চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে একটি খামারে দুম্বা লালন–পালন করা হচ্ছে। গত শুক্রবার দুপুরে উপজেলার বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নের মিয়াজী পাড়া এলাকা থেকে তোলা
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে একটি খামারে দুম্বা লালন–পালন করা হচ্ছে। গত শুক্রবার দুপুরে উপজেলার বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নের মিয়াজী পাড়া এলাকা থেকে তোলা

মরুর দেশের দুম্বা পালন হচ্ছে সীতাকুণ্ডে, লাভও বেশি

মাচার মতো উঁচু ঘরের সামনে ছড়িয়ে রাখা হয়েছে বালু। এর ওপর ছোটাছুটি করছে লম্বা কানের কয়েকটি দুম্বা। পাশে রাখা গামলা থেকে কখনো মোটরের খোসা, কখনো দানাদার খাবার খাচ্ছে তারা।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নের রুপালি অ্যাগ্রো লিমিটেডে গিয়ে দেখা যায় এই দৃশ্য। খামারটিতে রয়েছে ৯টি দুম্বা। লালন-পালন সহজ, লাভও বেশি, তাই খামারটিতে দেড় বছর ধরে গরু ও ভেড়ার সঙ্গে দুম্বা পালন করা হচ্ছে।

খামারির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মাত্র তিন মাস বয়সী একটি দুম্বার দাম এক লাখ টাকা। অথচ একই বয়সী উন্নত জাতের একটি ভেড়ার দাম সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা। অর্থাৎ ভেড়ার চেয়ে প্রায় পাঁচ গুণ বেশি দামে বিক্রি হয় মরুর দেশের প্রাণীটি।

সীতাকুণ্ডে দুটি খামারে বাণিজ্যিকভাবে দুম্বা পালন হচ্ছে। উপজেলায় দুম্বার আরেকটি খামারের নাম ইউনিক গোট ফার্ম। এর অবস্থান ভাটিয়ারী ইউনিয়নের জলিল গেট এলাকার। দুই খামারের মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুম্বা পালন এখন কঠিন কিছু নয়। দেশের আবহাওয়ার সঙ্গে সহজেই মানিয়ে নিচ্ছে এই প্রাণী। ঘাস, খড় ও দানাদার খাদ্যেই বেড়ে উঠছে প্রাণীগুলো। রোগবালাইও তুলনামূলক কম। ফলে দুম্বা পালনে লাভের সম্ভাবনাই বেশি থাকে।

সীতাকুণ্ডে বাণিজ্যিকভাবে দুম্বা পালন শুরু হয় ২০২১ সালে। প্রথমে ইউনিক গোট ফার্মে পরীক্ষামূলকভাবে দুম্বা আনা হয়। পরে রুপালি অ্যাগ্রোও দুম্বা পালন শুরু করে। বর্তমানে সীতাকুণ্ডে টার্কি, আওয়াজি ও পারশিয়ান এই তিন জাতের দুম্বা পালন হচ্ছে।

সীতাকুণ্ডে বাণিজ্যিকভাবে দুম্বা পালন শুরু হয় ২০২১ সালে। প্রথমে ইউনিক গোট ফার্মে পরীক্ষামূলকভাবে দুম্বা আনা হয়। পরে রুপালি অ্যাগ্রোও দুম্বা পালন শুরু করে। বর্তমানে সীতাকুণ্ডে টার্কি, আওয়াজি ও পারশিয়ান এই তিন জাতের দুম্বা পালন হচ্ছে। শুধু তা–ই নয়, দুম্বা কেনার জন্য আলাদা শৌখিন ক্রেতা শ্রেণি তৈরি হয়েছে। অনেকেই খামারে না এসে ফেসবুকের বিভিন্ন পেজে দুম্বার ছবি দেখে যোগাযোগ করেন। পছন্দ হলে সরাসরি খামারে এসে কিনে নিয়ে যান। এক বছর বয়সী একটি দুম্বার ওজন সাড়ে তিন মণ পর্যন্ত হয়। তখন সেটি তিন লাখ টাকা বা এর বেশি দামে বিক্রি করা যায়।

খামারের কয়েকটি দুম্বা

রুপালি অ্যাগ্রো লিমিটেড ঘুরে দেখা যায়, বিশাল খামারের এক পাশে টিনশেডের একটি বড় ঘর তৈরি করা হয়েছে। অনেকটা মাচার মতো উঁচু করে বানানো সেই ঘরের এক পাশে ভেড়া, অন্য পাশে রাখা হয়েছে ৯টি দুম্বা। ঘরের সামনে নির্দিষ্ট অংশজুড়ে বালু ফেলা হয়েছে, যাতে প্রাণীগুলো মরুভূমির পরিবেশের অনুভূতি পায়। চারপাশ ঘেরা থাকলেও দুম্বাগুলো সেখানে ছোটাছুটি করছে স্বাভাবিকভাবেই।

খামারটির কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাঁরা মূলত গরুর খামারি। খামারে ৩৫০টির মতো গরু রয়েছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে মেহেরপুর থেকে দুটি পুরুষ ও চারটি স্ত্রী দুম্বা সংগ্রহ করেন। শুরুতে প্রতিটি দুম্বার দাম ছিল প্রায় দুই লাখ টাকা। পরে সব মিলিয়ে ৯ লাখ টাকা খরচ হয়।

শুরুতে দুম্বা পরিচর্যা নিয়ে কিছু সমস্যায় পড়তে হয়েছিল কর্মচারীদের। কাঠের তক্তার ওপর রাখার কারণে পিঁপড়ার উপদ্রব বাড়ে। এতে দুম্বাগুলো অসুস্থ হয়ে পড়ে। পরে প্রায় এক লাখ টাকা ব্যয়ে মাচার মতো আলাদা শেড তৈরি করা হয়। বর্তমানে দুটি মা দুম্বা থেকে আরও তিনটি বাচ্চা হয়েছে। সব মিলিয়ে এখন খামারে ৯টি দুম্বা রয়েছে।

খামারটির দায়িত্বে থাকা কর্মী শওকত আলী প্রথম আলোকে বলেন, শুরুতে দুম্বার খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা ছিল না। পরে ভেড়ার জন্য আনা খাবারই দুম্বাকে দেওয়া শুরু হয়। এখন সেগুলো দেশীয় পরিবেশ ও খাবারের সঙ্গে পুরোপুরি মানিয়ে নিয়েছে। দুম্বা পালন তুলনামূলক সহজ। তাই এখনই বিক্রি না করে প্রজননের মাধ্যমে সংখ্যা বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তিন মাসেই ৪০ কেজি ওজন

সম্প্রতি ভাটিয়ারীর ইউনিক গোট ফার্মে গিয়ে দেখা যায়, খামারটি ছোট ছোট কক্ষে ভাগ করা। প্রতিটি কক্ষে একটি পুরুষ ও দুটি স্ত্রী দুম্বা রাখা হয়েছে। খামারটিতে বর্তমানে ২৭টি পরিণত দুম্বা ও ৩টি বাচ্চা রয়েছে। এখানে তুর্কি, পারশিয়ান ও আওয়াজি তিন জাতের দুম্বা পালন হচ্ছে।

খামারটির মালিক আদনান চৌধুরী। তিনি আগে একটি ব্যাংকে চাকরি করতেন। কোভিড মহামারির সময় পারিবারিক ব্যবসা দেখাশোনার জন্য চাকরি ছেড়ে দেন। পরে ছেলের জন্য কেনা একটি আফ্রিকান জাতের ছাগল থেকেই তাঁর খামার করার আগ্রহ তৈরি হয়।

জানতে চাইলে আদনান বলেন, ‘করোনা চলাকালীন গাজীপুরে গিয়ে প্রথম দুম্বা দেখি। তখনই আগ্রহ তৈরি হয়। পরে তিন জোড়া দুম্বা কিনে খামার শুরু করি। ওই সময় ৬টি দুম্বা কিনতে ২৬ লাখ টাকা খরচ হয়েছিল।’ তিনি বলেন, ‘ভেড়া বা ছাগলের তুলনায় দুম্বার ওজন দ্রুত বাড়ে। তিন মাস বয়সেই একটি দুম্বার ওজন ৪০ কেজি পর্যন্ত হয়। প্রতি দুম্বার পেছনে মাসে গড়ে খরচ হয় আড়াই হাজার টাকার মতো।’

চলতি বছরে ৪৯টি দুম্বা বিক্রি করেছেন আদনান। এর মধ্যে চলতি মাসের ৫ তারিখে ঢাকার গাবতলীর এক ব্যবসায়ীর কাছে ২৫টি দুম্বা ৭৫ লাখ টাকায় বিক্রি করেন। ওই ব্যবসায়ী কোরবানির বাজারে দুম্বাগুলো বিক্রি করবেন।

আদনান বলেন, বর্তমানে বিক্রির মতো দুম্বা খামারে নেই। যেগুলো আছে, সেগুলো প্রজননের জন্য রাখা হয়েছে। প্রতি স্ত্রী দুম্বা বছরে দুটি করে বাচ্চা দেয়। বাচ্চাগুলো তিন মাস দুধ খায়। আরও কয়েক মাস লালন-পালনের পর একটি দুম্বা কমপক্ষে দুই লাখ টাকায় বিক্রি করা যায়।

সীতাকুণ্ড উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা কল্লোল বড়ুয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘দুম্বার রোগবালাই কম এবং পালন তুলনামূলক সহজ। তবে দাম বেশি হওয়ায় ছোট খামারিরা এখনো ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। আমরা নিয়মিত খামারগুলো পরিদর্শন করছি। খামারিদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে আরও খামারি দুম্বা পালনে আগ্রহী হতে পারেন।’