নিজেদের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে জিয়া উদ্দিন। সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রেলওয়ে স্টেশন থেকে তোলা
নিজেদের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে জিয়া উদ্দিন। সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রেলওয়ে স্টেশন থেকে তোলা

ফুটপাত আর রেলস্টেশনে বসেই চার লাখ টাকার জার্সি বিক্রি করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী

বন্ধুদের আড্ডায় হঠাৎ উঠেছিল ফুটবল বিশ্বকাপকে ঘিরে জার্সি বিক্রির প্রসঙ্গ। এরপরই জার্সি বিক্রির পরিকল্পনা করেন দুজন। সেই পরিকল্পনা থেকেই পরিচিত এক ব্যক্তির কাছ থেকে মাত্র ১৩টি জার্সি কিনে বিক্রি শুরু করেন। এরপর প্রায় দুই মাসে ফুটপাত আর রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে বসেই চার লাখ টাকার জার্সি বিক্রি করেছেন তাঁরা।

গল্পটা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী মনির হোসেন ও জিয়া উদ্দিনের। গত মে মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে তাঁরা জার্সি বিক্রি শুরু করেন। দুটি স্ট্যান্ড, দুটি টেবিল আর জার্সি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেলওয়ে স্টেশনে দিয়েছিলেন ছোট্ট দোকান। এখনো প্রতিদিন বিকেলে তাঁরা জার্সি নিয়ে সেখানে বসেন। এর বাইরে ঈদুল আজহায় যখন বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ছিল, তখন তাঁরা লক্ষ্মীপুর জেলা শহরের ফুটপাতে জার্সি বিক্রি করেছেন।

শুরুতে প্রায় ৮০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করেন দুই বন্ধু। বিক্রির অর্থ পুনরায় বিনিয়োগ করে ধাপে ধাপে নতুন জার্সি সংগ্রহ শুরু করেন। এভাবে এ পর্যন্ত প্রায় ৪০০টি জার্সি বিক্রি করেছেন তাঁরা। এখনো তাঁদের কাছে প্রায় ২৫ হাজার টাকার জার্সি রয়েছে।

মনির হোসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী। আর জিয়া উদ্দিন একই বর্ষের লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী। তাঁরা দুজনেই লক্ষ্মীপুরের বাসিন্দা। প্রায় আট বছর আগে থেকেই তাঁদের বন্ধুত্বের শুরু। তখন থেকেই তাঁদের মধ্যে ব্যবসা নিয়ে নানান আলোচনা চলত।

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে তাঁদের ছোট্ট দোকান। বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী তাঁদের দোকানে জার্সি দেখছিলেন। দোকানে আর্জেন্টিনা, স্পেন, ফ্রান্স, ব্রাজিলের জার্সিই বেশি।

জানতে চাইলে মনির হোসেন বলেন, ‘অনেক আগে থেকেই ব্যবসার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু কীভাবে পরিচালনা করতে হয়, ক্রেতাদের সঙ্গে কাজ করতে হয়, এসব বিষয়ে ধারণা ছিল না। সঠিক পরামর্শও পাইনি আমরা। তবু স্নাতকোত্তরে এসে ব্যবসার পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ দিয়েছি।’

এক ক্রেতাকে জার্সি দেখাচ্ছেন মনির হোসেন। সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রেলওয়ে স্টেশন থেকে তোলা

মনির হোসেন জানান, ঈদুল ফিতরের পর তাঁরা কয়েক বন্ধু একসঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলেন। একপর্যায়ে জিয়া উদ্দিন স্টেশনে জার্সি বিক্রির পরিকল্পনার কথা জানান। বিশ্বকাপ উপলক্ষে জার্সি বিক্রি হবে, এ আশায় তিনিও সম্মতি দেন। এরপর তাৎক্ষণিকভাবে পরিচিত এক সিনিয়রের কাছ থেকে ১৩টি জার্সি নিয়ে দোকান শুরু করেন। চাহিদা থাকায় তাঁরা আরও বিনিয়োগ করেন।

শুরুতে প্রায় ৮০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করেন দুই বন্ধু। বিক্রির অর্থ পুনরায় বিনিয়োগ করে ধাপে ধাপে নতুন জার্সি সংগ্রহ শুরু করেন। এভাবে এ পর্যন্ত প্রায় ৪০০টি জার্সি বিক্রি করেছেন তাঁরা। এখনো তাঁদের কাছে প্রায় ২৫ হাজার টাকার জার্সি রয়েছে। খরচ বাদ দিয়ে দুই মাসে তাঁদের এখন পর্যন্ত লাভ হয়েছে ৪৫ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে বিক্রি করেছেন প্রায় চার লাখ টাকা।

আড্ডার ছলে শুরু করা এই ব্যবসা আমাদের লাভের পাশাপাশি বাস্তব অভিজ্ঞতাও দিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে সরবরাহকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ, ক্রেতাদের সঙ্গে আচরণ এবং বাজার বোঝার সুযোগ হয়েছে।
জিয়া উদ্দিন, শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

এ দুই শিক্ষার্থী জানান, শুরুর দিকে তাঁরা উচ্চমানের জার্সি বিক্রি করেছিলেন। পরে শিক্ষার্থীদের ক্রয়ক্ষমতার কথা বিবেচনা করে তুলনামূলক কম দামের কিছু জার্সিও যুক্ত করেন। বর্তমানে তাঁরা মূল্য অনুযায়ী তিনটি ক্যাটাগরির জার্সি বিক্রি করছেন।

জানতে চাইলে জিয়া উদ্দিন বলেন, ‘আড্ডার ছলে শুরু করা এই ব্যবসা আমাদের লাভের পাশাপাশি বাস্তব অভিজ্ঞতাও দিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে সরবরাহকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ, ক্রেতাদের সঙ্গে আচরণ এবং বাজার বোঝার সুযোগ হয়েছে।’

একই কথা বলেন মনির হোসেনও। তিনি বলেন, ‘বিশ্বকাপকে ঘিরে শুরু হলেও শুধু জার্সি বিক্রিতেই থেমে থাকতে চাই না। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। ইতিমধ্যে অনলাইনের মাধ্যমে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রেতাদের কাছেও জার্সি সরবরাহ করা হচ্ছে।’