বরগুনা জেলা পরিষদের ডাকবাংলো থেকে লাশ উদ্ধারের ঘটনা জানাজানির পর উৎসুক মানুষের ভিড়। বুধবার সন্ধ্যায় বরগুনা থানাপাড়া এলাকায়
বরগুনা জেলা পরিষদের ডাকবাংলো থেকে লাশ উদ্ধারের ঘটনা জানাজানির পর উৎসুক মানুষের ভিড়। বুধবার সন্ধ্যায় বরগুনা থানাপাড়া এলাকায়

বরগুনার ডাকবাংলোয় ৩ লাশ উদ্ধারের ৫ দিনেও মামলা হয়নি, বিড়ম্বনার অভিযোগ পরিবারের

বরগুনা জেলা পরিষদের ডাকবাংলোর পরিচ্ছন্নতাকর্মী ইতি রানী ও তাঁর দুই মেয়ের মরদেহ উদ্ধারের পাঁচ দিন পরও পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়নি। নিহত ব্যক্তিদের স্বজনদের অভিযোগ, মামলা করতে গিয়ে তাঁরা নানা বিড়ম্বনার মুখে পড়ছেন। এমনকি বাদীর নাম পরিবর্তনের পরামর্শও দিয়েছে পুলিশ।

স্বজনদের ভাষ্য, গত শনিবার রাতে ইতি রানীর স্বামী দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস বরগুনা সদর থানায় মামলা করতে গেলে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তাঁকে বাদী না হয়ে নিহত ইতি রানীর মাকে বাদী করার পরামর্শ দেন। এদিকে ঘটনার পাঁচ দিন পেরিয়ে গেলেও মৃত্যুর রহস্য উদ্‌ঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। এ ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে একটি অপমৃত্যুর মামলা করা হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বরগুনা সদর থানার ওসি আবদুল আলীম প্রথম আলোকে বলেন, ডাকবাংলোর পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও তাঁর দুই মেয়ের মৃত্যুর ঘটনায় ইতি রানীর স্বামী বাদী হয়ে মামলা করতে এসেছিলেন। রক্তের সম্পর্কের কাউকে বাদী করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। এর যুক্তি হিসেবে ওসি বলেন, ‘অনেক সময় দেখা যায়, ঘটনার সাথে স্বামীও জড়িত থাকতে পারে। এ কারণে রক্তের সম্পর্ক মা, ভাই, বোন বাদী হলে ভালো হয়। তাঁরা আর আসেননি।’

নিহত ইতি রানীর ভাসুর মিলন চন্দ্র বিশ্বাস অভিযোগ করেন, ‘শনিবার রাতে বরগুনা সদর থানায় মামলা করতে গেলে থানার ওসি সাহেব আমাদের বলেন, মামলা করতে হলে বাদী পরিবর্তন করতে হবে। কারণ জানতে চাইলে তিনি কোনো উত্তর দেননি। আমরা বিষয়টি বুঝতে পারছি না। পুলিশ আমাদের বিভ্রান্ত করছেন কি না।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখন শুনতেছি, জেলা পরিষদ বা কেয়ারটেকার নাকি ইতি রানীকে চিনে না। অথচ গত দুই মাস তিনি এখানেই কাজ করেছেন। ঘটনার দিন সবাই তো স্বীকার করল যে তিনি এখানে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করেছেন। এখন এই মৃত্যুর বিষয়টি ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। আমরা মামলা করতে গিয়ে পদে পদে বাধাগ্রস্ত হচ্ছি। পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ দেখানোর নামে কালবিলম্ব করছে মামলার ক্ষেত্রে। আমাদের মামলাটি নেওয়া হয়নি।’

নিহত ইতির স্বামী দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, মালতি নামের এক নারীর মাধ্যমে তাঁর স্ত্রী জেলা পরিষদের ডাকবাংলোয় কাজের সন্ধান পান। কেয়ারটেকার লিটনের সঙ্গে কথা বলে মাসিক তিন হাজার টাকা পারিশ্রমিকে সেখানে কাজ শুরু করেন। তিনি বলেন, ‘এখন তো আমার সবই শেষ। এখন শুনছি তারা নাকি চিনেই না। ভবনের সিসি ফুটেজ শুরু থেকে যেভাবে দেখানো হচ্ছে, গত দুই দিন আগে আমাদের পুলিশ কার্যালয় নিয়ে একই ভিডিও দেখানো হচ্ছে। তারা এখন বলতেছে, ইতি রানিকে চিনেন না, তাহলে তিনি কীভাবে ওখানে গেল এবং দুই মাস কীভাবে কাজ করলেন—এটাই আমার প্রশ্ন।’

নিহত ইতির ভাই মিত্র সরকার বলেন, ‘থানায় গিয়েছিলাম আমরা মামলা করতে। তখন ওসি সাহেব আমাদের বললেন, দুলালকে বাদী করলে মামলা ভালো হবে না, মাকে দিয়ে মামলা করলে ভালো হবে। পুলিশ কি এটা বলতে পারে? আমার বোনকে জেলা পরিষদের কেউই চিনেন না। তার মানে কি তারা এই ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে চায়?’

গত বুধবার বরগুনা শহরের থানাপাড়া এলাকার জেলা পরিষদের ডাকবাংলোর তৃতীয় তলার দুটি কক্ষ থেকে ইতি রানী (৩৪) এবং তাঁর দুই মেয়ে আরাধ্য বিশ্বাস (১১) ও অনুরাধা বিশ্বাসের (৩) মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ইতি ডাকবাংলোর অস্থায়ী পরিচ্ছন্নতাকর্মী ছিলেন। তিনি পৌরসভার কালীবাড়ি সড়কের বাসিন্দা দুলাল চন্দ্র বিশ্বাসের স্ত্রী।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে বরগুনার পুলিশ সুপার কুদরত-ই-খুদা সাংবাদিকদের বলেছিলেন, প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে মনে হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, বড় মেয়ের মরদেহের পাশ থেকে ঘুমের ওষুধ ও একটি পানির বোতল উদ্ধার করা হয়েছে। ব্যক্তিগত বা পারিবারিক কোনো কারণে ইতি রানী আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকতে পারেন। কারণ, কক্ষের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল।

তবে পুলিশ সুপারের ওই বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে নিহতের পরিবার। তাদের দাবি, সুরতহাল প্রতিবেদন ও ময়নাতদন্তের প্রাথমিক প্রতিবেদন পাওয়ার আগেই এমন মন্তব্য করা অনভিপ্রেত। স্বজনদের অভিযোগ, এটি পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হতে পারে এবং ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত রহস্য উদ্‌ঘাটন হওয়া প্রয়োজন।