প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম পরিবারের নামে ১০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আরও একটির নামকরণের প্রস্তাব আলোচনায়

বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলা সদরের ৫৩ বছরের প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিবগঞ্জ পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে ‘শিবগঞ্জ মীর শাহে আলম পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়’ নামকরণের প্রস্তাব করা হয়েছে। সম্প্রতি বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির পক্ষ থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এই আবেদন করা হয়। এই অ্যাডহক কমিটির প্রধান শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জিয়াউর রহমান।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য। এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে তাঁর রাজনৈতিক প্রেস সেক্রেটারি আতিকুর রহমান বলেন, প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম তাঁর নামে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামকরণের উদ্যোগ না নিতে ১ জুন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিবের কাছে একটি আধা সরকারি (ডিও) পত্র পাঠিয়েছেন। এতে প্রতিমন্ত্রী উল্লেখ করেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে বিভিন্ন ব্যক্তি নিজেদের উদ্যোগে ও স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে তাঁর নামে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামকরণের প্রস্তাব পাঠাচ্ছেন, যা তাঁর কাছে অনভিপ্রেত ও অনাকাঙ্ক্ষিত। তিনি মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, পরিচিতি ও স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ন রাখাই অধিকতর সমীচীন।

ওই আধা সরকারি পত্রে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা ১০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কথা উল্লেখ করা হয়। সেখানে বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তিগত উদ্যোগে জমি দান, নিজ অর্থে জমি ক্রয়, প্রতিষ্ঠাকালীন ব্যয় বহন ও সার্বিক পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে শিক্ষাবিস্তারে কাজ করে আসছেন। তাঁর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ১৯৯৭ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত বা উন্নয়ন করা হয়েছে। এসবের মধ্যে মীরবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (স্থাপিত ১৯৯৭), বেতগাড়ি মীরবাড়ি সরকারি এতিমখানা (২০০৪), বেতগাড়ি মীর শাহে আলম বালিকা উচ্চবিদ্যালয় (২০০১), বেতগাড়ি মীর শাহে আলম কারিগরি স্কুল অ্যান্ড বিএম মহাবিদ্যালয় (২০০৪), তিয়াইল মীর লাবনী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (২০১২), বেতগাড়ি মীর শাহে আলম মৎস্য ও কৃষি প্রযুক্তি ইনস্টিটিউট (২০১৩), বেতগাড়ি মীর মাহাতাব-শাহে আলম মহিলা দাখিল মাদ্রাসা (২০২৩), মোকামতলা মীর শাহে আলম-ছাত্তার তালুকদার মহাবিদ্যালয় (২০২৩), কিচক মীর শাহে আলম কলেজ (২০২৩) এবং বেতগাড়ি মীর শাহে আলম ভেটেরিনারি ইনস্টিটিউট (২০২৫)।

পত্রের শেষাংশে প্রতিমন্ত্রী লেখেন, উল্লিখিত প্রতিষ্ঠানগুলোর বাইরে তাঁর বা তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামকরণের প্রস্তাব যেন গ্রহণ বা অনুমোদন না করা হয়।

এদিকে ৯ জুন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের বেসরকারি মাধ্যমিক-১ শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব শিরীন আক্তার স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, শিবগঞ্জ পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে শিবগঞ্জ মীর শাহে আলম পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয় করার জন্য একটি প্রস্তাব পাওয়া গেছে। এমতাবস্থায় উল্লেখিত প্রতিষ্ঠান স্থাপনের লক্ষ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের ১৩ জুলাই ২০২৩ জারি করা ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (নিম্নমাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক) স্থাপন, পাঠদান ও একাডেমিক স্বীকৃতি প্রদান নীতিমালা-২০২২ (সংশোধিত-২০২৩) ’-এর অনুচ্ছেদ ১৪.৫ অনুযায়ী উল্লেখিত প্রতিষ্ঠানটি সরেজমিনে পরিদর্শন করে নাম পরিবর্তনের সুস্পষ্ট মতামত ও যৌক্তিকতাসহ স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রস্তাব সুপারিশসহ প্রতিবেদন এ বিভাগে পাঠানোর জন্য রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ও বগুড়ার জেলা প্রশাসককে বলা হয়।

১৯৭৩ সালে শিবগঞ্জ পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। তিন দফায় শিবগঞ্জ পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মতিয়ার রহমান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, শিবগঞ্জ পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সাবেক মন্ত্রী ও স্থানীয় সংসদ সদস্য মোজাফফর হোসেন। বিদ্যালয়ের আয়তন ৭৪ শতক। জমি দান করেছেন মরহুম রফিক উদ্দিন প্রামাণিক, মরহুম মুছা চৌধুরীসহ স্থানীয় আরও বেশ কয়েকজন শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি। তিনি আরও বলেন, ‘এ বিদ্যালয় কমিটিতে তিন দফা সভাপতি ছিলাম। আওয়ামী লীগ নেতারাও সভাপতি ছিলেন। কিন্তু অতীতে কেউ কখনো বিদ্যালয়ের নাম পাল্টে ফেলানোর চেষ্টা করেননি।’

শিবগঞ্জ পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তাজুল ইসলাম জানান, বিদ্যালয়ে কারিগরি শাখাসহ দুটি শাখা চালু আছে। শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা ৩৪। শিক্ষার্থীসংখ্যা ৯২৪।

সব রকমের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও ২০১৮ সালে এ বিদ্যালয় জাতীয়করণ থেকে বঞ্চিত হয় উল্লেখ করে প্রধান শিক্ষক আরও বলেন, ‘পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী এবং বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মীর শাহে আলম নির্বাচনের আগে থেকেই এ বিদ্যালয়ের উন্নয়ন ও শিক্ষার মানোন্নয়নে নানাভাবে অবদান রেখেছেন। ইতিমধ্যে তাঁর প্রচেষ্টায় শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে ২০ লাখ টাকায় মিলনায়তন এবং ৭ লাখ টাকায় নামাজঘর নির্মাণ করা হয়েছে। এ বিদ্যালয় জাতীয়করণেরও প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। শিক্ষার মানোন্নয়নে প্রশংসনীয় অবদান রাখায় বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভার সিদ্ধান্তক্রমে পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের নামে বিদ্যালয়ের নামকরণের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে।’

প্রধান শিক্ষক দাবি করেন, প্রতিমন্ত্রীর আপত্তির কারণে আবেদন প্রত্যাহারের জন্য মন্ত্রণালয়ে ১১ জুন আরেকটি চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে সেই চিঠির অনুলিপি চাইলে তিনি তা দেখাতে পারেননি।