
পার্কের প্রধান ফটক বন্ধ। ফটকের পাশে কয়েকজন কর্মী দায়িত্ব পালন করছেন। মূল ফটকের পাশে অভ্যর্থনার কক্ষ, ওই কক্ষের সামনে ক্রোকাদেশ ও পার্কের নিয়মাবলি–সংবলিত দুটি সাইনবোর্ড টাঙানো। মূল ফটক দিয়ে ভেতরে ঢুকতে ডান পাশে দুটি পুকুর। পুকুরপাড় দিয়ে পাকা সড়ক। সড়কটি কিছুদূর পশ্চিম গিয়ে উত্তর দিকে গেছে। দক্ষিণ পাশ থেকে পশ্চিম দিকে কয়েকটি পুকুর খালি পড়ে আছে। ওই পুকুরের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে বিনোদনের জন্য নির্মিত ফেরিস হুইল। পার্কের মধ্যের সড়ক দিয়ে উত্তর দিকে কিছুটা এগোতেই বাঁ পাশে আরও কয়েকটি পুকুর। পুকুরপাড়ে নির্মাণ করা হয়েছে ছোট ছোট কটেজ। একটু উত্তর দিকে এগোতেই সুইমিংপুল, তবে নেই কোনো দর্শনার্থী।
এটি গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার বৈরাগী টোল গ্রামে অবস্থিত সাভানা ইকো রিসোর্ট অ্যান্ড ন্যাচারাল পার্কের আজ সোমবার সকাল ৯টার চিত্র। নানা অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ পার্কটি গড়ে তুলেছিলেন বলে অভিযোগ।
গতকাল রোববার সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে বেনজীর আহমেদ গ্রেপ্তার হয়েছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গতকাল জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারি করা হয়েছিল। ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাত এক ই-মেইলের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারকে বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তার হওয়ার বিষয়টি জানায়।
বেনজীরের বাড়ি গোপালগঞ্জ জেলায়। সদর উপজেলার বৈরাগী টোল গ্রামে ৬০০ বিঘার বেশি জমির ওপর তিনি গড়ে তোলেন সাভানা ইকো রিসোর্ট অ্যান্ড ন্যাচারাল পার্ক। নিজের ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুরে কয়েক শ বিঘা জমি কেনেন তিনি। এসব জমির প্রায় সবই ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের। তারা জানায়, জমি বিক্রি ছাড়া তাদের কোনো উপায় ছিল না। ভয় দেখিয়ে, জোর করে এবং নানা কৌশলে তাদের কাছ থেকে জমিগুলো কেনা হয়।
বৈরাগী টোল গ্রামের বাসিন্দা সঞ্জয় বল বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে আসছি। বেনজীর আহমেদ জোরপূর্বক জমি নিয়ে এলাকায় অশান্তি সৃষ্টি করেছেন। তাঁর গ্রেপ্তারের খবরে মানুষ খুশি হয়েছেন। তবে এখনো আমরা আমাদের জমি ও পুকুরে যেতে পারি না। প্রশাসনের কাছে অনুরোধ, আমাদের সম্পত্তিতে প্রবেশের ব্যবস্থা করে দেওয়া হোক।’ তাঁর অভিযোগ, এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা প্রথম থেকেই অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন। এর জেরে তাঁদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করা হয়, যা থেকে তাঁরা এখনো মুক্তি পাননি।
আদালতের নির্দেশে সাভানা ইকো রিসোর্ট অ্যান্ড ন্যাচারাল পার্কসহ বেনজীর আহমেদের বিভিন্ন সম্পদ জব্দ করা হয়। ২০২৪ সালের ৩ জুন বিকেলে পার্ক কর্তৃপক্ষ ‘অনিবার্য কারণবশত’ পার্ক বন্ধ ঘোষণা করে। সে সময় স্থানীয়দের অভিযোগ ছিল, আদালতের জব্দাদেশের পর রাতের আঁধারে ট্রাকে পার্ক থেকে মালামাল সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। একই বছরের ৬ জুন ২০২৪ দুদকের উপপরিচালক ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন করেন। পরে দুদক ও জেলা প্রশাসন মাইকিং করে সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে।
২০২৪ সালের ১০ জুন তৎকালীন জেলা প্রশাসক কাজী মাহবুবুল আলম পার্কটি পরিদর্শন করেন। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী, পার্কের পুকুর, জলাশয়, ইকো রিসোর্ট, কটেজ ও অন্যান্য স্থাপনা ক্রোক করা হয় এবং সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কৃষিজমি দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া হয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে এবং পুকুর ও জলাশয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় জেলা মৎস্য কর্মকর্তাকে।
২০২৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি দরপত্রের মাধ্যমে সুরুচি ট্রেডার্স এক বছরের জন্য পার্ক ও পুকুর ইজারা নেয়। এর মধ্যে ২০টি পুকুরের ইজারামূল্য ছিল ৩৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং পার্কের ইজারামূল্য ছিল ৬৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা। যৌথভাবে হিরক রায় ও হিমেল দাঁড়িয়া ইজারা নেন।
২০২৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সুরুচি ট্রেডার্স ১০ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধি করে ৭৩ লাখ ১৫ হাজার টাকায় পুনরায় শুধু পার্কের ইজারা নেয়। আগের বছরে পুকুরে লোকসান হওয়ায় এবার তারা পুকুর ইজারা নেয়নি। এ ছাড়া পার্কের পূর্ব পাশে মাদারীপুর অংশে থাকা ৩২ বিঘা বিল, পুকুর ও প্রায় সাড়ে ৩ একর আবাদি জমি পৃথকভাবে ইজারা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
গোপালগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মামুনুর রহমান বলেন, সাভানা ইকো রিসোর্ট অ্যান্ড ন্যাচারাল পার্কে ২০টি পুকুর আছে। চলতি অর্থবছরে পার্কটি আগের বছরের তুলনায় ১০ শতাংশ বেশি মূল্যে ৭৩ লাখ টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পুকুরগুলো ইজারা দেওয়ার জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে।
পার্কের ইজারাদার হিমেল দাঁড়িয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘গত বছরের লোকসান কাটিয়ে উঠতেই আমরা আবার লিজ নিয়েছি। চুক্তি অনুযায়ী, একই ঠিকাদার পরবর্তী ৩ বছর পর্যন্ত প্রতিবছর ১০ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধি করে ইজারা নিতে পারবেন।’ তিনি জানান, পার্কে বর্তমানে প্রায় ৪০ জন কর্মী কাজ করছেন, মাসিক পরিচালন ব্যয় প্রায় ৭ লাখ টাকা। গত বছর সব খরচ বাদ দিয়ে পুকুরে প্রায় ৪০ লাখ ও পার্কে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। বর্তমানে পুকুরগুলোর অবস্থা প্রায় অকেজো। পার্কেও দর্শনার্থীর সংখ্যা কম। শীতকাল ও পিকনিক মৌসুমে কিছু লাভের আশা থাকলেও গত বছর রাজনৈতিক ও নির্বাচনের কারণে দর্শনার্থী কম ছিল।
বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পার্ক থেকে বের হওয়ার সময় মূল ফটকে দেখা গেল, পাঁচ থেকে সাতজন যুবক মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলা থেকে এসেছেন। তাঁরা টিকিট কাউন্টার থেকে টিকিট নিয়ে পার্কে যান।