কেটে ফেলা পাহাড়ের পাদদেশে গড়ে তোলা হয়েছে ঘর। বৃষ্টিতে যেকোনো সময়ে পাহাড় ধসের ঝুঁকি রয়েছে। গতকাল বিকেলে উখিয়ার বালুখালী আশ্রয়শিবির
কেটে ফেলা পাহাড়ের পাদদেশে গড়ে তোলা হয়েছে ঘর। বৃষ্টিতে যেকোনো সময়ে পাহাড় ধসের ঝুঁকি রয়েছে। গতকাল বিকেলে উখিয়ার বালুখালী আশ্রয়শিবির

উখিয়ার আশ্রয়শিবির

কেটে ফেলা পাহাড়ের পাদদেশে বেড়ার ঘর, ধসের আতঙ্ক নিয়ে সেখানেই থাকছেন বাসিন্দারা

কক্সবাজারের উখিয়ার বালুখালী আশ্রয়শিবিরের সি-ব্লকে ৭০-৮০ ফুট উঁচু খাড়া পাহাড়ের বিশাল একটি অংশ কেটে ফেলা হয়েছে। দূর থেকেও পাহাড়ের এই কাটা অংশ চোখে পড়ে। পাহাড়টির ঢাল ও পাদদেশে গড়ে তোলা হয়েছে ৪৫টি ত্রিপল ও বাঁশ দিয়ে তৈরি ঘর। প্রতিটা ঘরে বসবাস করে দুই থেকে চারটি রোহিঙ্গা পরিবার। ভারী বর্ষণের ফলে পাহাড়ের কিছু অংশ ধসে মাটি প্রবেশ করেছে ঘরগুলোয়। এর পাশাপাশি ঢুকেছে ঢলের পানিও। বৃষ্টি উপেক্ষা করে ঘরে ঢুকে পড়া কাদাপানি পরিষ্কার করছিলেন বাড়িগুলোর বাসিন্দারা।

গতকাল সোমবার বিকেলে বালুখালী শিবিরে গেলে এমন পরিস্থিতি চোখে পড়ে। এক রাতের ভারী বর্ষণে এই আশ্রয়শিবিরে একাধিক পাহাড়ধসে আটজনের মৃত্যুর ঘটনায় আতঙ্কে রয়েছেন বাসিন্দারা। ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় আবারও যেকোনো সময় পাহাড়ধস হতে পারে বলে তাঁদের আশঙ্কা।

আজ মঙ্গলবার দুপুর দুইটা পর্যন্ত ভারী বর্ষণ অব্যাহত ছিল। জেলার আবহাওয়া দপ্তর আজ সকাল ৯টা পর্যন্ত গত ৪৮ ঘণ্টায় ৪০৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর কক্সবাজারের সহকারী আবহাওয়াবিদ আবদুল হান্নান বলেন, বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপের কারণেই ভারী বর্ষণ। নিম্নচাপটি উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর ও দুর্বল হয়ে সুস্পষ্ট লঘুচাপে পরিণত হয়েছে। এর প্রভাবে বঙ্গোপসাগর উত্তাল হয়ে পড়েছে। আগামী দুই দিনও ভারী বর্ষণ হতে পারে। এ কারণে আশ্রয়শিবিরের পাশাপাশি কক্সবাজার শহর ও আশপাশের পাহাড়ে ভূমিধসের আশঙ্কা রয়েছে।

বালুখালী আশ্রয়শিবিরে আজ মঙ্গলবার সকালে গিয়ে দেখা গেছে, শিবিরের রাস্তাঘাট পানিতে ডুবে আছে। আশপাশের দোকান ও নিচু ঘরবাড়িতেও ঢুকেছে বৃষ্টির পানি। ওই অবস্থায় নিত্যদিনের কাজে ব্যস্ত রোহিঙ্গারা। কেউ ঘর সারাচ্ছেন আর কেউ জরুরি রসদ, খাবার জোগাড়ে ব্যস্ত। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে উখিয়ার ৭ হাজারের বেশি বনভূমি ও পাহাড় কেটে গড়ে তোলা হয় ৯ লাখ রোহিঙ্গার ২৩টি আশ্রয়শিবির। এর মধ্যে শুধু বালুখালীর ১১ নম্বর ক্যাম্পে বসবাস ৬০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গার। ক্যাম্পজুড়ে ৫০-৬০টি পাহাড়ের ঢালে ও পাদদেশে অধিকাংশ ঘর তোলা হয়েছে। ঘর তোলার প্রয়োজনে কাটা হয়েছে পাহাড়গুলোর ওপরের মাটি ও গাছপালা। এর ফলে ভারী বর্ষণ হলেই ভূমিধসের ঘটনা ঘটে।

শুধু বালুখালীর ১১ নম্বর ক্যাম্পে বসবাস ৬০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গার। ক্যাম্পজুড়ে ৫০-৬০টি পাহাড়ের ঢালে ও পাদদেশে অধিকাংশ ঘর তোলা হয়েছে। ঘর তোলার প্রয়োজনে কাটা হয়েছে পাহাড়গুলোর ওপরের মাটি ও গাছপালা। এর ফলে ভারী বর্ষণ হলেই ভূমিধসের ঘটনা ঘটে।

পাশের জামতলি আশ্রয়শিবিরের (ক্যাম্প-১৫) পাহাড়ের ঢালুতেও দুই লাখের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছেন। এই শিবিরেও ভারী বর্ষণে ডুবে গেছে নিচু এলাকার ঘরগুলো। একই দশা কুতুপালং, লম্বাশিয়া, মধুরছড়া আশ্রয়শিবিরের।

আজ সকালেও ভারী বর্ষণ উপেক্ষা করে বালুখালী শিবিরের কয়েকজন রোহিঙ্গা পুরুষ বাড়ির সীমানা বেড়ার কাছে জমে থাকা পাহাড়ের মাটি সরানোর কাজ করছিলেন। আর ঘরের ভেতরে জমে থাকা কাদা পরিষ্কার করছিলেন নারীরা। একটি বাড়ির বাসিন্দা কেফায়ত উল্লাহ (৪৫) বলেন, উঁচু পাহাড় থেকে খাড়াভাবে কেটে কিছু অংশ কেটে সমতল করে সেই ভূমিতে ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। ভারী বর্ষণ শুরু হলে কাটা অংশের মাটি ধসে ঘরবাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ে। ঘরের ওপরে পাহাড়ের আরও ৩০-৪০ ফুট। যেকোনো সময় পাহাড়ের ওই অংশ ধসে ঘরবাড়ির ওপর চাপা দিলে নিশ্চিত প্রাণহানি ঘটবে—এই আতঙ্কে বাসিন্দাদের ঘুম হারাম হয়ে গেছে।

রোববার দিবাগত রাত তিনটার দিকে বালুখালীর ক্যাম্প-১১-তে পাহাড়ধসে এক পরিবারের চারজনের (এক নারী-দুই শিশু) মৃত্যু হয়েছে। পৃথক পাহাড়ধসে জামতলি ও কুতুপালং আশ্রয়শিবিরে আরও চারজন রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়েছে। এরপর থেকে আশ্রয়শিবিরে ঘরে ঘরে মৃত্যু-আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে জানিয়ে রোহিঙ্গা রহিম উল্লাহ (৫০) বলেন, ‘প্রাণ বাঁচাতে আমরা রাখাইন রাজ্য ছেড়ে আশ্রয়শিবিরে এসেছিলাম, এখানেও মৃত্যু পিছু ছাড়ছে না।’

পাহাড় কেটে আশ্রয়শিবিরে গড়ে তোলা হয় ঘর। কেটে ফেলা পাহাড়ের ঢালে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন বাসিন্দারা। গতকাল বিকেলে বালুখালী আশ্রয়শিবিরে

রোহিঙ্গা নারী নুর কলিমা (৩৫) বলেন, ঢলের পানিতে ভেসে আসে পাহাড় কাটার কাদামাটি। সেই কাদা ঘরের ভেতরে জমে থাকে। পরিষ্কার করলে আবার কাদা জমে যায়, রাতে ঘুমানো যায় না। পাহাড়ি ঢলের পানিতে হাঁটাচলার রাস্তা পিচ্ছিল হয়ে পড়ায় ঘর থেকে নিচে ওঠানামা করা যায় না। খাবার পানি আনতে প্রতিদিন দুবার নিচের বাজারে যেতে হয়। তা-ও সম্ভব হচ্ছে না।

পাহাড়ে ফাটল, ভূমিধস

মধুরছড়া আশ্রয়শিবিরের রোহিঙ্গা নেতা কামরুল ইসলাম বলেন, গত দুই দিনের ভারী বর্ষণে আশ্রয়শিবিরটির পাহাড়ে অন্তত ২১টি জায়গায় ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে। তাতে ১০-১২টি ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বালুখালী, জামতলি, কুতুপালং, লম্বাশিয়াসহ আরও কয়েকটি আশ্রয়শিবিরে ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে। জেলা প্রশাসনের দেওয়া তথ্যমতে, গত দুই দিনের বর্ষণে আশ্রয়শিবিরগুলোর বিভিন্ন পাহাড়ে ১৯৩টি ভূমিধসের ঘটনা ঘটে।

রোহিঙ্গা নেতা ও বনকর্মীরা জানান, গাছপালা উজাড়ের পর ঘর তৈরির জন্য যখন পাহাড় কাটা হয়, তখন ভিত নষ্ট হয়ে যায়। এখানকার পাহাড়ের মাটি-বেলে-দোআঁশযুক্ত। পাহাড় কাটার পর নরম বালু আলগা হয়ে পড়ে। পরে পাহাড়ে বড় বড় ফাটল ধরে। সেই ফাটলে বৃষ্টির পানি ঢুকলে ধস সৃষ্টি হয়।

আজ মঙ্গলবার দুপুর দুইটা পর্যন্ত ভারী বর্ষণ অব্যাহত ছিল। জেলার আবহাওয়া দপ্তর আজ সকাল ৯টা পর্যন্ত গত ৪৮ ঘণ্টায় ৪০৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর কক্সবাজারের সহকারী আবহাওয়াবিদ আবদুল হান্নান বলেন, বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপের কারণেই ভারী বর্ষণ। নিম্নচাপটি উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর ও দুর্বল হয়ে সুস্পষ্ট লঘুচাপে পরিণত হয়েছে। এর প্রভাবে বঙ্গোপসাগর উত্তাল হয়ে পড়েছে। আগামী দুই দিনও ভারী বর্ষণ হতে পারে।

আশ্রয়শিবিরের পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে থাকা রোহিঙ্গাদের নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে আনা হচ্ছে জানিয়ে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) ও অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, ভারী বর্ষণের ফলে বিভিন্ন পাহাড়ে ভূমিধসের ঘটনা ঘটছে। এক রাতেই একাধিক ভূমিধসের ঘটনায় নারী-শিশুসহ আটজন রোহিঙ্গার মৃত্যুর ঘটনায় আতঙ্ক-উদ্বেগ বাড়ছে। নতুন আসা রোহিঙ্গাদের অনেকে পাহাড় কেটে ঘরবাড়ি করছেন। অনেকে পাহাড় কেটে ঘর করে ভাড়া দিচ্ছেন। তাতে সংকট আরও বাড়ছে। প্রাণহানি ঠেকাতে ইতিমধ্যে পাহাড়ের ঝুঁকিতে থাকা অন্তত তিন হাজার মানুষকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে আনা হয়েছে। অবস্থা বুঝে আরও কয়েক হাজারকে সরিয়ে আনা হবে।

তলিয়ে গেছে নিচু এলাকা

দুই দিনের ভারী বর্ষণে উখিয়ার কুতুপালং, মধুরছড়া, লম্বাশিয়া, বালুখালী আশ্রয়শিবিরের নিচু এলাকা বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। বিশেষ করে পাহাড়ের নিচের রোহিঙ্গা শেডগুলোয় বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় শরণার্থীদের দুর্ভোগ বেড়েছে। দোকানপাটে পানি ঢুকে পড়ায় অনেকের মালামাল নষ্ট হয়েছে। হাঁটাচলার রাস্তা পানিতে ডুবে আছে। পাহাড়ের বসতি থেকে নিচে ওঠানামার রাস্তাগুলো পিচ্ছিল হয়ে পড়ায় নারী, শিশু ও বয়স্কদের চলাফেলায় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, পাহাড়ে গড়া উখিয়ার ৯, ১০, ১১, ১২, ১৩, ১৪ ও ১৫ নম্বর ক্যাম্পগুলো (আশ্রয়শিবির) ভূমিধস ও দুর্যোগের ঝুঁকিতে রয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনা করে এসব আশ্রয়শিবিরে অতিঝুঁকিতে থাকা অন্তত ৩০ হাজার রোহিঙ্গাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে আনার কাজ চলছে। ইতিমধ্যে পাহাড়ের ঝুঁকি থেকে ৪৮৯ পরিবার সরিয়ে আনা হয়েছে।