স্থানীয়ভাবে বিলটি ‘পদ্মবিল’ নামে পরিচিত। শনিবার বিকেলে কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার গোজাদিয়া এলাকায় অবস্থিত সিঙ্গার বিলে
স্থানীয়ভাবে বিলটি ‘পদ্মবিল’ নামে পরিচিত। শনিবার বিকেলে কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার গোজাদিয়া এলাকায় অবস্থিত সিঙ্গার বিলে

‘গোলাপি রাজ্যে’ বেড়ানো শেষে ফুল ছিঁড়ে নিয়ে যাচ্ছেন দর্শনার্থীরা

যত দূর চোখ যায়, জলাভূমির বুকজুড়ে ফুটে আছে পদ্মফুল। হয়ে উঠেছে গোলাপি রাজ্য। এই অপরূপ দৃশ্য দেখতে ছুটির দিনে সেখানে ভিড় করছেন দূরদূরান্তের দর্শনার্থীরা। এটি কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জের সিঙ্গার বিল।

উপজেলার গোজাদিয়া এলাকায় অবস্থিত সিঙ্গার বিল স্থানীয়ভাবে ‘পদ্মবিল’ নামে পরিচিত। গত শনিবার গিয়ে দেখা যায়, ছোট ছোট নৌকায় করে পরিবার, বন্ধু ও তরুণ-তরুণীরা ঘুরে বেড়াচ্ছেন বিলে। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ নৌকায় বসে উপভোগ করছেন পদ্মের সৌন্দর্য। আবার কেউ দুহাত ভরে পদ্মফুল নিয়ে ফিরছেন।

বিস্তীর্ণ জলাভূমির কোথাও লতা-গুল্ম, কোথাও কচুরিপানা। এরই মধ্যে ভেসে রয়েছে অনেক গোলাপি পদ্ম। প্রকৃতির এমন রূপ ভ্রমণপিপাসুদের সহজেই টেনে আনছে এখানে।

করিমগঞ্জ বাজার থেকে হাঁটাপথে প্রায় আধা ঘণ্টার কাঁচা সড়ক পেরিয়ে পদ্মবিলে যাওয়া যায়। তবে সেখানে যেতে দর্শনার্থীদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়। কেউ এক কিলোমিটার হেঁটে, আবার কেউ নৌকা ভাড়া করে বিলপাড়ে পৌঁছাচ্ছেন।

বিলপাড়ে পৌঁছানোর পর বিস্তীর্ণ জলাভূমির ভেতরের পদ্মফুল দেখতে আবার নৌকা ভাড়া করতে হচ্ছে। স্থানীয় মাঝিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একটি ডিঙিনৌকায় সাধারণত তিন থেকে চারজন উঠতে পারেন। ১০ থেকে ১৫ মিনিট ঘোরার জন্য নৌকার ভাড়া ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। তবে কেউ কেউ ৬০০ টাকাতেও নৌকা ভাড়া পেয়েছেন।

বিলপাড়ে সারিবদ্ধভাবে কয়েকটি ছোট ডিঙিনৌকা থাকলেও মূলত একটি জায়গা থেকেই নৌকা ভাড়া দেওয়া হয়। এতে ভাড়া নিয়ে দর-কষাকষির সুযোগ কম বলে অভিযোগ দর্শনার্থীদের।

ডিঙিনৌকা ভাড়া করে ঘুরছেন দর্শনার্থীরা। শনিবার বিকেলে করিমগঞ্জের সিঙ্গার বিলে

ফুল ছেঁড়া নিয়ে অসন্তোষ

প্রকৃতির এই সৌন্দর্য দেখতে এসে কেউ কেউ পদ্মফুল ছিঁড়ে নিয়ে যাচ্ছেন। এতে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও অন্য দর্শনার্থীরা। কিছু নৌকার মাঝি দর্শনার্থীদের পদ্মফুল ছিঁড়তে দিচ্ছেন, আবার কেউ কেউ ফুল ছিঁড়তে নিষেধ করছেন।

অনেক কষ্ট করে কাদাপানির রাস্তা পেরিয়ে তাড়াইল উপজেলার জাওয়ার এলাকা থেকে পদ্মফুল দেখতে এসেছেন মো. তাহসিন। তিনি বলেন, ‘বিলে ফুটে আছে অসংখ্য ফুল। দেখে ভালো লাগলেও পাশাপাশি খারাপ লাগছে যখন দেখলাম, অনেক দর্শনার্থী পদ্মফুল ছিঁড়ে নিয়ে যাচ্ছেন।’

নাজমুন্নাহার নামের এক তরুণীকে দুই হাতভর্তি পদ্মফুল নিয়ে ফিরতে দেখা যায়। তাঁর ভাষ্য, ‘প্রচণ্ড গরমে এত কষ্ট করে এসেছি। সঙ্গে কিছু না নিয়ে গেলে কেমন হয়? ফুল তো সব সময় থাকবে না। আমি না নিলেও অন্যরা ঠিকই নিয়ে যাবে।’

বিলে এখন পদ্মফুল ফোটার সময়। এই সময়ে বিলটি সংরক্ষণ করা গেলে আরও কিছুদিন দর্শনার্থীরা ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন বলে মনে করেন স্থানীয় সমাজকর্মী আতহার আলী।

কিশোরগঞ্জ সদর থেকে পরিবারের ছয় সদস্য নিয়ে পদ্মবিলে বেড়াতে এসেছেন আবিদুর রহমান। তিনি বলেন, ‘বিশাল বিলে অসংখ্য পদ্মফুল দেখে খুব ভালো লাগছে। তবে নৌকায় না উঠলে বিলটি ভালোভাবে দেখা যায় না। নৌকার ভাড়া তুলনামূলক বেশি। ৬০০ টাকায় এক নৌকা নিয়ে ১৫ মিনিট ঘোরার সুযোগ হয়েছে।’

নৌকায় ঘোরার সময় কেউ আবার ছবি তুলে রাখছেন। শনিবার বিকেলে করিমগঞ্জের সিঙ্গার বিলে

সড়ক সংস্কার ও বিল সংরক্ষণের দাবি

চার-পাঁচ বছর ধরে সিঙ্গার বিলে পদ্মফুল ফুটছে বলে জানান করিমগঞ্জ সদরের স্থানীয় বাসিন্দা পাভেল হোসেন। তিনি বলেন, প্রতিদিনই এই বিলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে মানুষ আসছেন। তবে এখানে রাস্তাঘাটের অবস্থা খারাপ। বিলপাড়ে পৌঁছাতে দর্শনার্থীদের অনেক কষ্ট হয়। প্রশাসনের এদিকে দৃষ্টি দেওয়া উচিত। দূরদূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীদের দুর্ভোগ কমাতে কাঁচা সড়কটি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

সড়ক সংস্কারের পাশাপাশি বিলটি সংরক্ষণে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে প্রথম আলোকে জানিয়েছেন করিমগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উম্মে মুসলিমা। তিনি বলেন, ‘পদ্মবিলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে আমিও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ছুটির দিনে সেখানে ঘুরে এসেছি।’