ালের পুরুত্ব, নির্মাণশৈলী দেখে তেমনটিই ধারণা করা হয়। বড় গম্বুজটির চারপাশে ১৩টি ছোট গম্বুজ আছে, যেগুলোর ‘শ্রী’ (সৌন্দর্য) আছে। সেখান থেকেই মসজিদ নাম ‘তেরশ্রী মসজিদ’ হয়েছে বলে মনে করেন অনেকে।
শত শত বছরের পুরোনো মসজিদটির অবস্থান ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার পাগলা থানা এলাকার উস্থি ইউনিয়নেরে তেরশ্রী গ্রামে। মসজিদের নাম থেকেই এলাকার নাম তেরশ্রী হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। তবে এ ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায় না। তেরশ্রী বাজার থেকে একটু ভেতরে গ্রামের মধ্যে মসজিদটির অবস্থান।
শুক্রবার দুপুরে মসজিদটি ঘুরে দেখা গেছে, বড় আকৃতির এক গম্বুজের একটি মসজিদ। গম্বুজটি কালো রং করা। এক গম্বুজ ঘিরে আছে আরও ছোট ছোট গম্বুজ। ভেতরে ও বাইরে নানা কারুকার্য। অনেক কারুকাজ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় দুই দশক আগে সংস্কার করে রং করা হয়। ভেতরে বেশি লোক নামাজ পড়তে না পারায় বাইরে কিছু অংশ বাড়ানো হয়েছে।
মসজিদের সামনে কথা হয় সত্তরোর্ধ্ব মো. আজিজুল হকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমার বাপ-দাদারা বলেছে মসজিদটি ৫০০ বছরের পুরোনো হবে। তারাও মারা গেছে প্রায় ১০০ বছর। বাঘেরগাঁও, কান্দিপাড়া, তেরশ্রী, নাগারকান্দি ও নূরাপাড়া গ্রামের মানুষের জন্য মসজিদটি ছিল। পরে আয়তন বাড়িয়ে এখন ১০০ জনের মতো নামাজ পড়তে পারে।’ তাঁর দাবি, মসজিদটি মোগল আমলে তৈরি হয়েছে। দক্ষিণ গফরগাঁওয়ে এমন পুরোনো ও সুন্দর মসজিদ আর নেই।
তেরশ্রী গ্রামের সরদার বংশের আশরাফ সিদ্দিকী ওরফে বাবলু সরদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি বংশপরম্পরায় শুনেছি, মসজিদটির প্রতিষ্ঠাতা মির্জা সরদার। সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে প্রতিষ্ঠিত। এটিই গফরগাঁওয়ের প্রথম মসজিদ। একটি বড় গম্বুজের চারপাশে আরও ১৩টি ছোট গম্বুজ আছে। এগুলোকে “শ্রী” বলা হয়। “শ্রী” মানে সৌন্দর্য। ১৩টি গম্বুজের কারণে মসজিদের নাম তেরশ্রী মসজিদ। এই মসজিদের নামানুসারে গ্রামের নাম হয়েছে তেরশ্রী।’ তবে গ্রামের নাম আগে কী ছিল, তা তিনি বলতে পারেননি।
আশরাফ সিদ্দিকী আরও বলেন, মসজিদটিতে আগে ১৬ থেকে ১৮ জন মানুষ নামাজ পড়তে পারতেন। দেয়ালগুলো পৌনে চার হাত প্রস্থের। এখানে সরকারিভাবে তদারকি নেই। এটি স্থানীয়ভাবেই রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। সরকারি উদ্যোগ হলে মসজিদের সৌন্দর্য বাড়ত।
মসজিদের মুয়াজ্জিন আবদুস সামাদ বলেন, মসজিদের ভেতরে অনেক কারুকাজ ছিল। এখনো অনেকগুলো আছে। বাইরে কারুকাজ থাকলেও অনেকগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ২০০৪ সালে এটি সংস্কার করে রং করা হয়। মসজিদের ভেতরে লোক না ধরায় বাইরে কিছু অংশ বাড়ানো হয়েছে।
মসজিদে চার বছর ধরে ইমামতি করছেন মাওলানা রফিকুল ইসলাম হেলালী। তিনি বলেন, ‘আমিও এলাকার মানুষ। আমাদের পূর্বপুরুষের কাছে জেনেছি, মসজিদটি অনেক পুরোনো। ৫০০ থেকে ৭০০ বছর পুরোনো বলা হয়। তবে নির্দিষ্ট করে কেউ বলতে পারেন না। বিভিন্ন জায়গা থেকে দর্শনার্থীরা মসজিদটি দেখতে আসেন। যখন এই মসজিদ তৈরি হয়েছে তখন কোনো সিমেন্ট ছিল না। চুন-সুরকি ও বিভিন্ন কষ–জাতীয় জিনিস দিয়ে তৈরি হয়।’ তিনি বলেন, মুসলমানদের ঐতিহ্য আস্তে আস্তে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এ জন্য এটি খেয়াল রাখা উচিত।
প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষক স্বপন ধর মসজিদের ছবি দেখে প্রথম আলোকে বলেন, নির্মাণশৈলী দেখে বোঝা যায়, এটি মধ্যপ্রাচ্যের আফগান মসজিদগুলোর আদলে তৈরি করা। মসজিদটি অবশ্যই ৫০০ বছরের বেশি সময় পুরোনো ও মোগল ঐতিহ্যের অংশ। ঈশা খাঁ ও তাঁর প্রভাবিত যাঁরা আফগান মুসলমান ছিলেন, তাঁরা এসব তৈরি করেছিলেন। এর রক্ষণাবেক্ষণ অত্যন্ত জরুরি।
ময়মনসিংহ শশীলজ জাদুঘরের মাঠ কর্মকর্তা সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, পুরাকীর্তি নিয়ে চলতি অর্থবছরে তাঁদের জরিপকাজ চলমান। তাঁদের একটি দল গফরগাঁও জরিপকাজ করেছে। সেই প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ হয়নি।