
‘আমার পুত ইয়াবা খায়। নেশা ছাড়া দিন পার করতে পারে না। আমার সব শেষ হইছে এই পুতের লাইগ্গা। হেদিন (বুধবার) আমারে মারছে, আমার জিয়েরেও (মেয়েকেও) মারছে। আবার আগুন দিয়া ঘরটা পুড়াইয়া দিল। আমি এই পুত চাই না, হের ফাঁসি চাই, না হইলে যাবজ্জীবন।’
গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কথাগুলো বলছিলেন কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর পৌর শহরের বড়খারচর মহল্লার রুবিনা বেগম (৬০)। মাদকাসক্ত ছেলের নির্যাতনে অতিষ্ঠ এই মা এখন যাকেই পাচ্ছেন, তার কাছেই ছেলের বিচার চাইছেন। তাঁর ভয়, ছেলে কারাগার থেকে বের হয়ে আবার তাঁদের মারধর করতে পারেন।
রুবিনা বেগমের ছেলে ফুল মিয়া (৩২) গত বুধবার রাতে নিজের বসতঘরে আগুন দেন বলে অভিযোগ। আগুন দেওয়ার আগে মা ও বোনকে মারধর এবং হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। আগুনে ঘরের আসবাব, কাপড়চোপড়, বই-খাতা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পুড়ে যায়। মারা যায় ১৫টি হাঁস ও প্রায় ৪০টি মুরগি।
পুলিশ সূত্র জানায়, ফুল মিয়াকে গতকাল বৃহস্পতিবার তাঁর নিজ গ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরে তাঁকে কিশোরগঞ্জ কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় ফুল মিয়ার বাবা আবু বক্কর থানায় মামলা করেছেন। মামলায় মারধর, ঘরে আগুন দেওয়া ও ভয় দেখানোর অভিযোগ আনা হয়েছে।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, প্রায় ১০ বছর আগে ফুল মিয়া মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন। ছয় বছর ধরে তাঁর মাদক গ্রহণের মাত্রা বেড়ে যায়। নেশার টাকা না পেলে তিনি বাবা-মায়ের ওপর চাপ দিতেন। টাকা না দিলে ঘরের জিনিসপত্র ভাঙচুর ও তাঁদের মারধর করতেন।
গত বুধবার রাত আটটার দিকে ফুল মিয়া বাড়ির পাশের একটি মুদিদোকানে যান। দোকানটির মালিক আবুল হোসেন মিয়া তাঁর বাবার আপন মামা। ফুল মিয়া বাকিতে পণ্য নিতে চাইলে আগের বাকি টাকা পরিশোধ না করায় আবুল হোসেন রাজি হননি। এ নিয়ে কথা-কাটাকাটির এক পর্যায়ে ফুল মিয়া তাঁকে মারধর করেন বলে পরিবারের সদস্যরা জানান।
ওই ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে ফুল মিয়া তাঁর মা ও বোনকেও মারধর করেন এবং হত্যার হুমকি দেন বলে অভিযোগ। ভয়ে আবু বক্কর ও রুবিনা পাশের বাড়িতে চলে যান। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে তাঁরা দেখেন বসতঘরে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে।
কুলিয়ারচর ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা গিয়ে প্রায় এক ঘণ্টা চেষ্টা করে আগুন নেভান। তবে ততক্ষণে ঘরের সবকিছু পুড়ে যায়। ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার ইলিয়াস ভূইয়া বলেন, টিনশেড ঘরটির সবকিছু পুড়ে গেছে।
ফুল মিয়ার ছোট ভাই দিপু বলেন, ‘ঘর পুড়ছে, ঘর হইব। কিন্তু হে আমরার সবার মন পুড়ছে, সুখ শেষ করছে। এইগুলা ফিরাইয়া আনুম কেমনে?’
পরিবারের সদস্যরা জানান, প্রায় চার বছর আগে ফুল মিয়ার বিয়ে দেওয়া হয়। তাঁদের ধারণা ছিল, সংসার হলে নেশা ছেড়ে দেবেন। কিন্তু তা হয়নি। দেড় বছর আগে তাঁদের একটি কন্যাসন্তান হয়।
পরিবারের সদস্যরা আশা করেছিলেন, সন্তানের প্রতি টান তৈরি হলেও তিনি নেশা ছেড়ে দেবেন। কিন্তু সেই আশাও পূরণ হয়নি। ছয় মাস আগে তাঁর স্ত্রী সন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়ি চলে যান। এরপর বাবা-মায়ের ওপর ফুল মিয়ার নির্যাতন আরও বেড়ে যায় বলে পরিবারের অভিযোগ। নেশার জন্য টাকা চাইতেন। টাকা না দিলে মারধর করতেন ও ভয় দেখাতেন।
ঘরে আগুন লাগার দৃশ্য দেখে অসুস্থ হয়ে পড়েন ফুল মিয়ার বাবা আবু বক্কর। পরে তাঁকে কুলিয়ারচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। আবু বক্কর বলেন, ‘পুত এমন আছিল না। নেশা ধরার পর সব শেষ। এহন বাবা–মায়ের পার্থক্যও বোঝে না।’
পুলিশ হেফাজতে ফুল মিয়া পরিবারের বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ করেন। তাঁর দাবি, পরিবারের সদস্যরাই তাঁকে মারধর করেন। মাদক গ্রহণের কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, এখন আর মাদক নেন না। তবে নিজের ঘরে আগুন দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন।
কুলিয়ারচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোজাম্মেল হক বলেন, ফুল মিয়া নিজের ঘরে আগুন দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি মাদক গ্রহণের কথাও স্বীকার করেছেন। বাবা-মা অভিযোগ করেছেন, নেশার টাকার জন্য তাঁরা প্রায়ই ফুল মিয়ার নির্যাতনের শিকার হতেন।