শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল-নাহিয়ান ট্রাস্টের আওতায় পরিচালিত আল–নাহিয়ান শিশু পরিবার। সম্প্রতি লালমনিরহাটের কলেজ রোডে
শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল-নাহিয়ান ট্রাস্টের আওতায় পরিচালিত আল–নাহিয়ান শিশু পরিবার। সম্প্রতি লালমনিরহাটের কলেজ রোডে

আল–নাহিয়ান ট্রাস্টে বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই চাকরি, পরে স্ত্রীসহ ৬ স্বজনকে নিয়োগ

  • শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল-নাহিয়ান ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮৪ সালে।

  • ট্রাস্টের অধীন ঢাকার মিরপুর ও লালমনিরহাটে দুটি শিশু পরিবার রয়েছে।

  • আল–নাহিয়ান ট্রাস্টের অধীন একটি উচ্চবিদ্যালয় ও একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে।

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি নেই, পরীক্ষা হয়নি, নিয়োগ বোর্ডও ছিল না। এরপরও তৎকালীন সমাজকল্যাণমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদের নির্দেশে শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল–নাহিয়ান ট্রাস্টে উপতত্ত্বাবধায়ক পদে নিয়োগ পান আবদুল হাকিম। নিয়োগের অফিস আদেশেও তৎকালীন মন্ত্রীর নির্দেশের কথা উল্লেখ রয়েছে। সর্বশেষ গত মে মাসে আবদুল হাকিমের স্ত্রীসহ ছয় স্বজন ট্রাস্টের বিভিন্ন পদে চাকরি পেয়েছেন।

আল–নাহিয়ান ট্রাস্টে নিয়োগে অনিয়ম–দুর্নীতির বিষয়টি বর্তমান সমাজকল্যাণমন্ত্রী ও আল–নাহিয়ান ট্রাস্টের চেয়ারম্যান এ জেড এম জাহিদ হোসেন এবং লালমনিরহাট জেলা প্রশাসককে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক মুহ. রাশেদুল হক গত ২২ জুলাই তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মো. রকিবুল হাসান। কমিটিকে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে সরেজমিনে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের কথা বলা হলেও গতকাল রোববার (৩০ আগস্ট) পর্যন্ত প্রতিবেদন জমা পড়েনি।

শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল-নাহিয়ান ট্রাস্ট (বাংলাদেশ) প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮৪ সালে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট শেখ জায়েদের বাংলাদেশ সফরের পর গঠিত ট্রাস্টটি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন ট্রাস্টি বোর্ডের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এই ট্রাস্টের অধীন ঢাকার মিরপুর ও লালমনিরহাটে দুটি শিশু পরিবার রয়েছে। সেখানে প্রায় ৪০০ এতিম মেয়ের থাকা–খাওয়া ও পড়াশোনার ব্যবস্থা রয়েছে। এ ছাড়া ট্রাস্টের আওতায় একটি উচ্চবিদ্যালয় ও একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা করা হয়। ট্রাস্টের প্রধান কার্যালয় রাজধানীর বনানীতে।

তৎকালীন সমাজকল্যাণমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদের নির্দেশে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আবদুল হাকিমকে ট্রাস্টের উপতত্ত্বাবধায়ক নিয়োগ দেওয়া হয়।

আল–নাহিয়ান ট্রাস্টের উপতত্ত্বাবধায়ক পদে নিয়োগ পাওয়া আবদুল হাকিম বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজে পড়ার সময় ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধঘোষিত) রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর বাড়ি লালমনিরহাটের কালীগঞ্জের উত্তর মুসরত মদাতি গ্রামে।

আল–নাহিয়ান ট্রাস্ট সূত্রে জানা গেছে, আবদুল হাকিম ২০১৮ সালের ২৬ মে লালমনিরহাট আল–নাহিয়ান শিশু পরিবার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে আট হাজার টাকা বেতনে যোগ দেন। পরে তিনি কোনো প্রকার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই ২০২০ সালের ৭ জুন উপতত্ত্বাবধায়ক পদে (বেতন স্কেল ১৬০০০-৩৮৬৪০ টাকা) স্থায়ী নিয়োগ লাভ করেন। উপতত্ত্বাবধায়ক পদে ট্রাস্টের ঢাকা কার্যালয়ে প্রথমে তিনি যোগ দেন। এরপর ২০২২ সালের ১ আগস্ট লালমনিরহাটে বদলি হয়ে আসেন। সবশেষে চলতি বছরের মে মাসে তিনি আবার ঢাকায় বদলি হন।

আল–নাহিয়ান ট্রাস্টের কর্মকর্তা–কর্মচারীদের চাকরির প্রবিধানমালা–২০০৬–এর দ্বিতীয় অধ্যায়ে নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পর্কে বলা আছে। অধ্যায়ের ৪ নম্বর বিধি অনুযায়ী, সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে সব পদ উন্মুক্ত বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে পূরণ করতে হবে। ৫ নম্বর বিধি অনুযায়ী, ট্রাস্টি বোর্ডের নিযুক্ত বাছাই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে নিয়োগদান করা হবে। এ ছাড়া বিধিমালার তফসিল অংশে বলা হয়েছে, উপতত্ত্বাবধায়ক পদে প্রার্থীকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী (দ্বিতীয় বিভাগ) হতে হবে। সমাজকর্ম/সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

তৎকালীন সমাজকল্যাণমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদের সরাসরি হস্তক্ষেপ ও নির্দেশে ওই নিয়োগ দিতে বাধ্য হয়েছি।
কে বি এম ওমর ফারুক চৌধুরী, আল–নাহিয়ান ট্রাস্টের তৎকালীন নির্বাহী পরিচালক

জানা গেছে, আবদুল হাকিম সরকারি আজিজুল হক কলেজ থেকে ভূগোল ও পরিবেশ বিষয়ে ২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত মাস্টার্স পরীক্ষায় ২ দশমিক ৭৫ সিজিপিএ নিয়ে উত্তীর্ণ হন। কোনো বিজ্ঞপ্তি না দিয়েই তাঁকে উপতত্ত্বাবধায়ক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।

ট্রাস্টের তৎকালীন নির্বাহী পরিচালক কে বি এম ওমর ফারুক চৌধুরী স্বাক্ষরিত নিয়োগের অফিস আদেশে উল্লেখ করা হয়, ‘এ আদেশ সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী জনাব নুরুজ্জামান আহমেদ এমপি মহোদয়ের নির্দেশক্রমে জারি করা হলো।’

উল্লেখ্য, নুরুজ্জামান আহমেদ লালমনিরহাট-২ (আদিতমারী-কালীগঞ্জ) আসনের আওয়ামী লীগের (এখন কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সংসদ সদস্য ছিলেন। ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে একাধিক মামলায় কারাগারে রয়েছেন।

আল–নাহিয়ান ট্রাস্টের তৎকালীন নির্বাহী পরিচালক কে বি এম ওমর ফারুক চৌধুরী বর্তমানে অবসরে আছেন। উপতত্ত্বাবধায়ক পদে আবদুল হাকিমের নিয়োগের বিষয়ে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘তৎকালীন সমাজকল্যাণমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদের সরাসরি হস্তক্ষেপ ও নির্দেশে ওই নিয়োগ দিতে বাধ্য হয়েছি।’

আবদুল হাকিমের নিয়োগ পুরোপুরি অবৈধ উল্লেখ করে ওমর ফারুক চৌধুরী বলেন, কোনো প্রকার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, নিয়োগ বোর্ড গঠন ও লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা ছাড়াই নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। এরপর তাঁর আত্মীয়স্বজনসহ অন্যান্য নিয়োগেও ট্রাস্টের চাকরি প্রবিধানমালা লঙ্ঘন করা হয়েছে।

বর্তমানে আল–নাহিয়ান ট্রাস্টের নির্বাহী পরিচালক পদে আছেন যুগ্ম সচিব সামসুন নাহার। ২৭ আগস্ট মুঠোফোনে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, উপতত্ত্বাবধায়ক পদে আবদুল হাকিমের নিয়োগ হয়েছে ২০২০ সালে। তখন তিনি এখানে কর্মরত ছিলেন না। তবে যেভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে, সেটা সঠিক হয়নি।

উপতত্ত্বাবধায়ক আবদুল হাকিমের প্রভাবে আল–নাহিয়ান ট্রাস্টের বিভিন্ন পদে তাঁর স্বজনেরাও নিয়োগ পেয়েছেন। ট্রাস্টের নিয়োগসংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, আবদুল হাকিমের স্ত্রী সুমি আক্তার সহকারী শিক্ষক পদে, ছোট ভাই হারুন অর রশীদের স্ত্রী শারমিন আক্তারকে ‘শিশুমাতা’ হিসেবে মিরপুর ঢাকার অফিসে, চাচাতো ভাই আশরাফুল ইসলামকে বৈদ্যুতিক মিস্ত্রির পদে ঢাকার মিরপুর অফিসে, বড় ভাই আবদুল মোতালেবের স্ত্রী মঞ্জিলা বেগম শিশুমাতা (খণ্ডকালীন) হিসেবে, মামাতো বোন সামিনা খাতুন ও খালাতো বোন রাশেদা খাতুন শিক্ষক পদে লালমনিরহাট আল–নাহিয়ান শিশু পরিবার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়োগ পেয়েছেন। তাঁরা সবাই চলতি বছরের মে মাসে নিয়োগ পান।

আল–নাহিয়ান ট্রাস্টের নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ এনে গত ৪ জুলাই লালমনিরহাট সদরের মহেন্দ্র নগরের বাসিন্দা রাসেল হক সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন।

এ বিষয়ে উপতত্ত্বাবধায়ক মো. আবদুল হাকিমের বক্তব্য জানতে গত জুলাই মাসে মুঠোফোনে একাধিকবার তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছে প্রথম আলো। তিনি ফোন ধরেননি। মুঠোফোন এবং হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা (এসএমএস) পাঠালেও কোনো উত্তর দেননি তিনি। এরপর ২৭ আগস্ট আরেক দফা যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তিনি ফোন ধরেননি।

পরে আবদুল হাকিমের বড় ভাই আবদুল মোতালেবের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলেছে প্রথম আলো। তিনি বলেন, তাঁর স্ত্রী মঞ্জিলা খাতুন আল–নাহিয়ান ট্রাস্টে শিশুমাতা (খণ্ডকালীন) হিসেবে চাকরি পেয়েছেন।

আবদুল হাকিমের ছোট ভাই হারুন অর রশীদের সঙ্গেও মুঠোফোনে এবং হোয়াটসঅ্যাপে কথা বলার চেষ্টা করেছে প্রথম আলো। হারুনের স্ত্রী শারমিন আক্তার ঢাকার মিরপুরে আল–নাহিয়ান শিশু পরিবারে শিশুমাতা পদে চলতি বছরের মে মাসে নিয়োগ পেয়েছেন।

আল–নাহিয়ান ট্রাস্টের নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ এনে গত ৪ জুলাই লালমনিরহাট সদরের মহেন্দ্র নগরের বাসিন্দা রাসেল হক সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি শিক্ষক পদে চাকরিপ্রত্যাশী ছিলাম। কোনো রকম নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই উপতত্ত্বাবধায়ক আবদুল হাকিমের আত্মীয়স্বজনসহ অনেককে বিভিন্ন পদে চাকরি দেওয়া হয়েছে। এ কারণে আমি লিখিত অভিযোগ করেছি।’

ট্রাস্টের নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে গঠিত কমিটি ১১ আগস্ট তাঁকে ডেকেছিল বলে জানান রাসেল হক।

নির্ধারিত সময়ে তদন্ত শেষ হয়নি জানিয়ে লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক মুহ. রাশেদুল হক প্রধান ২৭ আগস্ট প্রথম আলোকে বলেন, আগামী সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া যাবে বলে তিনি আশা করছেন। তদন্তে অনিয়ম ও দুর্নীতির সত্যতা পাওয়া গেলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সুপারিশ করা হবে।