
নেত্রকোনায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে হেনস্তা করার একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। গতকাল বুধবার রাত আটটার দিকে জেলার পূর্বধলা উপজেলার সিন্দুররাটিয়া শালদিঘা এলাকায় হেনস্তার এ ঘটনা ঘটে। দিবাগত রাত ১২টার পর থেকে ফেসবুকে এ–সম্পর্কিত ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ে।
ওই শিক্ষার্থীর নাম মো. শরীফ হোসেন (২০)। তিনি নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলার বাসিন্দা এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী শরীফ হোসেনের ভাষ্য, তিনি ঈদে গ্রামের বাড়ি আসেন। গত মঙ্গলবার বিকেলে তিনি সদর উপজেলার লক্ষ্মীগঞ্জ গদাইকান্দি গ্রামে তাঁর বড় বোন তানিয়া আক্তারের বাড়ি যান। সেখান থেকে গতকাল বিকেলে তিনি নেত্রকোনা–পূর্বধলা সড়কের বাইপাস মোড় এলাকায় ঘুরতে যান। সন্ধ্যার পর সেখান থেকে তিনি একটি ইজিবাইকে পূর্বধলা সদরের উদ্দেশে রওনা হন। পথে ত্রিমোহনী সেতু পার হয়ে সিন্দুররাটিয়া শালদিঘা এলাকায় এলে দুই যুবক তাঁর পথ রোধ করে তাঁকে ইজিবাইক থেকে নামতে বললে নেমে পড়েন তিনি। পরে ওই যুবকেরা তাঁকে মাদক কারবারি বলে হেনস্তা করতে থাকেন।
শরীফ হোসেনের ভাষ্য, এ সময় ওই দুজনের সঙ্গে আরেকজন অংশ নেন। তিনজন মিলে তাঁকে মাদক কারবারি ও জুলাই যোদ্ধা ট্যাগ দিয়ে নির্যাতন করতে থাকেন। মুক্তিপণ হিসেবে তাঁর কাছে ২০ হাজার টাকা চাওয়া হয়। পরে তাঁর সঙ্গে থাকা ৫০০ টাকা ও বিকাশের মাধ্যমে ১০ হাজার টাকা এনে মোট সাড়ে ১০ হাজার টাকা তাঁদের দেওয়া হয়। ওই যুবকেরা যাওয়ার সময় শরীফের স্মার্টফোনটি নিয়ে যান। এ সময় তাঁকে বস্ত্রহীন করে ভিডিও ধারণ করে ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
ছড়িয়ে পড়া ওই ভিডিওতে দেখা গেছে, শরীফ হোসেনকে বস্ত্রহীন করে বলানো হচ্ছে, ‘আমি একজন জুলাই যোদ্ধা, আমি আর জুলাই করতাম না। জুলাই...। আমি আগে ভুল করছি ছাত্রদের পক্ষে থাইক্কা। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।’ এ সময় বস্ত্রহীন অবস্থায় শরীফকে কাঁদতে দেখা যায়।
এ বিষয়ে আজ বৃহস্পতিবার দুপুর পৌনে ১২টার দিকে নেত্রকোনা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে শরীফ হোসেনের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘তিন যুবক হঠাৎ আমাকে থামিয়ে বস্ত্রহীন করে অমানুষিক নির্যাতন করেছেন। অন্ধকারে আমি কাউকে চিনতেও পারিনি। আমি কাউকে সন্দেহও করছি না। আমার কোনো শত্রু আছে বলে জানা নেই। আমি কোনো দিন কোনো রাজনীতির সঙ্গেও জড়িত নই। আমি জুলাই আন্দোলনের সঙ্গেও কখনো জড়িত ছিলাম না। আমি এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। বলতে পারেন, একরকম ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি।’
এ সময় সঙ্গে থাকা শরীফের বড় বোনের স্বামী উজ্জ্বল খান বলেন, ‘শরীফ খুবই নিরীহ প্রকৃতির ছেলে। সে কখনো কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নয়। এমনকি জুলাই আন্দোলনের সঙ্গেও নয়। তাকে মিথ্যা জুলাই যোদ্ধা ট্যাগ দিয়ে যারা এ রকম নির্যাতন করছে, আমরা তাদের চিহ্নিত করে শাস্তি দাবি করছি।’
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) প্রীতম সোহাগ, এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও নেত্রকোনা কমিটির সদস্যসচিব মো. ফাহিম রহমান খান পাঠান প্রমুখ এ ঘটনায় ফেসবুকে নিন্দা জানিয়েছেন। তাঁরা ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিচার দাবি করেন।
নেত্রকোনার পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘গতকাল রাতে ফেসবুকে বিষয়টি জানার সঙ্গে সঙ্গে ওই শিক্ষার্থীকে পুলিশি নিরাপত্তা দেওয়া হয়। আজ সকালে কার্যালয়ে এনে তাঁর সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ঘটনাস্থল যেহেতু পূর্বধলা থানায়, তাই সেখানে একটি অভিযোগ দিতে বলা হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত সময়ের মধ্যে আটক করে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।’